একবার না পারিলে দেখ শতবার। এটাই কি শমীকবাবুর নেতৃত্বে বঙ্গ বিজেপির সর্বশেষ আপ্তবাক্য? বারবার পরীক্ষায় বসো, তারপর ফল বেরলে মার্কশিট লুকিয়ে ফেল। কতবার ম্যাট্রিকে ঘায়েল হয়ে তাঁরা রণেভঙ্গ দেন সেটাই দেখার! প্রার্থী নিয়ে পাহাড় থেকে সমুদ্র বিক্ষোভের ঢেউ। সংগঠন অপুষ্ট, শিরা উপশিরা ধমনী অ্যানিমিয়া আক্রান্ত। শরীরে হিমোগ্লোবিন বাড়াতে জেলায় জেলায় গেস্টহাউস বোঝাই বহিরাগত পানপরাগ শৌখিন প্রভারীদের ঢল। মোটা টাকা বিলিয়েও অর্ধেক বুথে লোক দেওয়ার মুরোদ নেই। ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে, যাবতীয় বরাদ্দ বন্ধ রেখে বাংলা বিরোধী তকমা। তবু দুরাশার চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে বাংলা দখলের স্বপ্ন দেখছেন দলবদলু সর্বস্ব গেরুয়া নেতারা। পাঁচ বছর আগের ট্রেন থেকে পা ফসকে পড়ে যাওয়ার স্মৃতি এত সহজে মিলিয়ে যেতে পারে কে জানত! ২ মে ২০২১ মনে আছে? বেলা গড়াতেই হালকা হাওয়া আর আধপশলা বৃষ্টি আর আবির গায়ে মেখে জয়ের মিছিল সদর্পে আগুয়ান। কোভিডের মধ্যে বিজেপি ও কমিশনের যুগলবন্দিতে চাপিয়ে দেওয়া সেদিনের ৮ দফার নির্বাচনের ফলে গেরুয়া রকেট গোঁত্তা খেয়ে মাটিতে। চারদিকে সবুজ বিজয়োল্লাস। দিল্লির চক্রান্তকে হারিয়ে নেত্রীর নবান্নে ফেরার সোঁদা মাটির গন্ধ। তাঁর কাটআউটে, আকাশছোঁয়া ছবিতে পরের পাঁচ বছরের স্থায়িত্বের রুপোলি রেখা। ২৯৪ সদস্যের বিধানসভায় সওয়া দু’শো পেরিয়ে মমতার ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক ছিল সেটা।
আসছে ৪ মে, এবার উপর্যুপরি চতুর্থবার। পাঁচ বছর আগে ক্ষমতা বদলের চোরা হাতছানিতে যাঁরা দলবদলু হয়েছিলেন তাঁদের চোখেমুখে পুরানো শিবিরে ফেরার মরিয়া আর্তি দেখেছিলাম একুশ সালের ২ মে অপরাহ্ন থেকেই। একই ছবির পুনরাবৃত্তি হয়েছিল ৬ জুন ২০২৪’এও। অষ্টাদশ লোকসভা ভোটের খতিয়ানে। আকাশচুম্বি প্রত্যাশা তৈরি করে বারবার বেলুন চুপসে যাওয়ার ট্র্যাজেডি গাথা মাথায় নিয়েও নাগপুরের দলের আক্কেলগুরুম হয় না। মমতার দলের আসন কমা দূরে থাক, বেড়ে যায় অক্লেশে। ফল বেরতেই গেরুয়া নেতারা উধাও, বিপন্নতার আঁধারে শুধু অসহায় কর্মীরা। আসন্ন
গ্রীষ্মে আবার সেই রিপ্লেরই মাহেন্দ্রক্ষণ সমাগত নয় তো? মাত্র ৩৬দিনের অপেক্ষা। মধ্যিখানে বয়ে যাবে কত কুকথার স্রোত, মিথ্যা প্রতিশ্রুতির
ফুলঝুরি, ‘রবীন্দ্রনাথ সান্যাল ও বঙ্কিমদা’কে স্মরণ করে ‘সুনা’র বাংলা গড়ার উদাত্ত আহ্বান। নিজেদের দিকে ঝোল টেনে জনমত সমীক্ষা নিয়ে নাচানাচির দেড়ঘণ্টাখানেক। সব শেষে মোদি-অমিত শাহের বিকটশব্দে নামা বিমানের গর্জন থেমে পিনপতন নিস্তব্ধতা! এবারের ব্যতিক্রমী ভোটে তাদের
দোসর নির্বাচন কমিশন। বিগত পাঁচ মাসের নাম বাদ দেওয়ার কুনাট্য, যেন বাংলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করছে বশংবদ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কতদিন নিরন্তর একই খেলা চলবে? এবারও ব্যর্থ হলে আর কোনোবার নয়, মানবেন তো! বনসল, যাদব, তাওড়ে, শর্মা মার্কা ভিনরাজ্যের কুশীলবরা কি পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, দিনহাটা, বিনপুর, হিঙ্গলগঞ্জের সাধারণ কর্মীদের পাশে ৪ মে দুপুরের পর দাঁড়াবেন, না দ্রুত বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে নিজের রাজ্যে
পাড়ি দেবেন? দোহাই আপনাদের পানের পিকটাও সযত্নে নিয়ে যাবেন পুতিন সাহেবের মতো! এক্সিট পোল, পণ্ডিতদের পূর্বাভাসকে ধুলোয় ছুড়ে ফেলে চতুর্থবারও নবান্নে প্রবেশের ছাড়পত্র পেয়ে
চ্যালেঞ্জ ছুড়বেন অগ্নিকন্যা। এটাই দেওয়াল লিখন! বেলুন বেশি ফোলালে, লেবু বেশি কচলালে যা নিশ্চিত পরিণতি!
