Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিজেপির জুমলা মানিক বুঝলেও বোঝেনি বঙ্গ সিপিএম

‘যুবসাথী’ প্রকল্প এখন আর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়। ১ এপ্রিল থেকেই এই প্রকল্পে টাকা দেবে সরকার। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বর্ধিত ৫০০ টাকা পেতে শুরু করেছেন মা-বোনেরা। খেতমজুররা পাবেন বছরে চার হাজার টাকা।

বিজেপির জুমলা মানিক বুঝলেও বোঝেনি বঙ্গ সিপিএম
  • ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: ‘যুবসাথী’ প্রকল্প এখন আর নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়। ১ এপ্রিল থেকেই এই প্রকল্পে টাকা দেবে সরকার। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বর্ধিত ৫০০ টাকা পেতে শুরু করেছেন মা-বোনেরা। খেতমজুররা পাবেন বছরে চার হাজার টাকা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সমস্ত সামাজিক প্রকল্পই এখন পাড়ার মোড়ে, চায়ের দোকানে, সোশ্যাল মিডিয়ায় চর্চিত হচ্ছে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে এসআইআর নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর ‘সুপ্রিম সওয়াল’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইকে বঙ্গ সিপিএম নানাভাবে হেয় করতে চাইলেও প্রশংসা করেছেন ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। তৃণমূল সুপ্রিমোর এই লড়াই যে মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য সেটা মানিকবাবু উপলব্ধি করলেও বঙ্গ সিপিএম বুঝতে পারছে না। কারণ সিপিএমের লড়াই আর মাঠে-ময়দানে নেই, আছে আদালতে ও সোশ্যাল মিডিয়ায়।

Advertisement

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের সামাজিক প্রকল্পের সংখ্যা সেঞ্চুরি পার করেছে। তাঁর চালু করা বিভিন্ন প্রকল্প নকল করছে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি। একদা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে বিজেপি নেতারা ‘ভিক্ষে’ বলে কটাক্ষ করতেন। প্রকল্প চালুর সময় বলেছিলেন, ‘৫০০টাকা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার মা-বোনেদের ভিক্ষার লাইনে দাঁড় করাচ্ছেন’। এখন সেই বিজেপিই বলছে, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে অস্বীকার করা যায় না।’ সিপিএম সরাসরি লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বিরোধিতা করেনি। কিন্তু, ভাতা বা অনুদানের বদলে চাকরি ও বকেয়া ডিএ মেটানোর প্রসঙ্গ তুলে বিষয়টি লঘু করার চেষ্টা করেছে। 
এসব করেও বিরোধীরা হালে পানি পাচ্ছে না। একটা প্রকল্পের বিরোধিতা করার জন্য যুক্তি সাজানোর আগেই মুখ্যমন্ত্রী চালু করে দিচ্ছেন নতুন প্রকল্প। রাজ্য সরকারের সামাজিক প্রকল্পের সামনে খড়কুটোর মতো ভেসে যাচ্ছে বিরোধীদের যাবতীয় সমালোচনা। খেতমজুরদের জন্য অনুদানের ঘোষণা তৃণমূল সরকারের প্রতি প্রান্তিক মানুষের সমর্থনকে আরও দৃঢ় করবে। এর পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালে চালু হচ্ছে সন্ধ্যাকালীন আউটডোর। খেটেখাওয়া মানুষকে সরকারি চিকিৎসা দেওয়ার জন্য এমন ব্যবস্থা করা তো দূরের কথা, কোনো সরকার কল্পনাও করতে পারেনি। 
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শতাধিক জনমুখী প্রকল্পের ধাক্কায় বিরোধীদের দিশেহারা অবস্থা। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে মানুষের অধিকার রক্ষায় তাঁর আপসহীন লড়াই। নির্বাচন কমিশনের তুঘলকি পদক্ষেপে বাংলার মানুষ যখন নাজেহাল ঠিক তখনই মোক্ষম আঘাতটি হেনেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির নামে বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার যে পরিকল্পনা কমিশন করেছিল, তা তিনি ভেস্তে দিয়েছেন। মাইক্রো অবর্জাভারদের শিখণ্ডী করে বৈধ ভোটারদের নাম কাটার স্বপ্ন চুরমার হয়ে গিয়েছে। কারণ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা জানিয়ে দিয়েছেন, নাম বাতিলের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী এইআরও। অর্থাৎ কমিশন নিযুক্ত মাইক্রো অবর্জাভাররা আর হাতে মাথা কাটতে পারবেন না। 
সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশে চরম বিপাকে পড়েছে বিজেপি। লজিকাল ডিসক্রিপেন্সিতে সন্দেহজনক ভোটারের সংখ্যা দেড় কোটি ছাড়িয়ে যাওয়ায় তারা নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছিল। মনে করেছিল, নাম বাতিলের সংখ্যাটা তাদের দেওয়া টার্গেটের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। কিন্তু, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গুড়ে পড়েছে বালি। অনেকে বলছেন, নোটবন্দির মতোই এসআইআরে দুর্ভোগ ও হেনস্তা ছাড়া আর কিছুই জুটবে না। কালো টাকা নিকেশের আশ্বাস দিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করে নোটবন্দি করে মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়েছিল বিজেপি সরকার। কিন্তু, প্রায় পুরো টাকাই ব্যাংকে ফিরে এসেছিল। একইভাবে লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি করে যাঁদের বাদ দিতে চেয়েছিল তাঁরাও ফের স্বমহিমায় ভোটার তালিকায় প্রত্যাবর্তন করবেন।
লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির নামে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে সরব হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিনই বিচারপতিদের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছিল, সুপ্রিম রায়ে দূর হবে লক্ষ লক্ষ মানুষের ‘বেনাগরিক’ হওয়ার আতঙ্ক। অবশেষে তেমনই নির্দেশ দিয়েছে আদালত। তারজন্য ভুক্তভোগী থেকে দেশের তাবড় তাবড় নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কৃতিত্ব দিচ্ছেন। তাতেই বিরোধীদের যত গাত্রদাহ। সেই গায়ের জ্বালা মেটাতেই শুরু হয়েছে তৃণমূল সুপ্রিমোকে হেয় করার মরিয়া চেষ্টা। অখিল ভারত হিন্দু মহাসভার দাবি, মুখ্যমন্ত্রী সাংবিধানিকভাবে এই সওয়াল করতে পারেন না। 
বিজেপি ঘনিষ্ঠ এই সংগঠনটি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ছুটেছিল। তারা দাবি করেছিল, এসআইআর নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর এই সওয়াল ‘সাংবিধানিকভাবে অনুচিত’। কিন্তু দেশের প্রধান বিচারপতি সেই দাবিকে মান্যতা তো দেনইনি, উলটে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করবেন না।’ আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় লক্ষ লক্ষ মানুষকে স্বস্তি দিয়েছে। পাশাপাশি আদালত এও বুঝিয়ে দিয়েছে, কোনো স্বশাসিত সংস্থাই ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। যতই রক্ষাকবচ থাকুক না কেন, মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে নামতেই আলিমুদ্দিনের ম্যানেজাররা নানাভাবে তাঁকে হেয় করার চেষ্টা করেছেন। কখনো তাঁর এই লড়াইকে নাটক, কখনো মুখ্যমন্ত্রীর সওয়ালের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আর এখন? মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার মোস্তারি বানুকে সামনে এনে সিপিএম বলছে, এসআইআরের বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি করেছিলেন তিনিই। এই দাবি করে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইকে ছোটো করা সম্ভব? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সওয়ালের কারণেই কমিশনের ‘তুঘলকি’ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাংলার লড়াই যে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে, সেটা সিপিএম না মানলেও গোটা দেশ জানে।
