নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সুপারের অফিস থেকে কিছুটা দূরেই বসে রয়েছেন এক বধূ। স্বামীর চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন। হাতে সরকারি হাসপাতালের নথি। হঠাৎ করে এক যুবক তাঁর কাছে এসে হাজির। তাঁকে সে বলে, ১২০০টাকাও দিতে পারবে না? ওই বধূ তাকে পাল্টা উত্তর দিয়ে বলেন, আমরা গরিব মানুষ। তোমাকে তো আগেই বললাম, এত টাকা দিয়ে বাইরে পরীক্ষা করাতে পারব না। ফের ওই যুবক বলে, ঠিক আছে এক হাজার টাকা দাও। তাতেই করে দিচ্ছি। উপায় না দেখে তাতেই রাজি হয়ে গেলেন ওই বধূ। ওই যুবকের সঙ্গে তিনি হাসপাতালের গেটের বাইরে যান। রোগীর আত্মীয়রা বলছেন, এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। হামেশাই এমনটা হচ্ছে। হাসপাতালে ফের মাথা তুলছে দালাল চক্র। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে চিকিৎসা করাতে আসা রোগীদের টার্গেট করছে তারা। হাসপাতালের ইমার্জেন্সি গেটের বাইরেও দালালরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকছে। রামপুরহাট, সিউড়ি বা বোলপুর থেকে রেফার হয়ে আসা রোগীদের ভুল বুঝিয়ে নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়ে তারা ফায়দা তুলছে। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এমএসভিপি তাপস ঘোষ বলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ এলে তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ নিই। হাসপাতালে কোনওভাবেই দালালদের দাপট মেনে নেওয়া হবে না।
হাসপাতালে বীরভূমের মুরারই থেকে স্বামীর চিকিৎসা করাতে এসেছিলেন সীমা বিবি। তিনি বলেন, না চাইলেও অনেকে আগবাড়িয়ে সহযোগিতা করতে আসছে। কিছুক্ষণ কথা বলার পরেই তারা অন্য জায়গায় চিকিৎসা করানোর পরামর্শ দিচ্ছে। আর্থিক অবস্থা ভালো নেই বলেই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে এসেছি। সেখানেও যদি এভাবে দালালদের উৎপাত বাড়ে, তাহলে কোথায় যাব? তাঁর কাছেই বসেছিলেন শর্মিলা দাস নামে আরেক বধূ। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে সমস্ত রকম চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। এখনকার কর্মীরা রোগীদের ঠিকমতো সহযোগিতা করলে দালালরা ফায়দা তুলতে পারত না। তারা প্রথমে ‘বন্ধু’ সেজে আসছে। তারপরই ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে। ‘সরকারি হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা হয় না’ বলে তারা মগজধোলাইয়ের চেষ্টা করছে।
স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, চিকিৎসকদের একাংশও এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কয়েকদিন আগেই ভাতার গ্রামীণ হাসপাতালের চিকিৎসক রোগীকে নার্সিংহোমে অপারেশন করানোর ‘উপদেশ’ দেন। সরকারি নথিতে নবাবহাটের একটি নার্সিংহোমের নামও তিনি উল্লেখ করে দিয়েছিলেন। স্বাস্থ্যদপ্তর ঘটনা নিয়ে তদন্ত শুরু করে ঠিকই, কিন্তু ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জয়রাম হেমব্রম বলেন, বিএমওএইচ ওই ঘটনার তদন্ত করেছেন। রোগীদের দাবি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্যই এই চক্রের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। মাঝে বেশ কিছুদিন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দালালদের উৎপাত বন্ধ ছিল। সুযোগ বুঝে তারা আবার দাপট দেখাতে শুরু করেছে।