ডাঃ অগ্নিমিতা গিরি সরকার: শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু করে দেওয়া যায় মাতৃদুগ্ধ পান। যত তাড়াতাড়ি এই মাতৃদুগ্ধ পান শুরু করা সম্ভব হবে তত বেশিদিন পর্যন্ত শিশুরা মায়ের দুধ পাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু-এর মত হল শিশু যেন ৬ মাস বয়স পর্যন্ত কেবল মায়ের দুধ পায় যাকে বলা হয় ‘এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং’, এবং এর পরেও দুই বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের দুধ খাওয়ানো ভীষণভাবে জরুরি।
মায়ের দুধ তৈরি হয় যে দু্’টি প্রধান হরমোনের সাহায্যে তা হল, ‘অক্সিটোসিন এবং প্রোল্যাকটিন’। এই হরমোন যাতে নিঃসারিত হয় তার জন্য প্রয়োজন, মায়ের সঙ্গে শিশুকে একসঙ্গে রাখা, যাকে বলা হয় ‘রুমিং ইন’। মা যত শিশুকে বুকে করে জড়িয়ে রাখবে ততই দুধ ভালো তৈরি হবে।
কিন্তু হু-এর পরিসংখ্যান অনুসারে দেখা যাচ্ছে অর্ধেকেরও বেশি মায়েরা শিশুদের এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং করাতে পারছেন না। শিশু যখন মায়ের দুধ খাচ্ছে অর্থাত্ প্রথম ৬ মাস শিশুকে অন্য কোনও পানীয়, যেমন মিছরির জল, পানীয় জল বা গোরুর দুধ দেওয়া যাবে না। গ্রামের দিকে অথবা শহরের বাইরে কারও কারও বাড়িতে অথবা আশপাশে গোরু থাকার জন্য গোরুর দুধ খুব ভালোভাবেই পাওয়া যায় এবং তা হল খাঁটি গোরুর দুধ। আমরা অনেকেই মনে করি খাঁটি গোরুর দুধের চেয়ে আর কিছু ভালো হতে পারে না। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। এক বছরের কম বয়সি শিশুদের খাঁটি গোরুর দুধ একেবারেই দেওয়া যায় না। কারণ এই দুধ থেকে শিশুদের নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে।
সমস্যাগুলো যদি একে একে বোঝানো হয় তাহলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়াবে—
১) গোরুর দুধ ছোট শিশুর অন্ত্রে গোপনে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে, এবং ৪০ শতাংশ শিশুর মধ্যে এই সমস্যা দেখা যায়।
২) রক্তক্ষরণের মাধ্যমে শিশুর শরীর থেকে লোহা (লোহা) বেরিয়ে যায়। ফলে দেখা দিতে পারে আয়রনের ঘাটতি জনিত অ্যানিমিয়া।
৩) গোরুর দুধে প্রচুর প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ও খনিজ পদার্থ থাকে যা শিশুদের কিডনির পক্ষে খুবই ক্ষতিকারক।
৪) শিশুদের পক্ষে ভয়ঙ্কর সমস্যা তৈরি করতে পারে কাউজ মিল্ক প্রোটিন অ্যালার্জি বা গোরুর দুধে থাকা প্রোটিন থেকে অ্যালার্জি। এই সমস্যার উপসর্গগুলি হল—
পেটে ব্যথা, পেটে মোচড় দেওয়া (অ্যাবডোমিনাল ক্র্যাম্প) গা গোলানো (বমি বমি ভাব), বমি, পাতলা পায়খানা (ডায়ারিয়া)। এছাড়া গোরুর দুধে আয়রন না থাকার জন্য রক্তাল্পতা হতে পারে। গোরুর দুধে ভিটামিন সি কম থাকার জন্য সমস্যা হতেই পারে। ভিটামিন সি শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে মজবুত করে ও শরীরে আয়রন, লোহার ঘাটতি হতে দেয় না।
৫) মায়ের দুধ যতটা সহজপাচ্য, গোরুর দুধ ততটা সহজপাচ্য নয়।
১ বছরের ছোট এবং ৬ মাসের ওপর শিশুদের গোরুর দুধ ছাড়া আর কী কী দেওয়া যায় না?