আসন্ন লড়াইয়ে নিশ্চিতভাবে কঠিনতম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাঙালি সমাজ প্রশ্ন করছে, কেন বিগত পাঁচমাসের হেনস্তা অত্যাচার সয়েও কেন্দ্রের শাসককে বাঙালি সমর্থন দেবে? পদে পদে বাংলাকে বাকি পাঁচটা প্রদেশের চেয়ে ভিন্ন চোখে দেখা একটা রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করব কোন জাত্যভিমান জলাঞ্জলি দিয়ে? প্রশ্নটা মাছ মাংস খেতে পারব কি না, অবাঙালিদের দৌরাত্ম্য বাড়বে কি না কিংবা অস্মিতা জলাঞ্জলি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দিস্তানে পরিণত হওয়ার শঙ্কা ছাপিয়ে আরও সুদূরপ্রসারী। ন্যায্য পাওনা আটকে রেখে বাংলাকে ভাতে মারার বিরুদ্ধে উচ্চকিত প্রতিবাদ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হবেই যেকোনো মূল্যে। ১২ বছর দেশ শাসন করার পরও আগমার্কা গেরুয়া যে দল ২৯৪ জন প্রার্থী খুঁজে পেতে হিমশিম খায় তারা সুবিচার দেবে চোরাবালির হেলে পড়া অট্টালিকা থেকে? অনেক কেঁদে কঁকিয়ে তিন কিস্তিতে নাম ঘোষণার পর এখনও প্রার্থী দেওয়া বাকি। নিজেদের মধ্যে মারামারি, বিক্ষোভ, পোস্টারের উপর কালি লেপে দেওয়া সব চলছে পাল্লা দিয়ে জেলায় জেলায়। শতাধিক কেন্দ্রে প্রার্থীই পছন্দ হয়নি স্থানীয় নেতৃত্বের। অথচ অমিত শাহরা চার্জশিট পেশ করে বাংলা দখলের খোয়াব দেখছেন। কে জেতাবে বিজেপিকে? কমিশন, ইভিএম মেশিন না ভিনরাজ্য থেকে আসা রেকর্ড সংখ্যক পর্যবেক্ষকরা? প্রবাদপ্রতিম সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্ত সিপিএমের ভোটলুটকে ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’বলতেন। তাঁর সেই বিশ্লেষণ মান্যতা পেয়েছিল আসমুদ্রহিমাচলে। গত নভেম্বর থেকে পাঁচমাস ধরে ভোটার তালিকার সংশোধনের নামে যে কুনাট্য বাংলার মাটিতে মঞ্চস্থ হচ্ছে, যা ভোটের দিনও সম্পূর্ণ হবে কি না ভগবানেরও অজানা, তাকে কী বলতেন আজ বেঁচে থাকলে? এসআইআর না ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিগিং’! সরাসরি খেলায় না পেরে ভোটার তালিকাতেই মারার চক্রান্ত। সাপ্লিমেন্টারি তালিকা বেরচ্ছে মধ্যরাতের গা ছমছমে অন্ধকারে। ভূতের গল্প নাকি! কত নাম বাদ, কেন সবাই সঙ্গে সঙ্গে তা দেখতে পারছে না, আপলোডে দেরি কোন যুক্তিতে, উত্তর নেই পাষাণ কমিশনের কাছে। কারণ অনেক লুকোবার আছে। দেদার মহিলা ও মুসলিম ভোটার বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ সর্বস্তরে। বসিরহাট-২ ব্লকের বিবিপুর-বেগমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বড়গোবরার ৩৪০ জন মুসলিম ভোটারের নাম ছিল বিচারাধীন। সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশিত হতেই দেখা গেল, বাদ পড়েছে সকলের নাম। এমনকি খোদ বিএলও-র নাম পর্যন্ত ডিলিটেড! এমন উদাহরণ অগুনতি। বিজেপির অঙ্গুলিহেলনেই যে কমিশন কাজ করছে, এই ঘটনা তারই জ্বলন্ত প্রমাণ নয় কি? এ কোন প্রহসন।
