সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে? কে দেবে তাঁদের বদলির আদেশ? বিচারপতিদের পদোন্নতিই বা কার হাত ধরে হবে— প্রায় দশ বছর পর সেই বিতর্ক ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বর্তমান ব্যবস্থায় গত তিন দশক ধরে সুপ্রিম কোর্ট-হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়োগ-বদলি-পদোন্নতির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সহ পাঁচজন সিনিয়র বিচারপতিকে নিয়ে তৈরি ‘কলেজিয়াম’। কিন্তু এই ব্যবস্থায় ‘দুর্নীতি’, ‘স্বজনপোষণের’ অভিযোগ ওঠায় এক যুগ আগে আইন তৈরি করে জাতীয় বিচারপতি নিয়োগ কমিশন তৈরি করেছিল মোদি সরকার। কিন্তু সেই আইনকে সংবিধান বিরোধী আখ্যা দিয়ে খারিজ করে দেয় দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ফলে এতদিন ঠান্ডা ঘরে পড়ে ছিল কমিশন গঠনের আইনটি। পুরনো কলেজিয়াম ব্যবস্থাতেই বিচারপতিদের নিয়োগ হচ্ছিল। কিন্তু গত ১৪ মার্চ, দোলের দিন দিল্লি হাইকোর্টের এক বিচারপতির বাড়ি থেকে বস্তাবন্দি পোড়া টাকা উদ্ধার হওয়ায় ফের বিচার বিভাগের দায়বদ্ধতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন ওঠে। কার্যত কলেজিয়াম ব্যবস্থাকে কাঠগড়ায় তুলে কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনতে উঠেপড়ে লেগেছে কেন্দ্রের গেরুয়া শাসকগোষ্ঠী। দেশের কোনও রাজনৈতিক দলই এ পর্যন্ত বিচারপতি নিয়োগ-বদলি ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রশ্নে আপত্তির কথা জানায়নি। কিন্তু কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগ-বদলি ব্যবস্থা চালু করে কেন্দ্রীয় সরকার আসলে বিচার বিভাগকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে বলে অনেকেই মনে করছেন। আবার অনেকের মতে, বর্তমান কলেজিয়াম ব্যবস্থাকেও পুরোপুরি ‘ক্লিনচিট’ দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে পরিস্থিতি যে এক জটিল আকার নিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।
বস্তুত কলেজিয়াম না কমিশন— কার হাতে বিচারপতি নিয়োগ-বদলির দায়িত্ব থাকা উচিত তা নিয়ে ২০১৫ সালে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, এই ২০২৫-এও তা অব্যাহত। শুধু রাজনৈতিক দল নয়, এই ইস্যুতে বিচারপতি থেকে আইনজীবীরাও দ্বিধা বিভক্ত। কারণ কোনও ব্যবস্থাকেই ‘ফুলপ্রুফ’ বলে মনে করছেন না কেউই। ইউপিএ আমলে কলেজিয়াম ব্যবস্থার বদলে একটি খসড়া বিল তৈরি হলেও তা সংসদে পেশ হয়নি। মোদি ক্ষমতায় এসে সেই কাজটিই করেন দু’মাসের মধ্যে। সংসদের দুই কক্ষে সরকার-বিরোধী মিলিয়ে ১০০ শতাংশ সাংসদের সমর্থনে বিল পাস হয়। ২০টি রাজ্যের বিধানসভা বিলে সম্মতি দেওয়ার পর রাষ্ট্রপতির সম্মতিতে তা আইনে রূপান্তরিত হয়। তারপরেই হয় মামলা। ৩১ দিন শুনানি চলার পর আইনটিকে সংবিধান বিরোধী বলে খারিজ করে দেয় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ। আইন বাতিল হলেও বিতর্ক থেমে নেই। এই বিতর্কে এক পক্ষের বক্তব্য, প্রায় কোনও দেশেই বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা বিচারপতিদের হাতে নেই। বিচারপতিদের নিয়োগ-বদলিতে জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজের মতামত থাকা জরুরি। অন্য পক্ষের যুক্তি হল, গোটা বিশ্বেই বিচার ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সরকার। সুপ্রিম কোর্টে সবচেয়ে বেশি মামলা লড়ে কেন্দ্রীয় সরকার। সেই সরকার বিচারপতি নিয়োগে পরোক্ষে অংশ নিলে নিরপেক্ষ বিচার হবে না।
প্রশ্ন হল, কলেজিয়াম ব্যবস্থা বদলে কমিশনের মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থা সরকার চালু করতে চাইলে যদি তা অসাংবিধানিক বলে ফের খারিজ করে দেয় শীর্ষ আদালত তখন কী হবে? প্রশ্নটা প্রাসঙ্গিক বলেই কেন্দ্রের কাছে সুনির্দিষ্ট বিকল্প প্রস্তাবের কথা জানতে চায় বিরোধীরা। বস্তুত গত কয়েকদিন ধরে সরকার, বিরোধী প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এই বদল নিয়ে কথা বলছে শাসক শিবির। কোনও দল সরাসরি এর বিরোধিতা না করলেও এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে সকলে জল মেপে নিতে চাইছে। অর্থাৎ বর্তমান কলেজিয়াম ব্যবস্থায় দুর্নীতি-স্বজনপোষণের অভিযোগকে ‘শায়েস্তা’ করতে কেন্দ্র ঘুরপথে নিজেরাই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় থাকতে চাইছে কি না— সঙ্গত কারণেই তা বুঝতে চাইছে বিরোধীরা। কারণ, মোদি-অমিত শাহরা কীভাবে ছলে-বলে-কৌশলে সাংবিধানিক সংস্থাগুলিকে কব্জা করতে উদ্যত তার নজির অনেক আছে। এক্ষেত্রেও তেমনটা হলে সংস্কার নয়, নাকের বদলে নরুন পাওয়া যাবে। স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ বিচারের ক্ষেত্রে যা আরও ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। অথচ সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে ভরসার জায়গা হল ভারতের বিচার ব্যবস্থা। অতএব পরিবর্তন করতে হলে সব দিক বিবেচনা করে সতর্ক পদক্ষেপ জরুরি। না হলে সত্যি সত্যি বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদবে।