যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বুধবার মধ্যরাত থেকে বৃহস্পতিবার দিনভর যে অশান্তির ছবি সামনে এল, তা নিছক দুটি ছাত্র সংগঠনের সংঘর্ষ ভেবে স্বস্তিলাভের সুযোগ নেই। সূত্রপাত ফ্যাকাল্টি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (ফেটসু) সাধারণ সভাকে ঘিরে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন এবং আরএসএস-ঘনিষ্ঠ অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) বিবাদ থেকে। হাতাহাতি, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং বহিরাগত অনুপ্রবেশের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তা ক্রমশ মারাত্মক আকার নেয়। প্রথম আক্রমণকারী কে এবং বহিরাগত গুন্ডা জুটিয়ে কারা আক্রমণকে ভয়াবহ করে তুলল—তার চূড়ান্ত উত্তর এই মুহূর্তে জানা যাবে না। নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া সিদ্ধান্তে আসা দায়িত্বজ্ঞানহীনের পরিচয় বইকি। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট যে, বিশ্ববিদ্যালয় হল শিক্ষার পরিসর, সেখানে ছাত্র-রাজনীতির নামে শক্তিপ্রদর্শন এবং দখলদারির এই সংস্কৃতি কোনো পক্ষের জন্যই গৌরবের নয়। বরং নন্দলাল বসুর ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়-প্রতীক ভাঙচুরের অভিযোগ সত্য হলে তা কেবল সম্পত্তির ক্ষতি নয়, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মর্যাদার উপর আঘাত। মতাদর্শের লড়াই হতেই পারে, হতে পারে তীব্র তর্কবিতর্কও কিন্তু তার পরিণতি যদি হয় লাঠি, ইট, আগুন ও ভাঙচুর হয়, তবে তা ছাত্র-রাজনীতি সংজ্ঞা অতিক্রম করে যায়। এই অশান্তিকে রাজনৈতিক বর্বরতা বললে অত্যুক্তি হয় না। যে ক্যাম্পাস একদিন মুক্তচিন্তা, যুক্তিবাদ এবং প্রতিবাদের সাহসের প্রতীক ছিল, সেখানে যদি মতের বদলে মুষ্টির জোরই শেষকথা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা নিছক একটি দিনের গোলমাল নয়—এটি শিক্ষাঙ্গনের চরিত্র বদলে যাওয়ার অশনিসংকেত।
আরও লজ্জার বিষয় হল, এই অরাজকতার পিছনে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতার ছায়াও স্পষ্ট। ছয়বছর যাবৎ ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ। ফলে প্রতিনিধিত্বের বৈধ গণতান্ত্রিক কাঠামো উধাও হয়ে গেলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তার জায়গা জবরদখল করে শক্তিপ্রর্শনের রাজনীতি—যাদবপুরের ঘটনায় তারই বিপজ্জনক ছায়া দেখা গেল। একটি সাধারণ সভার বৈধতা নিয়েই যদি প্রশ্ন ওঠে, তবে তার নিষ্পত্তি হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মেনে, সংঘর্ষের মাধ্যমে নয়। একইভাবে, বহিরাগত অনুপ্রবেশের অভিযোগ উঠলে প্রশাসনের প্রথম কর্তব্য ছিল দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধীদের শনাক্ত করা। অথচ রাতে কর্তৃপক্ষকে পাওয়াই যায়নি, অদৃশ্য ছিল প্রত্যাশিত সময়োচিত পুলিশি সক্রিয়তাও! এই গুরুতর অভিযোগ যদি সত্য হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জবাবদিহি অনিবার্য। উপাচার্য-রেজিস্ট্রারের পদ রাজনৈতিক চাপের সামনে নতজানু হওয়ার জন্য নয়। আবার কোনো ছাত্র সংগঠনও বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজেদের রাজনৈতিক দুর্গ ভাবতে পারে না। বাম হোক বা দক্ষিণপন্থী—ক্যাম্পাসে কিছু বহিরাগত স্যাঙাত জুটিয়ে প্রভাব বিস্তার, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো কিংবা সংগঠনের শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা একইভাবে নিন্দনীয়। বিশ্ববিদ্যালয় কোনো দলের শাখা অফিস নয়, শিক্ষার্থীদের করদাতা-অভিভাবকদের অর্থে পরিচালিত একটি স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে রাজনৈতিক মত এবং বিতর্ক থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক দলের ‘ছত্রছায়া’ যদি শিক্ষাব্যবস্থার মাথায় কালো ছাতার রূপ নেয়, তবে তার নীচে স্বাধীন চিন্তার আলোই ক্রমে ক্ষীণ হয়। প্রশাসনের দুর্বলতা এবং ছাত্র সংগঠনের দখলদারি—দুইয়ে মিলে যে অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তার খেসারত শেষপর্যন্ত দিতে হয় নির্দোষ নিরীহ শিক্ষার্থীদেরকেই।
সমাধানের পথ তাই অত্যন্ত স্পষ্ট, যদিও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সেটিই সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠেছে। প্রথমত, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং নিয়মিত পদ্ধতিতে ফিরিয়ে আনতে হবে। গণতন্ত্রের দরজা বন্ধ রেখে ক্যাম্পাসে শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা আত্মপ্রবঞ্চনা মাত্র। দ্বিতীয়ত, বহিরাগত অনুপ্রবেশের অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক অপবাদ’ বলে উড়িয়ে না দিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। রং বিচার ছাড়াই সমস্ত দোষীর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির প্রত্যক্ষ দাদাগিরি এবং ছাত্র সংগঠনগুলিকে রাজনৈতিক শক্তিপ্রদর্শনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার প্রবণতায় পূর্ণচ্ছেদ পড়া দরকার। সর্বোপরি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এতটাই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে যে আইন ও বিধি প্রয়োগে কোনো বাধা আসবে না তার সামনে। যাদবপুরের মর্যাদা কোনো পতাকার রঙে নির্ধারিত হয় না, নির্ধারিত হয় তার মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদের অনুশীলনে এবং শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে। সেই পরিবেশ যদি ইট-পাটকেল আর স্লোগানের নীচে চাপা পড়ে যায়, তবে পরাজিত হয় কোনো একটি ছাত্র সংগঠন নয়—বরং বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই। রাজনৈতিক মতাদর্শের নামে যারা ক্যাম্পাসের দখল চায়, তাদের মনে রাখা উচিত, বিশ্ববিদ্যালয় দখলদারির জায়গা নয়, প্রতিষ্ঠানের মাথা উঁচু করাই ছাত্র রাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত। সেখানে ক্ষমতার মাপ লাঠির দৈর্ঘ্যে নয়, যুক্তির শক্তিতে হওয়াই সভ্যতার ন্যূনতম শর্ত।