নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও সংবাদদাতা, বারুইপুর: কিছু ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা ধার নিয়েছিলেন শিক্ষিকা। বেতনের টাকায় তা শোধ করছিলেন ধীরে ধীরে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ে চাকরি বাতিল হতেই খাতক শিক্ষিকার বাড়ি সদলে চড়াও হলেন পাওনাদাররা। বকেয়া টাকা তখনই মিটিয়ে দিতে চাপ দিলেন। অনেক বোঝানোর পর তখনকার মতো তাঁরা রেহাই দিলেও দ্রুত টাকা মিটিয়ে দিতে হবে বলে হুমকি দিয়ে তবে ছাড়লেন বাড়ি। এরপরই মারাত্মক অবসাদ গ্রাস করে কানিংয়ের রায়বাহিনী হাইস্কুলের ইতিহাসের শিক্ষিকা রুম্পা সিংকে। তার জেরে বৃহস্পতিবার রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।
নিজের প্রাণনাশের চেষ্টার আগে একপাতাজুড়ে একটি সুইসাইড নোট লিখে টেবিলের উপর রেখেছিলেন রুম্পাদেবী। তাতে পাওনাদারদের নাম লেখা। পাশাপাশি কোন পরিস্থিতির জেরে তিনি এই পদক্ষেপ নিলেন সে কথাও লেখা। স্ত্রীকে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্বামী অনিমেষ জানা ক্যানিং হাসপাতালে নিয়ে যান। এখন সিসিইউতে ভর্তি রুম্পাদেবী।
তিনি পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতার বাসিন্দা। ক্যানিংয়ের স্কুলে চাকরি পাওয়ার পর সেখানে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতেন। কিছু ধারদেনা হয়েছিল তাঁর। ভেবেছিলেন বেতনের টাকা থেকে শোধ করবেন। কিন্তু হঠাৎ চাকরি চলে যেতে পারে তা কল্পনা করতে পারেননি। আদালতের নির্দেশের খবর ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে পাওনাদারদের ভিড় জমে যায় শিক্ষিকার ভাড়াবাড়িতে। স্বামী অনিমেষবাবু বলেন, ‘যাঁরা টাকা পাবেন তাঁদের বারবার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু কেউ কিছু শোনেননি। অবসাদ ও অপমানে এ কাজ করতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছেন স্ত্রী।’
অন্যদিকে জানা গিয়েছে, আদালতের নির্দেশে চাকরি বাতিলের পর জেলার বহু স্কুলে শিক্ষক সংখ্যা অস্বাভাবিক কমে গিয়েছে। কোথাও কোথাও তা সিঙ্গল ডিজিটে নেমে এসেছে। সে জায়গায় পঠনপাঠন কীভাবে হবে তা ভেবে দুশ্চিন্তায় প্রধানশিক্ষক ও স্কুল কর্তৃপক্ষ। অনেক স্কুলের স্টাফ রুম খাঁ খাঁ করছে। পড়ুয়া ও বাকি শিক্ষকদের মনমরা দশা। পাথরপ্রতিমার জি-প্লট মিলন বিদ্যানিকেতনে ১২ জনের চাকরি চলে গিয়েছে। সেখানে বিজ্ঞান বিভাগে একজনও শিক্ষক রইল না। বর্তমান আট জন মাত্র শিক্ষক রয়েছেন। জি-প্লট বিবেকানন্দ বিদ্যামন্দিরে ১১ জনের চাকরি বাতিল হয়ে গিয়েছে। তিনজন শিক্ষক দিয়ে স্কুল চালানো একপ্রকার অসম্ভব বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। চাকরি বাতিলের পর কাজহারা শিক্ষকদের পরিবারে নেমে এসেছে চরম হতাশা। অনিশ্চয়তা গ্রাস করেছে প্রত্যেককে। সুন্দরবনের মৈপীঠের পূর্ব গুড়গুড়িয়া আদর্শ বিদ্যাপীঠে শিক্ষকতা করতেন নিপু রায়। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর থেকে চাকরি গিয়েছে। কী করে সংসার চলবে তা ভেবে দিশাহারা তাঁর বৃদ্ধা মা। মৈপীঠের বৈকণ্ঠপুর হাইস্কুলের শিক্ষিকা উর্মিলা বিশ্বাস ১৪ মাস ধরে স্কুলের কাছে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকছিলেন। চাকরি যেতেই দুশ্চিন্তায় ডুবে গিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখন কী করে বাচ্চার মুখে খাবার তুলে দেব। বাজারে কিছু ধার আছে। তা শোধ করব কী করে। জানি না কী হবে?
কোর্টের রায়ে চাকরি দিয়েছে রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার কুহেলি ঘোষের। এর পাশাপাশি জানা গিয়েছে, চাকরি খোয়ানো শিক্ষকদের মুখ্যমন্ত্রীর উপর আস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিধানসভার স্পিকার ও বারুইপুর পশ্চিমের বিধায়ক বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়।