নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ঘটনা ১: বেলা সাড়ে ১১টা। এসপ্ল্যানেডে এক বেসরকারি সংস্থার কর্মী ‘১০ মিনিটে ডেলিভারি’র প্রতিশ্রুতি দেওয়া ই-কমার্স অ্যাপে কিছু ‘বুক’ করতে চাইছিলেন। অ্যাপ সংস্থা সাফ দেখিয়ে দিয়েছে, ধর্মতলা এলাকায় কোনও বুকিং আপাতত তারা নিচ্ছে না। কোনও ডেলিভারি করা যাবে না ‘ডিউ টু হেভি প্রেসার’!
ঘটনা ২: পার্ক স্ট্রিটে নিজের অফিসে যাওয়ার জন্য অন্যান্য দিনের মতো সোমবার সকালেও উল্টোডাঙা থেকে অটোয় শোভাবাজার আসেন রুদ্র দে। এখান থেকে মেট্রো ধরে পার্ক স্ট্রিট যান তিনি। এদিন পৌঁছে জানতে পারলেন, গিরিশ পার্ক থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত মেট্রো বন্ধ। সেন্ট্রাল-চাঁদনি রুট জলের তলায়। অগত্যা বাস ধরেন তিনি। শোভাবাজার থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় পৌঁছন অফিসে।
ঘটনা ৩: বিকেল সাড়ে ৫টা। ই এম বাইপাসে তখনও যানজট তীব্র। তার প্রভাব গিয়ে পড়েছে ৯ কিলোমিটার দূরে ডি এল খান রোড ক্রসিংয়ে। এ জে সি বোস রোড ও মা ফ্লাইওভারে সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে। এক সময় ব্রিজে গাড়ি ওঠার রাস্তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় পুলিস। সব গাড়িকে ফ্লাইওভারের নীচ দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। পার্ক সার্কাস মোড়, গড়িয়াহাট, বালিগঞ্জ ফাঁড়িও তখন যানজটে জেরবার।
সোমবার, সপ্তাহের প্রথম কাজের দিনে দিনভর এভাবেই দুর্ভোগে জেরবার হতে হল শহরবাসী এবং কাজের সূত্রে কলকাতায় আসা লক্ষ লক্ষ মানুষকে। মেট্রো পরিষেবায় বিঘ্ন, মাঝেমধ্যে ঝেঁপে বৃষ্টি, রাস্তার কোথাও কোথাও জল জমার কারণে যানবাহনের গতি শ্লথ হয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় শহরের বড় অংশ। এদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১১টা এবং ১১টা বেজে ২০ মিনিট থেকে ১২টা ৩২ মিনিট পর্যন্ত দু’দফায় বিঘ্নিত হয় মেট্রো পরিষেবা। ‘গোদের উপর বিষফোঁড়া’ হয়ে দেখা দেয় বৃষ্টি। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর বিভিন্ন অংশে সকালের দিকে হাঁটুসমান জল জমে গিয়েছিল। তাতে ওই রাস্তায় যানবাহনের গতি শ্লথ হয়ে যায়। তীব্র
হয় যানজট।
এদিন যাঁরা কর্মস্থল বা গন্তব্যে পৌঁছনোর জন্য চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ ধরেছিলেন, তাঁদের কার্যত নাকের জলে চোখের জলে হতে হয়েছে। শ্যামবাজার থেকে এসপ্ল্যানেড, এমনকী কখনও কখনও এক্সাইড পর্যন্ত প্রবল যানজট ছিল। ধর্মতলা, হাওড়াগামী বাসগুলিতে ছিল বাদুড়ঝোলা ভিড়। তার উপর মুক্তারামবাবু স্ট্রিট, বড়বাজার ক্রসিং, বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিট ক্রসিং সহ সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের নানা জায়গায় জল জমে যাওয়ার ফলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে। এক মিনিট অন্তর লাল সিগন্যাল জ্বলে উঠছিল। এক নজরে দেখলে মনে হবে, শহরের সব বাস বোধ হয় সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বাসের ভিতরে ভ্যাপসা গরমে নাজেহাল হতে থাকেন যাত্রীরা। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলে গরমের অস্বস্তি দ্বিগুণ হয়ে ফিরে এসেছে। বহু যাত্রীকে বাস থেকে নেমে হেঁটেই রওনা হতে দেখা যায়। ছাতা মাথায় মানুষের স্রোত পড়ে যায় সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের দু’দিকের ফুটপাত ধরে।
দক্ষিণ কলকাতায়ও কমবেশি একই অবস্থা ছিল দিনভর। সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ শুভদীপ দাস মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে যাচ্ছিলেন। এক্সাইড মোড় থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে তাঁর মেয়ের স্কুল। ওই পথ যেতেই ২৫ মিনিট লেগে গিয়েছে বলে জানান শুভদীপবাবু। ঘণ্টাখানেক স্কুলের মধ্যেই বাবার জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য হয় তাঁর মেয়ে। ফেরার সময়ও একই অবস্থার মধ্যে পড়েন তাঁরা। এক্সাইড মোড় থেকে মা ফ্লাইওভারে উঠতেই লেগে যায় প্রায় আধঘণ্টা। বিকেলের দিকে কসবা-কাণ্ড নিয়ে একাধিক মিছিল বের হয় দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন এলাকায়। সেই কারণেও যানজট মাত্রাছাড়া হয়। ফলে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথেও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। রাতে পুলিস কমিশনার কসবা থানায় গিয়েছিলেন। দিনভর সাধারণ মানুষ যানজটে নাকাল হলেও শীর্ষ পুলিসকর্তা রাস্তায় বেরতেই তাঁর ‘লাইন অব রুট’ ফাঁকা করে দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের অবশ্য তেমন সুযোগ মেলেনি!