Bartaman Logo
১৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিরোধীদের এমন ছত্রভঙ্গ চেহারা কবে দেখেছি? হিমাংশু সিংহ

বিরোধীদের এমন ছত্রভঙ্গ চেহারা কবে দেখেছি?
হিমাংশু সিংহ
  • ১৭ নভেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
Prefer us on Google
শতাব্দীর সেরা প্রহসন বোধ হয় একেই বলে! রাজ্যের তাবৎ বিরোধী শক্তির আজন্ম স্বপ্ন মমতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার। কিন্তু নানা কারণে তা হয়ে ওঠে না। কালীপুজোর রাত এলে ফাটে না একটা বাজিও। দেড় ফুটের চেয়ে উপরে ওঠে না তুবড়ির ঝিলিক দেওয়া ফুল! জনবিচ্ছিন্ন বিরোধীরা সেই না পারার এবং না ফাটার রসায়নটাকে বুঝতে চান না, কিংবা বুঝলেও মানতে চান না। আমরা মানে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজও সেই কানাগলির চোরকাঁটায় হোঁচট খাই বারবার। সেই হতাশা থেকেই ‘বিচার’ চাওয়ার আড়ালে ক্ষমতা বদলের নেতিবাচক প্রচার চলে ক্রমাগত। ডুবন্ত নাবিক খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে হাতের কাছে যা পায়, যে কোনওভাবে একটা আন্দোলন খাড়া করতে হবে তো! 
Advertisement
বলতে বাধা নেই, এবার পুজোর ঠিক আগে সেই পালে দমকা ঝড় একটা লেগেছিল এক তরুণী ডাক্তারের মর্মান্তিক খুন ও ধর্ষণকে ঘিরে। সেই বাধ্যবাধকতা থেকেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ ‘উৎসব’কে পর্যন্ত ফিকে করে দেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে হাওয়া দেওয়ার কাজ শুরু হয়। বাংলাদেশের পালাবদলও পথ দেখায় ইতিউতি। এবার বারুদ, ফুলঝুরি, রংমশালের আয়োজন ছিল দ্বিগুণ। দোদমাও জড়ো হয়েছিল বিস্তর। কিন্তু শেষপর্যন্ত জল ছিটিয়ে ব্যর্থ করে দিলেন বাংলার মানুষই। হালে পানি পেল না বিরোধীদের সুপ্ত রাজনৈতিক মনোবাসনা। এত চেষ্টা করেও কালীপটকা কোনওমতেই সশব্দে চকলেট বোমায় পরিণত হল না! ট্র্যাজেডিটা এখানেই।
গণতন্ত্রে স্বপ্ন দেখা মোটেই দোষের নয়। অলীক কল্পনা, নাছোড় প্রতিবাদও নিঃসন্দেহে দস্তুর। তবে তা বলে রাজ্যের বিরুদ্ধে চক্রান্ত? একটা দুঃখজনক ঘটনাকে অস্ত্র করে ক্ষমতা বদলের হুঙ্কার বরদাস্ত করা যায় কি? বাংলাকে যেনতেন ‘অশান্ত’ করার, ‘মিথ্যে’ তথ্য ফেরি করে ফায়দা লোটার ব্লুপ্রিন্ট বারে বারে ব্যর্থ হয়েছে। খোদ মোদিজি ও অমিত শাহের ডেলি প্যাসেঞ্জারিতেও কাজ হয়নি একুশ ও চব্বিশ সালের মহারণে। রাজ্যটাকে ভাতে মারতে টানা তিন বছর বিভিন্ন প্রকল্পের টাকা দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ। কিন্তু তাতেও একচুল এগতে পারেনি গেরুয়া বাহিনী। একশো দিনের কাজ, বাংলার আবাসের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার, যার সামনে রাজ্যের বিরোধীরা শেষবার নাস্তানাবুদ হয়েছে মাত্র পাঁচ-ছ’মাস আগে লোকসভা ভোটে। লোকসভায় বাংলার গেরুয়া দলের এমপি সংখ্যা ১৮ থেকে কমে শীর্ণকায় ১২। পতন ৩৩ শতাংশেরও বেশি। আর বিধানসভায় সদস্য সংখ্যা রোজ কমছে দলবদলের সৌজন্যে। রিভার্স অপারেশন লোটাস! বাকি কংগ্রেস ও বাম শিবির তো পরিষদীয় রাজনীতিতে নিশ্চিহ্ন। এবারও ১৩ নভেম্বরের উপ নির্বাচনী যুদ্ধের ফলাফল তো দূর অস্ত, একটা সুস্থ লড়াই গড়ে তোলার মতো পরিবেশ পরিস্থিতিই তৈরি করতে পারল না কী রাম, কী বামেরা। তবু ডানা ঝাপটানি যায় না। সেই তাড়না থেকেই বামেদের দৌলতে চাঙ্গা  হয় বাংলার মিম শিল্প!  মমতা কেমন লেখেন, কেমন আঁকেন, ক’টা বই বেরলো, তা নিয়েও দু’শো গাত্রদাহ। আপনারাও লিখুন না। দেখি ক’টা ‘চোখের বালি’ বেরয়?
