নিজস্ব প্রতিনিধি, বিধাননগর: বাগুইআটিতে রাস্তার ধারে বড় অফিস। সেখানেই শোরুম। পরপর সাজানো আছে চকচকে ইলেকট্রিক স্কুটার। এই শোরুম থেকে ৮৫ হাজার টাকায় স্কুটার কিনে সেটি শোরুমকেই ব্যবহারের জন্য দিলে ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে মিলবে সাড়ে ৭ হাজার টাকা! কোনও কাজ না করে মাসে মাসে যদি রোজগার আসে, তাহলে তো ভালোই! অসংখ্য মানুষ বুঝতে পারেননি যে গোটাটাই আদতে প্রতারণার ফাঁদ। তাঁরা সেই ফাঁদে পা দেন। আর সেই সুযোগে প্রায় ১৫ কোটি টাকা হাতিয়ে অফিস ও শোরুমে তালা ঝুলিয়ে চম্পট দেয় অভিযুক্তরা। অবশেষে বিহার থেকে এই চক্রের দুই পান্ডাকে গ্রেপ্তার করল বাগুইআটি থানার পুলিস এবং বিধাননগর কমিশনারেটের গোয়েন্দা শাখা। বাগুইআটির সেই শোরুম থেকে ৪৭টি স্কুটার, ২৫টি হেলমেট সহ নানা জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৩ সালে বাগুইআটির দেশবন্ধুনগর রেলপুকুর রোডে ওই অফিস ও শোরুম খোলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বাঁকুড়া এবং রাঁচিতেও দু’টি শাখা খোলা হয়। কোম্পানির প্রতিনিধিরা ক্রেতাদের বলত, ‘আমাদের এখানে মাত্র ৮৫ হাজার টাকা দিয়ে স্কুটার কিনুন। বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। আমাদের শোরুমেই দিয়ে যান। আমরা প্রতিমাসে সাড়ে ৭ হাজার টাকা করে ভাড়া দেব। ওই স্কুটার বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে। যতদিন আপনি স্কুটার আমাদের কাছে রাখবেন, ততদিনই ওই ভাড়া পাবেন।’ অনেকেই ৮৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে মাসে মাসে সাড়ে ৭ হাজার টাকা রোজগারের ‘লোভ’ ছাড়তে পারেননি। ক্রেতাদের অফিসে বসিয়ে কাগজপত্রে স্বাক্ষর করানো হতো। তাঁরাই স্কুটারের রং ও মডেল পছন্দ করতেন। কিন্তু কেনার পর স্কুটার তাঁদের হাতে দেওয়া হতো না। বলা হতো, এই স্কুটারটি এখান থেকে ভাড়ায় খাটবে। পাঠিয়ে দেওয়া হবে অন্যত্র। বাস্তবে তেমন কিছুই হতো না। ওই একই স্কুটার দেখিয়ে আরেকজনকে তা বিক্রি করা হতো। এভাবেই চলছিল লোক ঠকানোর কারবার। শোরুমে সব সময় ৪০-৫০টি স্কুটার সজ্জিত থাকত। ফলে কেউ সহসা সন্দেহও করতেন না।
২০২৩ সাল থেকে টোপ দেওয়া শুরু হলেও অনেক পরে হাতে গোনা কয়েকজনকে স্কুটার ভাড়া দেওয়া শুরু হয়েছিল। তাও নিয়মিত নয়। চলতি বছরের শুরুতে আরও ‘অফার’ দেওয়া হয়। তাতে বিক্রিও বাড়ে। এই অবস্থায় গত ৭ মে কোম্পানির লোকজন চম্পট দেয়। তদন্তে নেমে গত ২৫ জুন বিহারের সীতামারি থেকে শশাঙ্ক দত্ত ওরফে স্বরূপ দত্ত নামে একজন পান্ডাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে জেরা করে রবিবার ভোররাতে পাটনা থেকে কুনাল কুমার ওরফে কুমার কুন্দন ওরফে সুধীর কুমার নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিস। তাদের দাবি, জেরায় ধৃতরাই বাজার থেকে এভাবে প্রায় ১৫ কোটি টাকা তোলার কথা জানিয়েছে।
পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতরা যে সংস্থার নাম করে ওই অফিসটি চালাচ্ছিল, সেখানে তাদের নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর দেওয়া ছিল। তদন্তে দেখা গিয়েছে, সেগুলি সবই ভুয়ো। অর্থাৎ, যাতে করে কোনও প্রমাণ না থাকে, তার জন্য তারা আগাম সতর্কতা নিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, এই চক্রে ধৃত দু’জন পান্ডাও নিজেদের একাধিক নাম ব্যবহার করত। একজনের দু’টি নাম ছিল, অন্যজনের তিনটি। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, ধৃতরা ছাড়াও আরও বেশ কয়েকজন যুক্ত রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তাদের প্রত্যেকের খোঁজ চলছে।