


অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণগঞ্জ: প্রবাদ আছে, ‘চূর্ণী ভাঙে, আবার গড়ে’। কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভার অন্তর্গত এলাকা দিয়ে বয়ে চলা এই চূর্ণীর পাড়েই একদা গড়ে উঠেছিল ‘লাল দুর্গ’, সেই দুর্গ আবার ভেঙেও পড়েছিল। ২০০৯ সালের পর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি বামেদের সেই দুর্গ। তখন থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টানা কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভায় ঘাসফুল ফুটে রয়েছে। তৃণমূল বিধায়ক সত্যজিৎ বিশ্বাস খুন হওয়ার পর এই কেন্দ্রেও ঘাসফুলের দুর্গে ফাটল ধরে। এখন কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভা বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। তবে চূর্ণীর পাড়ে এই মতুয়া গড়ে এখন ক্ষোভের পাহাড়। আরও একটা প্রবাদ আছে, ‘চূর্ণী রাগলে ঘর থাকে না’। সেই রাগ এখন চূর্ণীর বিস্তীর্ণ দু’ পাড়ে। সৌজন্যে এসআইআর। তাই ঘর সামলানো এখন চ্যালেঞ্জ পদ্ম শিবিরের। অধিকারহরণ নিয়ে মতুয়া ক্ষোভেই বিজেপির ‘পতন’-এর প্রহর গুনছে তৃণমূল। একদিকে বিজেপির যুবনেতা সুকান্ত বিশ্বাস, অন্যদিকে তৃণমূলের বর্ষীয়ান বিধায়ক সমীর পোদ্দারের মধ্যে লড়াইয়ে কার পতন হয়, তাই দেখার।
কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভার হাঁসখালি এবং কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকে প্রায় ৪০ শতাংশ মতুয়া ভোট রয়েছে। যা নির্বাচনে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। এই ভোট যে দিকে যাবে, পাল্লা তারই ভারী। রানাঘাট উত্তর পূর্ব বিধানসভার তৃণমূলের প্রাক্তন বিধায়ক তথা মতুয়া মুখ সমীর পোদ্দার টানা একমাস গলায় গামছা ঝুলিয়ে কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভায় ঘুরে এসআইআরের মাধ্যমে মতুয়াদের অধিকারহরণের বিরুদ্ধে ‘আন্দোলন’ জোরদার করেছেন। এই কেন্দ্রে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার চললেও বিজেপির বিদায়ী বিধায়ককে সেভাবে পাননি কৃষ্ণগঞ্জবাসী। সেই ক্ষোভকে ইভিএমে নিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য ঘাসফুল শিবিরের।
কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভায় ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ২১,২৭৭ ভোটে জয়ী হয়েছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই বিধানসভা ২৭ হাজার ভোটে বিজেপিকে লিড দিয়েছিল। এসআইআরের কারণে বহু মানুষ হয়রানির মুখে পড়েছিলেন। যার মধ্যে মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষই বেশি। সব মিলিয়ে এই কেন্দ্রে ৩১,২৭৯ জন ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। যার মধ্যে ১৫,৫৫২ জন বিচারাধীন ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। যে কারণে ক্ষোভে ফুঁসছেন মতুয়ারা। শিবনিবাস, দক্ষিণপাড়া, তারকনগর সহ বিভিন্ন এলাকায় ভোটাধিকার হারানোর ক্ষত দগদগ করছে। ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্ক তাড়া করছে। যদিও বিজেপির তরফে, নাম বাদের জন্য রাজ্য সরকারকেই দায়ী করে ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাদকুল্লার বাজপুকুরের বাসিন্দা মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রশান্ত বিশ্বাসের পরিবারের সকলের নাম বাদ গিয়েছে। তাঁর মা-বাবা এবং স্ত্রী-ছেলে এখন কমিশনের চোখে ‘বেনাগরিক’। আফশোসের সুরে তিনি শুধু একটা কথা বলছেন, ‘ভোটই যখন থাকল না, তাহলে ভোট নিয়ে ভেবে কী করব?’ তাঁর দাবি, ১৯৭১ সালের জমির দলিল, ছেলের পাসপোর্ট ও জাতিগত শংসাপত্র দেওয়ার পরেও এদেশের মানুষ হতে পারলেন না তিনি।
কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভায় বিজেপির প্রতিশ্রুতিতে ভরসা করে অনেকেই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেছিলেন। শংসাপত্রও পেয়েছেন অনেকে। আবার অনেকের আবেদন এখনও ফাইলবন্দি। দক্ষিণপাড়ার সরেন পাল, গণেশচন্দ্র অধিকারী, যোগেন অধিকারীদের আতঙ্কে দিন কাটছে। রাজনৈতিক মহলের দাবি, মতুয়া সম্প্রদায়ের যাঁরা ভোট দিতে পারছেন না, তার প্রভাব ভোটাধিকার থাকা মতুয়াদের কতটা প্রভাবিত করবে সেটাই দেখার। এমনকী গেদে এলাকায় কমিশন নির্ধারিত নথি জমি দিয়ে মহিলাদের নাম বাদের প্রবণতাও দেখা গিয়েছিল। নির্বাচনের মধ্যে এই কেন্দ্রেই ছেলের নাম না ওঠায় ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্কে মৃত্যু হয়েছিল জাহান আলির। কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের তৃণমূলের সভাপতি সমীর বিশ্বাস বলেন, ‘মানুষ বিজেপির আসল রূপ দেখে ফেলেছে। একদিকে বিজেপি মানুষের অধিকার কাড়ছে। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী মানুষের অধিকার রক্ষায় লড়াই করছে। এটা মানুষ দেখতে পাচ্ছে। বিজেপির পতন এবার নিশ্চিত।’
রানাঘাট সাংগঠনিক জেলার বিজেপির সভানেত্রী অপর্ণা নন্দী বলেন, গতবার যে মার্জিনে কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভায় আমরা জয়ী হয়েছিলাম, তার থেকেও বেশি ভোটে এবার আমরা জিতব। মানুষ এককাট্টা হয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দেবেন।