বঙ্গ সিপিএম মমতা ব঩ন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইকে নানানভাবে হ্যাটা করতে চাইলেও সহমত হননি ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। সুপ্রিম কোর্টে আরও আগে যাওয়া উচিত ছিল দাবি করেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই লড়াইকে কুর্নিশ জানিয়েছেন তিনি। মানিকবাবুর বক্তব্য, ‘দেরি হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে প্রতিবাদটা করার চেষ্টা করেছেন, সেটাকে আমি খাটো করে দেখতে চাইছি না। উনি কার্যকরী উদ্যোগ নিয়েছেন।’
মানিকবাবুর মন্তব্য বঙ্গ রাজনীতিতে আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। একুশের নির্বাচনেও মানিকবাবু এরাজ্যে প্রচারে এসে বিজেপির ‘জুমলা’র বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। তখন এক সাক্ষাৎকারে বিজেপি কীভাবে ‘চলো পাল্টাই’ স্লোগান দিয়ে ত্রিপুরার মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল, সেকথা তথ্য সহকারে তুলে ধরেছিলেন। ত্রিপুরায় পালাবদলের আগে বিজেপি প্রচার করেছিল, রাজ্যে ৫০ হাজার সরকারি পদ ফাঁকা পড়ে আছে। রাজ্যে ডবল ইঞ্জিন সরকার হলে সেই সব পদে নিয়োগ হবে। প্রতিটি পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়া হবে। সেই প্রচারে মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছিল। আমরা মানুষকে বিজেপির জুমলা সম্পর্কে বোঝানোর অনেক চেষ্টাও করেছিলাম। কিন্তু পারিনি। 
একুশের ভোটে বিজেপির দেওয়া ‘সোনার বাংলা’ গড়ার প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে মানিকবাবু বলেছিলেন, ‘বিজেপি গোটা দেশটার সর্বনাশ করছে। ওরা বাংলার ভালো করবে কী করে? বিজেপির ডবল ইঞ্জিন এর ফাঁদে পা দিয়ে ত্রিপুরাবাসী হাত কামড়াচ্ছেন। আমার অনুরোধ, বাংলার মানুষ যেন সেই একই ভুল না করে।’
শুধু মানিক সরকার নন, বিজেপির বিপদটা বুঝেছেন শাসনের সিপিএম নেতা মজিদ মাস্টারও। তাঁর উপলব্ধি, বিজেপিকে ঠেকাতে গেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত শক্ত করতে হবে। কারণ বিজেপির বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনিই। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুধু বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন না, তিনি গরিব মানুষের স্বার্থে কাজ করে চলেছেন। তাই দশকের পর দশক লাল ঝাণ্ডা কাঁধে নিয়ে চলা মানুষটাও বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘একুশের নির্বাচনে বিজেপিকে ঠেকাতে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছি, ছাব্বিশেও দেব।’ 
ক্ষমতায় ফেরার লোভে ২০১৬ সালে কংগ্রেসের হাত ধরেছিল সিপিএম। একুশে ধরেছিল মৌলবাদীদের হাত। তাতে হয়েছে শূন্য। এই অবস্থায় ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন আলিমুদ্দিনের ম্যানেজাররাও সম্ভবত দেখেন না। ‘একটু জায়গা দাও মাগো বিধানসভায় গিয়ে বসি’র বাসনা নিয়েই হুমায়ূন কবীরের সঙ্গে  গোপনে বৈঠক সেরেছেন মহম্মদ সেলিম। তবে, ক্ষমতায় ফেরার খোয়াব না দেখলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ক্ষমতাচ্যুত করার ভূত সিপিএমের ঘাড় থেকে নামেনি। রাজ্যপাট হারানোর ক্ষোভের আগুন সিপিএম নেতাদের বুকে রাবণের চিতার মতো অহর্নিশি জ্বলছে। সেই কারণেই বিজেপির জুমলা ত্রিপুরার ‘মানিক’ উপলব্ধি করলেও বঙ্গ সিপিএমের ‘রতন’রা তা মানতে চাইছেন না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