প্রাণিজ দুধ ও দুধ থেকে তৈরি কোনও খাবার যেমন ঘি, মাখন, মিষ্টি, দই, ছানা, পায়েস ও ইত্যাদি। নুন ও চিনি স্বাদ দেওয়া যায় না। ডিমের সাদা অংশ, প্রসেসড ফুড।
গোরুর দুধ কখন দেওয়া বাঞ্ছনীয়
এক বছর বয়সের উপরে গোরুর দুধ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে পাস্তুরাইজড গোরুর দুধ শিশুদের দিতে হবে। পাস্তুরাইজড নয় এমন দুধ শিশুকে দিলে শিশুর সংক্রমণ হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে।
খাঁটি গোরুর দুধ ফুটিয়ে খাওয়ালেও পাস্তুরাইজেশন-এর মতো জীবাণু মুক্ত করা সম্ভব নয়।
এই বয়সের বাচ্চাদের হোল মিল্ক বা ফ্যাটসুদ্ধ দুধ দেওয়াই বাঞ্ছনীয়। কারণ এতে শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ ভালো হয়।
শিশুদের কখনওই লো ফ্যাট অথবা নন ফ্যাট স্কিমড মিল্ক দেওয়া উচিত নয়। এই ধরনের দুধে প্রয়োজনীয় ফ্যাট না থাকার জন্য তার মস্তিষ্কের বিকাশে ঘাটতি থাকতে পারে।
শিশুদের প্রতিদিন কতটা দুধ দেওয়া যেতে পারে?
প্রতিদিন ২ কাপ বা ৪০০ এমএল দুধ শিশুদের পান করতে দেওয়া যেতে পারে। এবং তার সঙ্গে অবশ্যই অন্যান্য শক্ত খাবার যা বাড়িতে তৈরি করা হচ্ছে তা কিন্তু এই শিশুদের দেওয়া যেতে পারে যাদের বয়স ১ বছরের বেশি।
বেশি দুধ পান করলে এবং তার সঙ্গে অন্যান্য আয়রন যুক্ত সলিড খাবার না খেলে শিশুদের আয়রন ডেফিশিয়েন্সি অ্যানিমিয়া হতে পারে।
নবজাতকের অধিকার মাতৃদুগ্ধের ওপর, যা থেকে বঞ্চিত হলে শিশু ও মায়ের নানা ধরনের সমস্যা হতে পারে।
মায়ের দুধের বিকল্প কখনও কৌটোর দুধ হতে পারে না। মায়ের দুধে যা গুণাবলি আছে তা কৌটোর দুধে নেই।
আমি যদি দুটোর মধ্যে তুলনা করি তাহলে হয়তো আপনাদের বুঝতে সুবিধা হবে।
কৌটোর দুধ অথবা ফর্মুলা দুধে কী কী ঘাটতি রয়েছে যা মায়ের দুধে নেই।
১) কৌটোর দুধে আলাদা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা অ্যান্টিবডি নেই যা ব্রেস্ট মিল্ক-এ আছে। তার ফলে কৌটোর দুধ শিশুকে সংক্রমণ থেকে কোনও প্রতিরক্ষা দেয় না।
২) তবে মায়ের দুধে প্রচুর পরিমাণে ইমিউন কোষ যেমন বি লিম্ফোসাইটস, টি লিম্ফোসাইটস, রেগুলেটরি সেলস, মোনোসাইটস, ম্যাক্রোফাজ, নিউট্রোফিল, ন্যাচুরাল কিলার সেল, এবং ইমিউনোগ্লোবিউলিন এ, ইমিউনোগ্লোবিউলিন জি, ইমিউনোগ্লোবিউলিন এম অ্যান্টিবডি রয়েছে যা শিশুকে বিভিন্ন সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে।
৩) কৌটোর দুধ কখনওই ব্রেস্ট মিল্ক-এর মতো করে তৈরি করা সম্ভব নয়। মায়ের দুধের গঠন অনেক জটিল। শিশুর বয়স, ওজন ও চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে থাকে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যেমন প্রিম্যাচিওর, ওজন কম, শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের যে দুধ নিঃসারিত হয় তাতে অনেক বেশি মাত্রায় প্রোটিন খনিজ পদার্থ, ফ্যাট থাকে যাতে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও বুদ্ধির বিকাশ দ্রুত হয়। এবং এই শিশুরা দ্রুত স্বাভাবিক শিশুদের বৃদ্ধি ধরে ফেলতে পারে।