কেন বিরোধীদের এই দুরবস্থা? প্রথমত, বঙ্গ বিজেপির নেতৃত্বের সংঘাতে দ্রুত তাদের পায়ের তলার মাটি সরছে উত্তরবঙ্গে। সভাপতি, বিরোধী দলনেতা এবং প্রাক্তন সভাপতিরা সবাই ভিন্ন ভিন্ন শিবিরে বিভক্ত। দ্বিতীয়ত, মানুষে মানুষে বিভাজন আর হিন্দু-মুসলিম কট্টর মনোভাব না থাকলেই গেরুয়া রাজনীতি ঘুমিয়ে পড়ে! ওদের সিলেবাসে তার বাইরে যে আর কিছু নেই। আর লাজুক লাজুক মুখ করে সিপিএম একবার কংগ্রেস, একবার আইএসএফ, আর একবার নকশালদের ঘাড়ে বন্দুক রাখছে। বামেদের কোনটা মুখ আর কোনটা মুখোশ মানুষ গুলিয়ে ফেলছে। কংগ্রেস ও নকশালদের হাতে নিহত বাম পরিবারের লোকজন এই সুবিধাবাদী সিপিএমকে চেনে না, বিশ্বাসও করে না। বারবার মোবাইল নম্বর বদলের মতো বন্ধু বদল তখনই হয় যখন মধ্যিখানের মানুষটাই চূড়ান্ত দিশাহারা, হতাশ কিংবা দাগি। স্রেফ আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগছে। তাই নৈহাটির বাম মনোভাবাপন্ন মানুষ উগ্র নকশাল প্রতীকে ভোট দিতে রাজিই হয়নি। মাদারিহাটের আরএসপি ভোটব্যাঙ্ক কিংবা মেদিনীপুরের সিপিআই ঘাঁটি কখন নিঃশব্দে উবে গিয়েছে কেউ টেরও পাননি। এদেরই একদল বলেছিল, আর জি কর ইস্যুতে এমন অরাজনৈতিক নাগরিক আন্দোলন নাকি একশো বছরেও দেখা যায়নি। আর একদল সুর  চড়িয়ে বলল, স্বাধীনতার পর এমন বিপ্লব নাকি হয়নি। এবার একটা কিছু হবেই। কিন্তু বাস্তবে জনমত পরীক্ষার সময় যখন এল, ১৩ নভেম্বরের উপ নির্বাচনে দেখা গেল তার কোনও প্রভাব ভোট রাজনীতিতে নেই। কবে পড়বে তাও কেউ জানে না। আগস্ট থেকে অক্টোবরের আন্দোলনের নিট ফল, বিরোধীরা রাত, ভোর, দুপুর কিংবা সন্ধ্যা, কিছুই দখল করার জায়গায় নেই। আপাতত হরেক বিরোধী রাজনৈতিক পতাকা ধারেভারে এবং পারস্পরিক আদর্শের সংঘাতে পশ্চাৎমুখী। কমরেডরাও নেতৃত্বের অভাবে ঘরবন্দি হয়ে থাকাকেই শ্রেয় মনে করছেন। টানা আড়াই মাসের বিক্ষিপ্ত নাগরিক আন্দোলনের কোরামিনেও সতেজ হয়নি তাঁদের নুয়ে পড়া শরীর ও মনোবল। উপ নির্বাচনের ফলাফল বেরনোর প্রায় এক সপ্তাহ আগেই হলফ করে বলা যায়, ৬ আসনের এই মিনি বিধানসভা ভোটেও রাম-বাম শিবিরকে শূন্যের কিনারায় বসে ঢেউ গুনে কাটাতে হবে। তথাকথিত নাগরিক ‘জনস্রোত’কে ভোটযন্ত্রে বন্দি করার ‘চিচিং ফাঁক’ তাঁদের অজানাই রয়ে গিয়েছে। বরং এতদিন যে লড়াই ত্রিমুখী ছিল, এবার তা চতুর্মুখী। অর্থাৎ আরও ভোট কাটাকাটির ফসল যাবে শাসকের ঘরে। ফল, বিরোধীরা ছত্রভঙ্গ।
সবচেয়ে আশ্চর্য উত্তরের গেরুয়া অধ্যুষিত চা বাগানেও রংবদল। উপ নির্বাচনের সকালে দেখাই মিলল না বিরোধীদের। মাত্র ছ’টি কেন্দ্রের জন্য সব মিলিয়ে ১০৮ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপ। দিল্লি সরকারের মদত। একগুচ্ছ এমপি, বিধায়ক, কী নেই। তবু দিনের শেষে সবটাই ফক্কা। হাজার কোম্পানি এলে বোধহয় ভালো হতো! অধিকাংশ কেন্দ্রেই বুথে বসানোর মতো এজেন্ট নেই। বিজেপির এরাজ্যে আগমার্কা আরএসএস ও ধান্দাবাজ দলবদলু মিলিয়ে নেতা কিছু আছে বটে। নেই মাটি কামড়ে পড়ে থাকার নিঃস্বার্থ কর্মী। বহু জায়গায় ১৩ নভেম্বর বেলা বাড়তেই রাস্তায় ক্যাম্প অফিসে বাচ্চাদের খেলতে দেখা গিয়েছে যেন শিশু দিবসের আগাম মজা। শাসক দলকে প্রত্যাঘাতের গোটা পরিকল্পনাটাই ফ্লপ হয়ে গিয়েছে বুঝে দিনভর বাড়িতেই বন্দি রইলেন চা বাগানে গেরুয়া শিবিরের প্রতিনিধি এমপি মনোজ টিগ্গা। ২৪টি বাগানে ৭৮টি বুথ। অধিকাংশই আলিপুরদুয়ারে, সামান্য কিছু জলপাইগুড়িতে। একের পর এক অরক্ষিত বুথ সামলাতে সকাল থেকেই দিশাহারা বিজেপি প্রার্থী রাহুল লোহার ছুটে বেড়ালেন এ বুথ থেকে অন্য বুথে। বিক্ষোভের মুখে পড়লেন চা বাগানে। আবারও প্রমাণ হল চা বাগানে গেরুয়া দলের সংগঠন ভেঙে পড়ছে দ্রুত। জন বারলার মতো নেতাও বিক্ষুব্ধ। বারবার দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। তাই বেঁচে থাকার তাগিদে চা শ্রমিকরা আনুগত্য পরিবর্তন করছেন। বছরের শুরুর সাধারণ নির্বাচনে মাদারিহাটে বিজেপি’র লিড ছিল ১১ হাজারের আশপাশে। কিন্তু যেভাবে দাপিয়ে ভোট করল শাসক তৃণমূল তাতে শেষপর্যন্ত আসন ধরে রাখা সম্ভব হবে তো বিজেপির পক্ষে? যদি মাদারিহাট তৃণমূল জেতে তাহলে আগামী ছাব্বিশ সালের বিধানসভা ভোটের আগে উত্তরে গেরুয়া দলের এই ভেঙে পড়া সংগঠনকে জোড়াতালি দেওয়া বেশ কঠিন হবে সুকান্তবাবুদের পক্ষে। 
কোচবিহারেও গেরুয়া সংগঠনের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়েছে। লোকসভা ভোটে বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিকের পরাজয় ইস্তক দল ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায়। একদা ফরওয়ার্ড ব্লকের গড় এখন পুরোপুরি তৃণমূলের দখলে। তাই সিতাইতে বিরাট ব্যবধানে জগদীশচন্দ্র বসুনিয়ার স্ত্রী সঙ্গীতার জয় শুধু ফল বেরনোর অপেক্ষা। বাকি রইল তালডাংরা ও মেদিনীপুর। সেখানেও কোনও মিরাকল আশা করা কঠিন। বলি, সিপিএম প্রার্থী তালডাংরার দেবকান্তি মহান্তি কি জেতার জন্য লড়ছেন, না দ্বিতীয় হওয়ার জন্য! নৈহাটি ও হাড়োয়া দু’জায়গাতেই তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান লাফিয়ে বাড়ছে। প্রশ্ন একটাই সব বিরোধী প্রার্থীর জামানত থাকবে তো? 
