খাস মহানগরে কামান, সন্ধিপুজোয় জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়িতে তোপধ্বনি
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: গল্পকথা নয়, বাস্তবিকই কলকাতায় এখনও তোপধ্বনি শোনা যায়। সন্ধিপুজোর সময় উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকোয় কান পাতলেই কামান গর্জন।

Advertisement

যদিও এ কামান সিনেমায় দেখা ঢাউস সাইজের আগ্নেয়াস্ত্র নয়। সিরাজ বা ইংরেজরা যা দিয়ে যুদ্ধ করত সেরকম পেল্লায় নয় মোটেও। নরসিংহ চন্দ্র দাঁ বাড়ির কামানের আকার মেরেকেটে ২ ফুট। কিন্তু খেলনা নয়। আসল। গোলা ছোড়ে দস্তুরমতো। গোলার চরিত্র অবশ্য নিরীহ। তোপধ্বনি হয় বটে তবে তা নির্বিষ। একে বলে ‘স্যালুটিং ক্যানন’। ইউএসএ’র উইনচেস্টার কোম্পানি বানিয়েছিল। বয়স নয় নয় করে ১৩০ বছর। বার্নিস করা কালো দেহ। খুদে দু’টো চাকার উপর বসানো। চকচকে নল। ওজনে ভারী। ছোট হলেও দেখলে রীতিমতো সমীহ জাগে। এ স্যালুটিং কামানের টোটা থেকে ছররা বের করে নেওয়া হয়। থাকার মধ্যে থাকে শুধু বারুদ। বারুদ ফাটে। গভীর শব্দ তৈরি করে। কিন্তু আঘাত করে না। 
পুরাণ বলে চণ্ড-মুণ্ডকে বধ করতে দুর্গার তৃতীয় নয়ন থেকে আবির্ভাব কালিকার। ভয়াল, ভয়ঙ্কর সে রূপ। শুষ্ক দেহ। জিভ দিয়ে রক্ত ঝরছে। চামুণ্ডা রূপে দেবী বধ করলেন দুই অসুরকে। অষ্টমী-নবমীর সেই সন্ধিক্ষণে কলকাতায় এখনও শোনা যায় দাঁ বাড়ির কামানের তোপধ্বনি। সে গর্জন বাতাসে ভেসে ছড়িয়ে পড়ে কলকাতাজুড়ে। পুজোর ধূপ-ধুনো-ফুল-চন্দনের গন্ধ, ধোঁয়া, মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে বনেদিবাড়ির বোলবোলা মিশে সে কামান গর্জন আচ্ছন্ন করে ফেলে শহর। 
কোনো ঘটনা বা ব্যক্তিকে সম্মান জানিয়ে তোপধ্বনি করার রীতি সেই ইংরেজ আমলের। সে আমলেই দুর্গার আগমনকালকে সম্মান জানাতে সন্ধিপুজোয় তোপধ্বনি শুরু দাঁ বাড়িতে। সেই রীতিই চলছে এখনও। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে গিরিশ পার্ক থেকে গণেশ টকিজের দিকে অর্থাৎ গঙ্গার দিকে একটুখানি এগলে বাঁ হাতে পড়ে নরসিংহ চন্দ্র দাঁ’র বাড়ি। প্রাচীন ইমারত। ঠাকুদালানের ডিজাইনে আভিজাত্য চলকে পড়ছে। বংশানুক্রমে তাঁদের বন্দুকের ব্যবসা। ‘এন সি দাঁ’ বন্দুকের দোকান সেই ১৮৩৫ সাল থেকে ব্যবসা করছে। ৯ নম্বর বিবাদী বাগে সেই দোকান। ঢুকলে মনে হয় আস্ত একটি মিউজিয়াম। সুপ্রিয় দাঁ, সৌরভ দাঁ হলেন ষষ্ঠ প্রজন্ম। তাঁরা দোকান সামলাচ্ছেন। বর্তমান প্রজন্মের শুভাশিস দাঁ’রা প্রবেশ করেছেন পৈতৃক ব্যবসায়।
১৮৫৯ সালে দুর্গাপুজো শুরু হয় এ বাড়িতে। দাঁ বংশের সমরেন্দ্রকৃষ্ণ দাঁ তাঁদের পরিবারের ইতিহাস নিয়ে ‘জোড়াসাঁকোর নরসিংহ চন্দ্র দাঁ-র বাড়ী ইতিহাস ও সাহিত্যমূল্য’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। সেটিতে সন্ধিপুজো নিয়ে লেখা, ‘অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে এই পুজো। ভক্তদের এ সময় মা দেখা দেন... পুজোর সময় তোপধ্বনি করা হয়...।’
বারোয়ারি পুজো, আর্টের ঠাকুর, থিম ইত্যাদি নিয়ে কলকাতা বহু দীর্ঘ পথ পেরিয়েছে। তার মধ্যেও প্রাচীন কলকাতার ছোটো ছোটো কিছু ছবি রয়ে গিয়েছে একইরকম। কামানটা সেরকম কিছু গল্প বলে। কেউ আবার শুনতে চাইলে আবার শোনাবে।