মণিরাজ ঘোষ, খড়্গপুর: গরিব কৃষক পরিবারে জন্ম। মাত্র তিনবছর বয়সেই বাবাকে হারিয়েছিলেন। সবংয়ের প্রত্যন্ত জলবিন্দু গ্রামের সেই শিশুই বড় হয়ে ব্রিটিশদের আতঙ্কে পরিণত হয়েছিলেন। সবংয়ের বীর বিপ্লবী অনাথবন্ধু পাঁজার বন্দুকের গুলিতেই ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিলেন অত্যাচারী ব্রিটিশ জেলাশাসক বার্নার্ড বার্জ। রক্ষীদের পালটা গুলিতে শহিদ হয়েছিলেন এই বিপ্লবী। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২১বছর ১০মাস। পরদিনই শহিদ হন অনাথবন্ধুর সঙ্গী, মেদিনীপুরের বিপ্লবী মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত। আগামী ২সেপ্টেম্বর তাঁদের ‘আত্মবলিদান দিবস’। হাতে গোনা কিছু মানুষ ও সংগঠন ছাড়া অনাথবন্ধু পাঁজা, মৃগেন্দ্রনাথ দত্তদের কেউ মনে রাখেনি! বার্জ হত্যা মামলায় ফাঁসি হওয়া ব্রজকিশোর চক্রবর্তী, রামকৃষ্ণ রায়, নির্মলজীবন ঘোষদেরও কথাও বহু মানুষ ভুলে গিয়েছেন।
পরপর তিনবছর, ১৯৩১, ১৯৩২ ও ১৯৩৩ সালে পেডি, ডগলাস ও বার্জ নামে তিন অত্যাচারী ব্রিটিশ জেলাশাসকের ভবলীলা সাঙ্গ করেছিলেন মেদিনীপুরের বীর বিপ্লবীরা। ১৯৩৩ সালের ২সেপ্টেম্বর শ্বেতাঙ্গ ম্যাজিস্ট্রেট বার্জ পুলিশ গ্রাউন্ড(অধুনা পুলিশ লাইন) মাঠে মহামেডান স্পোর্টিংয়ের বিরুদ্ধে মেদিনীপুর ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলতে নামেন। তখন পায়ে বল নাচাতে নাচাতে মাঠে নামেন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের মেদিনীপুর শাখার দুই সদস্য অনাথবন্ধু পাঁজা ও মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত। কাউকে বুঝতে না দিয়ে, কোমরে লুকানো আগ্নেয়াস্ত্র বের করে দুই বন্ধু বার্জকে লক্ষ্য করে পরপর গুলি ছোড়েন। মাঠেই লুটিয়ে পড়েন বার্জ সাহেব। আর ওঠেননি তিনি। জোন্স নামে অপর এক ব্রিটিশ আধিকারিক জখম হন। এরপর রক্ষীদের সঙ্গে প্রাণপণে গুলির লড়াই চালান বিপ্লবীরা। কিন্তু দু’জনেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মাঠেই পড়ে যান। সেখানেই শহিদ হন অনাথবন্ধু। পরদিন হাসপাতালে শহিদ হন মৃগেন্দ্রনাথ। তাঁর বয়স তখন মাত্র ১৭বছর ১০মাস ১৬দিন! এঘটনার পর বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের ব্রজকিশোর চক্রবর্তী, রামকৃষ্ণ রায়, নির্মলজীবন ঘোষ, নন্দদুলাল সিং, কামাখ্যা ঘোষ, সুকুমার সেন, সনাতন রায়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মামলা হয়। বিচারে ব্রজকিশোর, রামকৃষ্ণ ও নির্মলজীবনের ফাঁসি হয়। নন্দদুলাল সিং, কামাখ্যা ঘোষ, সুকুমার সেন এবং সনাতন রায়ের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়।
১৯১১সালের ২৯ অক্টোবর সবংয়ের জলবিন্দু গ্রামে অনাথবন্ধু পাঁজার জন্ম। মা কুমুদিনী দেবী অনেক লড়াই করে ছেলেকে বড় করেন। গ্রামের ভুবন পালের পাঠশালায় পড়া শেষ করে মায়ের সঙ্গে মেদিনীপুর শহরে আসেন অনাথবন্ধু। মেদিনীপুর টাউন স্কুলে পড়ার সময়ই বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সে যোগ দিয়েছিলেন। মেদিনীপুরের শিক্ষক ও লেখক অমিতকুমার সাহু বলেন, ওইদিন প্রস্তুত হয়েই পুলিশ গ্রাউন্ড মাঠে নেমেছিলেন অনাথবন্ধু পাঁজা ও মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত। নির্ভুল লক্ষ্যে বার্জকে ঝাঁঝরা করেছিলেন।
সবংয়ের প্রাক্তন বিধায়ক মানসরঞ্জন ভুঁইয়া বলেন, সবং তথা মেদিনীপুরের গর্ব অনাথবন্ধু পাঁজা। বাম আমল থেকে তাঁর জলবিন্দু গ্রাম ও জন্মভিটে অধিগ্রহণের দাবি তুলেছি। আশা করছি, রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী এবিষয়ে উদ্যোগী হবেন।