কিন্তু এত আটঘাট বেঁধেও টেনশনে পড়ে গিয়েছেন শতাব্দীর সেরা দলবদলু। নিশ্চিত ভরাডুবির গন্ধ পাচ্ছেন তিনি। জোড়া আসনে লড়িয়ে দিয়ে তাঁকে বেজায় চাপে ফেলে দিয়েছে দলেরই প্রভাবশালী অংশ। বেলুনের মাপ এবং কতটা হাওয়া ভরার জায়গা আছে পরখ না করেই যিনি ক্রমাগত ফুঁ দিয়ে যান তাঁর সামনে বিকল্প আর কোন পথই বা খোলা থাকে। এত বড়োবড়ো কথা, আকাশভেদি আস্ফালনের পরও ভবানীপুরে লড়ার প্রস্তাব উগরে ফেলা কাপুরুষতা হয়ে যাবে বুঝেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও পুরোটা গিলতে হয়েছে তাঁকে। উগরে ফেলার সুযোগ পাননি। বাস্তবটা হচ্ছে ভবানীপুরে দলবদলুর পরাজয় যেমন নিশ্চিত, তেমনি নন্দীগ্রামেও এবার লড়াই কঠিন। সেখানেও জয়পরাজয় হবে একেবারে কান ঘেঁষে। বিষ দিয়ে বিষ তোলার কৌশল নিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা। একদা বিজেপির সৈনিক পবিত্র করই দল ভেঙে বেরিয়ে মোক্ষম চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। পবিত্রর হারানোর কিছু নেই। কিন্তু তিনি, শতাব্দীর সেরা দলবদলু যদি ব্যর্থ হন? বাংলা দখল অধরা থাকলে জেলা থেকে আগত সামান্য এক অর্বাচীনকে ছেঁটে ফেলতে কসুর করবে না গেরুয়া নেতৃত্ব। পুরানো বিজেপি কর্মীরা কিন্তু ফুঁসছে এবং তৃণমূলের মতোই ৪ মে’র দুপুরের জন্য অপেক্ষা করছে।
সবমিলিয়ে প্রায় এক কোটি নাম বাদের পর কী হবে? মৃত ও স্থানান্তরিতদের কথা ছেড়েই দিলাম, মহিলা, মুসলিম ও লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সির জাঁতাকলে ফেলে নাম বাদের এই বিভীষিকার জবাব ভোটযন্ত্রে বাংলার মানুষ দেবেই। এই সীমাহীন অত্যাচারই বলে দিচ্ছে বিজেপির আসল মতলবটা কী? যাঁরা বছরের পর বছর এ রাজ্যে আছেন এবং থাকবেন তাঁদের কী হবে এমন একটা বাংলা
বিরোধী দল ক্ষমতায় এলে। সবাই জানে, এরা ক্ষমতায় এলে শিল্প, উন্নয়ন, চাকরি তো হবেই না, ধ্বংস হবে ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি। সবাইকে নিয়ে চলার পরিবর্তে শুধুই হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণ বাঙালি কোনোদিন সহ্য করবে না। তাই আকাশে বাতাসে একটাই সুর, তিনিই ফিরছেন। ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতাকে ফুৎকারে উড়িয়ে সাদা হাওয়াই চটিই আবার শেষ কথা বলবে বঙ্গ রাজনীতিতে। কারণটা খুবই সহজ এবং সরল, এই বিজেপির পক্ষে বাংলাকে সুবিচার দেওয়া সম্ভব নয়। এই কারণেই ৪ মে’র সেই আবির মাখা অনাবিল বিজয়মিছিলের অপেক্ষায় দশ কোটি রাজ্যবাসী। মেলাবেন তিনি মেলাবেন, বিশ্বাস সর্বস্তরে।