নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: বারাসত মহকুমার ভোটের ফলাফল এক রাজনৈতিক পালাবদলের ইঙ্গিতবাহী অধ্যায়। যে অঞ্চলে এতদিন তৃণমূল কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সেই জমিতেই এবার গেরুয়া শিবিরের দৃশ্যমান উত্থান। ছাব্বিশের ফলাফল বলছে, লড়াই এখন আর একতরফা নয়, বরং সরাসরি মোকাবিলার। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে বারাসত বিধানসভা কেন্দ্রে। এই প্রথম তৃণমূলকে পরাজিত করে বিজেপির টিকিটে বিধায়ক হলেন শংকর চট্টোপাধ্যায়। তৃণমূল প্রার্থী সব্যসাচী দত্তকে তিনি ৩০ হাজারেরও বেশি ভোটে হারিয়েছেন। এক সময়ের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি ভেঙে এই জয় বিজেপির কাছে কেবল একটি আসন জয় নয়, বরং সংগঠনের দীর্ঘদিনের বিস্তার ও তৃণমূল স্তরে কাজের প্রতিফলন বলেই মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই জয় ভবিষ্যতের লড়াইয়ে বিজেপিকে বাড়তি অক্সিজেন জোগাবে।
শংকরের কথায়, মানুষই আমার কাছে শেষ কথা। যেভাবে মানুষ আমাকে ভালোবাসা আর আশীর্বাদ করেছেন, তা পূরণ করব। এর অন্যথা হবে না। মধ্যমগ্রাম কেন্দ্র কার্যত রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর ২,৩৯৯ ভোটে তৃণমূল প্রার্থী রথীন ঘোষ জয়ী হলেও গণনার শেষ পর্বে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ, বিজেপি কর্মীরা গণনা কেন্দ্রে ঢুকে তৃণমূলের এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয় এবং প্রার্থী রথীন ঘোষকেও হেনস্তা করা হয়। এই ঘটনায় দু’দফায় গণনা বন্ধ রাখতে হয়। তৃণমূলের এই অভিযোগ গুরুতর হলেও, বিজেপির পালটা দাবি— জনসমর্থনের চাপে তৃণমূল ভীত হয়ে এমন অভিযোগ তুলছে। ফলে এই কেন্দ্রের ফলাফল ঘিরে বিতর্ক এবং উত্তেজনা দুই তুঙ্গে। এদিকে, আমডাঙা কেন্দ্রেও একই চিত্র। ১৮ রাউন্ড শেষে তৃণমূল প্রার্থী কাশেম সিদ্দিকি মাত্র ৪ হাজার ৯ ভোটে এগিয়েছিলেন। পরে তাঁর লিড বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৪০৬ ভোট। তিনি পেয়েছেন ৭২,১২৩ ভোট। আর বিজেপির অরিন্দম দে পেয়েছেন ৬৬ হাজার ৭১৭ ভোট। ব্যবধান কম হলেও এই কেন্দ্রে বিজেপির ধারাবাহিক অগ্রগতি স্পষ্ট। আগে এখানে তৃণমূলের পক্ষে ব্যবধান ছিল দশ হাজার। দেগঙ্গা কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থী আনিসুর রহমান ১৭ হাজার ৮১৮ ভোটে জয়ী হয়ে দলকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও এখানে আগের মতো একতরফা জয়ের ছবি নেই। বারাসত মহকুমার অধীনে থাকা ছ’টি বিধানসভা কেন্দ্র— মধ্যমগ্রাম, বারাসত, আমডাঙা, দেগঙ্গা, হাবড়া ও অশোকনগরে ২০২১ সালেও জিতেছিল তৃণমূল। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে জয়ের ব্যবধান ছিল ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজারের বেশি। কিন্তু, এবারের ফলাফল সেই ছবিকে আমূল বদলে দিয়েছে। তৃণমূল এখনও কয়েকটি কেন্দ্রে এগিয়ে বা জয়ী হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজেপির উল্লেখযোগ্য ভোটবৃদ্ধি এবং শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওয়াকিবহাল মহল বলছে, এই ফল বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতার প্রতিফলন। যেখানে শাসকদলের শক্ত ঘাঁটিতেও বিরোধী শক্তি ধীরে ধীরে জমি তৈরি করছে। বারাসতের ফলাফল তাই রাজ্যের সামগ্রিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তৃণমূলের জন্যও এটি সতর্কবার্তা। বিজেপির ক্ষেত্রে এটি অগ্রগতির সোপান। সব মিলিয়ে, বারাসত মহকুমায় এবারের ভোট যেন এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। এখানে একচ্ছত্র আধিপত্যের জায়গায় এসেছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে এখন স্পষ্টভাবেই উঠে এসেছে গেরুয়া শিবির। আগামী দিনে এই অঞ্চলে রাজনৈতিক সংঘাত ও কৌশল— দু’টিই যে আরও তীব্র হবে, তা বলাই বাহুল্য।