৪) পরিকল্পনা এবং ব্যবস্থাপন: কৌটার দুধের জন্য আগে থেকে প্রস্তুতির প্রয়োজন। রাতে অথবা যে কোনও সময় যে কোনও জায়গায় এই দুধ গোলার জন্য সমস্ত সরঞ্জাম প্রস্তুত না থাকলে দুধ তৈরি করা সম্ভব নয়। বোতল, টিটস এই সবকিছুই পরিষ্কার রাখা ভীষণভাবে জরুরি। কিন্তু মায়ের দুধ যে কোনও সময় পাওয়া সহজ। অন ডিম্যান্ড ফিডিং মানে সন্তান যখন চাইবে তখনই দুধ খাওয়ানোর নিয়ম মায়ের দুধের ক্ষেত্রে মেনে চলা সম্ভব। সঠিক তাপমাত্রায় মায়ের দুধ কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই পাওয়া যায়।
৫) কৌটোর দুধ যথেষ্ট দামি। বিশেষ করে যদি কোনও স্পেশাল ফর্মুলা দুধ ব্যবহার করা হয় সেগুলোর দাম আরও বেশি।
মায়ের দুধ সেক্ষেত্রে নিখরচায় পাওয়া যায়। মায়ের দুধ যেহেতু বেবি স্পেসিফিক বা একজন মা সাধারণত তাঁর আপন শিশুকেই খাওয়ান বা তাঁর সন্তান যেভাবে খেতে অভ্যস্ত সেই অনুসারে দুধ তৈরি হয় তাই মায়ের দুধ সবসময় স্পেশাল।
৬) ফর্মুলা দুধ-এ শিশুদের পেটের সমস্যা বেশি হয়
কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়ারিয়া, পেটের সংক্রমণ বেশি হয়।
মায়ের দুধে সংক্রমণের ভয় থাকে না। মায়ের দুধ শিশুরা অনেক ভালোভাবে হজম করতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে ফর্মুলা মিল্ক ব্যবহার করতে হয় যখন মায়ের দুধ দেওয়া সম্ভব নয়। যেমন মা অসুস্থ, দুধ দিতে পারছেন না, মাতৃ বিয়োগ, মায়ের ইবোলা ভাইরাস সংক্রমণ যা আমাদের দেশে খুব একটা দেখা যায় না।
শিশুর গ্যালক্টোসেমিয়া
মায়ের দুধের কোনও বিকল্প হয় না। আর এই ব্রেস্ট মিল্ক-এর উপকারিতা অপরিসীম।
শিশুদের ক্ষেত্রে মায়ের দুধ/ ব্রেস্ট মিল্ক-এর উপকারিতা
১) এ (A for Allergy): অ্যালার্জি হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
২) বি (B for Bond): মা ও শিশুর মধ্যে বন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়। ব্রেন ডেভেলপমেন্ট বা মস্তিষ্কের বিকাশ ভালো হয়।
৩) সি (C for Cough and common cold): কাশি এবং কমন কোল্ড, সর্দি কাশির আশঙ্কা কম থাকে।
৪) ডি (D for Diabetes Mellitus): ডায়াবেটিস মেলিটাস হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে।
৫) ই (E for Enteric diseases): কনস্টিপেশন, ডায়ারিয়া অথবা নানা ধরনের পেটের সমস্যা কম হয়।
৬) এফ (F for Facial growth): মুখমণ্ডলের বৃদ্ধি ভালো হয়। চোয়ালের এক্সারসাইজ হয় দুধ টেনে খাওয়ার সময়। তাই মুখের গড়ন সুন্দর হয়।
মায়ের উপকারিতা
১) শিশু দুধ খেলে মায়ের মস্তিষ্ক থেকে যে অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসারিত হয় তাতে মায়ের প্রসবের পর রক্তক্ষরণ বন্ধ করে কারণ জরায়ুর সংকোচন ঘটায়।
২) প্রতিদিন মায়ের শরীর থেকে দুধ খাওয়ানোর জন্য ৪৫০ ক্যালোরি বেরিয়ে যায়। তার ফলে মায়ের গঠন সুন্দর হয়।
৩) মায়ের হাড় মজবুত হয়, রোধ হয় হাড়ের ক্ষয়।
৪) মায়ের মানসিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখে।
৫) মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার-এর আশঙ্কা কমায়।
৬) মায়ের ওভারিয়ান ক্যান্সারের আশঙ্কা কমায়।
৭) জন্ম নিরোধক হিসেবেও কাজ করতে পারে।
শেষকথা
মায়ের দুধেই সুস্থ শিশু, সুস্থ সমাজ গঠন করা সম্ভব।
লেখক: ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ-এর শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