কল্যাণকুমার দে: সত্যজিৎ রায়ের ‘সেপ্টোপাসের খিদে’ গল্পটার কথা কার না মনে নেই। মাটি কিংবা সার নয়, বরং জীবন্ত প্রাণী উদরস্থ করেই খিদে মেটাত সেই মাংসাশী উদ্ভিদ। সত্যজিতের সেই গল্প কল্পবিজ্ঞানের হলেও তা বাস্তবের পতঙ্গভুক উদ্ভিদের উদাহরণকে সামনে রেখেই লেখা।
মাংসাশী গাছের কথা নিশ্চয়ই আগেও শুনেছ। আফ্রিকার গহিন জঙ্গলে গাছের শুঁড় এসে আস্ত মানুষকেই পেঁচিয়ে গিলে ফেলছে। তবে, এখন নিশ্চিন্তে থাকতে পার আর যা-ই হোক আস্ত মানুষ গিলে ফেলার মতো গাছ কোনও জঙ্গলেই নেই। তবে পোকামাকড় আর পতঙ্গ সাবাড় করার মতো গাছের অভাব নেই। একেকটার শিকার ধরার ফাঁদও এক-এক রকম।
কিন্তু গাছ এভাবে হঠাৎ খাদক হয়ে গেল কেন? গাছের জন্য তো মাটি হলেই চলে। একশব্দে উত্তরটা হল ‘বিবর্তন’। মানে ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া। এই ধীরগতি মানে কয়েক মাস বা বছর নয়, বিবর্তন হতে অপেক্ষা করতে হয় লক্ষ কোটি বছর পর্যন্ত। কিছু গাছ এমন জায়গায় বেড়ে ওঠে, যেখানে মাটিতে পর্যাপ্ত পুষ্টির উপাদান পায় না। বিশেষ করে স্যাঁতসেঁতে মাটিতে জন্ম যাদের। তারাই নাইট্রোজেনের জন্য একসময় মরিয়া হয়ে ওঠে। আর নাইট্রোজেনের খুব ভালো উৎস হতে পারে পোকামাকড়। ১৮৭৫ সালে বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন প্রথম মাংসাশী গাছের কথা বলেছিলেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৩০ প্রজাতির মাংসাশী উদ্ভিদের সন্ধান মিলেছে। এদের মধ্যে একদল শিকার ধরতে কাজে লাগায় আঠা পদ্ধতি, আরেক দল কলসপদ্ধতি। তবে শিকার আকর্ষণের চালাকিটা কমবেশি একই রকম। হয় সুন্দর রং, না হয় মিষ্টি মধু— লোভে পড়ে ফাঁদে পা দিলেই হজম নিশ্চিত!
আমাজনের বিচিত্র এই উদ্ভিদ কী করে পৌঁছল লালমাটির জেলা বাঁকুড়ার সোনামুখীর জঙ্গলে? সুদূর আমাজনের জঙ্গলে এটিকে দেখতে পাওয়া যায়। তবে সেটি বাঁকুড়ায় কীভাবে এল তা ভাবাচ্ছে সকলকে। সোনামুখী রেঞ্জের বড়নারায়ণপুর মৌজায় একটি মুরগির খামার থেকে কিছু দূরে জলাশয়ের পাশে গভীর জঙ্গলে এই উদ্ভিদের দেখা মিলেছে। জঙ্গলে পাতা কুড়োতে গিয়ে স্থানীয়দের নজরে পড়ে এই অদ্ভুত দর্শন উদ্ভিদ। বিজ্ঞানসম্মত নাম ‘ড্রসেরা বার্মানি’। ‘ড্রসেরা’ নামটি গ্রিক শব্দ ‘ড্রসস’ থেকে এসেছে। যার অর্থ হল শিশির বিন্দু। বাংলায় এর নাম ‘সূর্যশিশির’। ইংরেজিতে বলে ‘সানডিউ’। ‘সানডিউ’ নামটি লাতিন শব্দ ‘রস সলিস’ থেকে এসেছে। যার অর্থ হল ‘সূর্যের শিশির’। এটি একধরনের মাংসভুক উদ্ভিদ। এরা মূলত জঙ্গলঘেরা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় জন্মায়। আমাদের রাজ্যের মেদিনীপুর, বীরভূমের শান্তিনিকেতন এবং বাঁকুড়া জেলার সোনামুখী, শুশুনিয়া ও বিহারীনাথ এলাকাতেও প্রচুর পরিমাণে এই গাছ রয়েছে। এরা কোনও ক্ষেত্রেই ক্ষতিকারক নয়।
সূর্যশিশিরের পাতা দেখতে ফুলের মতো ছোট ও গোলাকার। পাতাগুলো উজ্জ্বল লাল রঙের। মাঠের ঘাসের মধ্যে এগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হবে কে যেন পান খেয়ে লাল লাল পিক ফেলে গিয়েছে।
সূর্যশিশিরের পাতায় শিশির বিন্দুর মতো চকচকে করে আঠা। এই চকচক করা আঠালো রসই হচ্ছে উদ্ভিদটির পতঙ্গ ধরার ফাঁদ। এই চকচকে পাতা দেখে কীটপতঙ্গ আকৃষ্ট হয়। ড্রসেরার পাতা এবং শুঁড়ে যে আঠালো স্বচ্ছ রসের টোপ দিয়ে শিকার ধরে তা মূলত পলিস্যাকারাইড মিউসিলেজ। পাতার উপর যে ডাঁটাযুক্ত গ্রন্থি বা কর্ষিকা থাকে সেখান থেকে আঠা তৈরি হয়। উদ্ভিদটি বাতাসে সুগন্ধও ছড়ায়। সূর্যশিশিরের সুগন্ধ আর চকচকে আঠালো রসে আকৃষ্ট হয়ে যখনই কোন পতঙ্গ এর উপরে বসে তখনই আঠালো রসে আটকে যায়। কীটপতঙ্গ যতই নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায় উদ্ভিদটির কর্ষিকাগুলি বেঁকে গিয়ে আরও বেশি পরিমাণে আঠালো রস নিঃসৃত করতে থাকে। তখন আরও শক্তভাবে পাতায় আটকে যায় কীট-পতঙ্গ। এরপর পাতাটি কুঁচকে গিয়ে আটকে যাওয়া পতঙ্গের চারপাশে একটি পেয়ালার মতো আকার সৃষ্টি করে। পোকাটির দেহের নরম অংশগুলো গলে পাতায় মিশে না যাওয়া পর্যন্ত এই উদ্ভিদের পরিপাকে সাহায্যকারী উৎসেচকগুলো কাজ করে। চার-পাঁচ দিন পর সূর্যশিশিরের পাতা ও বোঁটাগুলো আবার আগের মতো সোজা হয়ে যায়। পাতার গ্রন্থি থেকে নানাধরনের এনজাইমও নিঃসৃত হয়, যা বন্দি শিকারকে হজম করতে সাহায্য করে। তবে নানারকম পোকামাকড়ের দেহের রাসায়নিক গঠন একরকম হয় না। ফলে মাংসাশী উদ্ভিদের পক্ষে উৎসেচকের একার ক্ষমতায় সবকিছু হজম করা সম্ভব হয় না। ড্রসেরাকে সব ধরনের খাদ্য হজমের ব্যাপারে সাহায্য করে একধরনের ছত্রাক, যার নাম ‘অ্যাক্রোডনটিয়াম ক্র্যাটারিফরমি’। এরা সহায়ক পাচক এনজাইমও তৈরি করে। এগুলি পাতার পরিবেশকে আরও অ্যাসিডিক করে তোলে। এটি মিউসিলেজের কার্যক্ষমতা এবং ছত্রাকের হজমে সহায়ক উৎসেচক উভয়কেই দ্রুত কাজ করতে সাহায্য করে।
যখন কোনও শিকার পাতার ডাঁটাযুক্ত গ্রন্থির বা কর্ষিকার সঙ্গে শক্তভাবে আটকে যায়, তখন গ্রন্থিগুলো বেঁকে গিয়ে পাতার কেন্দ্রে নুয়ে যায়। সমগ্র পাতাটিকে কুঁচকে গিয়ে পেয়ালার আকার সৃষ্টি করতে একধরনের রাসায়নিক পদার্থ সহায়তা করে। রাসায়নিক পদার্থটির নাম জেসমোনেটস। এটি একধরনের উদ্ভিদ হরমোন।
আশ্চর্যজনক বিষয় হল, এই মাংসাশী উদ্ভিদগুলি সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে। কিন্তু এরা যে ধরনের পরিবেশে জন্মায়, সেখান থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে নাইট্রোজেন শোষণ করতে পারে না। যে জায়গায় এরা জন্মায়, সেই মাটিতে নাইট্রোজেনের ঘাটতি থাকে। ঘাটতি পূরণের জন্যই এই বিশেষ ধরনের উদ্ভিদগুলি বিশেষ ধরনের অভিযোজন করে পোকামাকড় ধরে খেয়ে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে নাইট্রোজেনের ঘাটতি পূরণ করে। নাইট্রোজেন সজীব কোষের জৈবিক ক্রিয়া চালানোর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর অভাব পূরণের জন্যে মাংসাশী উদ্ভিদগুলি প্রাণী শিকার করে মূলত প্রোটিন অংশ শোষণ করে। প্রোটিন হল নাইট্রোজেন ঘটিত জৈব অণু, যা মাংসাশী উদ্ভিদের নাইট্রোজেনের চাহিদা পূরণ করে।
এই উদ্ভিদ ভেষজগুণে সমৃদ্ধ। এর থেকে হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্ট সহ একাধিক রোগের ওষুধ তৈরি হয়। এই উদ্ভিদ আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরির কাজে লাগে। এদের পুড়িয়ে দিলে যে ছাই উৎপন্ন হয় তাকে স্বর্ণভস্মও বলা হয়।
দক্ষিণ আমেরিকার আমাজনের জঙ্গলে এই উদ্ভিদ প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গে এই গাছ বিরল না হলেও অল্প কিছু জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়। তবে, ভারত ও বাংলাদেশে প্রায় লুপ্ত হওয়ার পথে এই পতঙ্গভুক উদ্ভিদ। চাষের জমিতে রাসায়নিক সার ব্যবহার করায় এই গাছ লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও কীটপতঙ্গও কীটনাশক ব্যবহারে কমে গিয়েছে। মূলত ওইসব কীটপতঙ্গ খেয়েই ওই উদ্ভিদগুলি বেঁচে থাকে। অনুকূল পরিবেশের অভাবে আজ সেগুলি বিপন্ন। গৃহপালিত প্রাণীর চারণভূমিতে এরা টিকে থাকতে পারে না। বিলুপ্ত হওয়ার আগে এইসব উদ্ভিদ অবশ্যই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এই গাছ সম্পর্কে স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে সকলেই গাছগুলিকে রক্ষা করার চেষ্টা করবেন।