একটা ভাত টিপলেই বোঝা যায় হাঁড়ির চাল সিদ্ধ হয়েছে কি না। আর এ তো এক দু’টো নয়, ছ’-ছ’টা নানা আকৃতির হাঁড়ি। চালও হরেক কিসিমের, মিনিকিট থেকে বাসমতী। যার দু’টি উত্তরে, দু’টি বাঁকুড়া ও মেদিনীপুরে। বাকিটা শহর কলকাতার লাগোয়া উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটি ও হাড়োয়ায়। সিতাই মাদারিহাট পেরিয়ে মেদিনীপুর ও তালডাংরা। সব মিলিয়ে মোট ভোটার সংখ্যা এদেশের যে কোনও প্রথম সারির এক্সিট পোলের স্যাম্পেল সাইজের চেয়ে ঢের বেশি। উত্তরের চা বাগান থেকে শুরু করে নৈহাটির চটকল শ্রমিক এলাকা মেদিনীপুর শহরজুড়ে বিস্তৃত। তাই আগামী শনিবারের ফল নিঃসন্দেহে বিধানসভা দখলের মেগা লড়াইয়ের আগে সেমি ফাইনাল। সেই লড়াইয়ে যদি ৬-০ হয় তাহলে বোঝা যাবে ১৭ মাস পর বাংলার ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে। উত্তরবঙ্গে দ্রুত মাটি পুনরুদ্ধার করতে সফল হলে তৃণমূলের আসন সংখ্যা একুশ সালের রেকর্ডকেও যে অবলীলায় ছাড়িয়ে যাবে, তা বলাই বাহুল্য।  
আগস্ট মাস থেকে জনমনকে নাড়া দেওয়া এতবড় আন্দোলন। পথে প্রান্তরে বিচারের দাবি। কিন্তু গণতন্ত্রে রাস্তার নাগরিক আন্দোলনকে নথিভুক্ত রাজনৈতিক দলের ভোটবাক্সে সঙ্ঘবদ্ধ করতে না পারলে কোনও দাম নেই। প্রতিবাদ হল, রাত দখল হল কিন্তু তা কোনও সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দলের আন্দোলনে পরিণত হল না। এই ব্যর্থতার দায় তাবৎ বিরোধী দলকে নিতে হবে। বিজেপি প্রথম থেকেই এই আন্দোলনে ‘অড ম্যান আউট’। আর  সিপিএম ফেসবুকে আছে মানুষের মনের সিংহাসন থেকে সহস্র যোজন দূরে। 
১৬ মাস দূরে বিধানসভা ভোট। যত সময় এগচ্ছে বেশ বোঝা যাচ্ছে, আবারও অপ্রতিরোধ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বীরদর্পে চতুর্থবারের জন্য তিনি নবান্নের ১৪ তলার দিকে এগচ্ছেন। এ রাজ্যের সাড়ে ৭ কোটি ভোটার সেলিম, অধিকারীদের চেয়ে তাঁকে সহস্র গুণ বেশি বিশ্বাস করে প্রায় দেড় দশক সরকারে থাকার পরও। কারণ, আদিগঙ্গার পাড়ে বাংলার সাধারণ ঘরে বেড়ে ওঠা ওই মহিলার ইউএসপি একটাই। আপসহীন ও প্রতিবাদী। তাঁর নিজের কথায় আদ্যন্ত ‘স্ট্রিট ফাইটার’। এবং বাংলার জন্য ২৪×৭ নিবেদিতপ্রাণ। আজ যাঁরা মিম বানাচ্ছেন, তাঁরাই বাঙালির ইতিহাসের এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় নিয়ে একদিন গবেষণা করতে বাধ্য হবেন। সেটাই হবে বুদ্ধিজীবীদের পাপক্ষালন!
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