রাহুল চক্রবর্তী, কলকাতা: যে-দল বছরভর মানুষের পাশে থাকে, ভোটের সময় সেই দলের প্রতিই সমর্থন জ্ঞাপন করে আম জনতা। এটাই দস্তুর। এটাই সহজ অঙ্ক। আর ঠিক এই প্রেক্ষাপটে ভোটমুখী বাংলায় ভোটের ইস্যু নিয়ে একটি অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট তৈরি করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাতে দাবি করা হয়েছে, বিজেপির কাছে লড়াইয়ের ইস্যু নেই। ওদের বস্তাপচা ইস্যুগুলোও আর ধোপে টিকছে না। সেখানে তৃণমূলের প্রধান নির্বাচনি অস্ত্র এসআইআরে মানুষের পাশে থেকে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আর রাজ্য সরকারের উন্নয়নগুলি তুলে ধরা। বিধানসভা কেন্দ্র ধরে ধরে কোন অঞ্চলে, কী কী উন্নয়ন হয়েছে, এলাকার মানুষকে সেসব সবিস্তারে জানানো।
রাজনৈতিক মহলের অনুমান, এসআইআর পর্ব শেষ হলেই বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করে দেবে কমিশন। তাই রাজনৈতিক দলগুলির হাতে সময় আর বেশি নেই। ইতিমধ্যে ভোটকেন্দ্রিক যাবতীয় প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে তারা। প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও চলছে জোরকদমে। কোন ইস্যুতে ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে লড়াই হবে, তার একটি তথ্য রাজ্যের শাসক দলের পক্ষ থেকে তৈরি করা হয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্ব বলছেন, নির্বাচনি ইস্যু হারিয়ে অন্ধকারে হাতড়াচ্ছে বিজেপি। কেননা তাদের দুর্নীতি সংক্রান্ত অভিযোগগুলি এখন বস্তাপচা ইস্যু মাত্র। উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলিতে বিজেপির তরফে তোলা দুর্নীতির সমস্ত আওয়াজই মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছিল। রাজ্যের শাসক দলের নেতাদের যুক্তি, কোথাও যদি অনিয়ম ঘটে থাকে তার জন্য রাজ্য প্রশাসন যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছে। সেটা বাংলার মানুষই দেখেছে। অন্যদিকে, বিজেপির হাতে এখন আর কোনো আইনশৃঙ্খলার অবনতির ইস্যু নেই। এমনটাই মনে করছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। সেক্ষেত্রে শাসক দলের নেতাদের যুক্তি, বাংলার মানুষ দেখছে যে কেন্দ্রের রিপোর্টেই নিরাপদতম শহরের তকমা এখন কলকাতার মুকুটে। ফলে বিজেপি নেতাদের অভিযোগ কার্যত ভুলই প্রমাণিত হচ্ছে। তাছাড়া দুর্গাপুজো হোক বা যেকোনো উৎসবে এবং বছরভর বাংলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথেষ্ট সন্তোষজনক। ফলে বিজেপি নেতারা কোন ইস্যুতে লড়াই করবেন, তা নিয়েই এখন তাঁরা দ্বিধায়।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটে তৃণমূলের কাছে যেন শাপে বর হয়ে এসেছে এসআইআর। ঘটনাচক্রে এনিয়েই বিজেপি প্রথম থেকে আওয়াজ তুলেছিল এবং তারা ভেবেছিল এসআইআরকে কেন্দ্র করেই তৃণমূলকে বড়োসড়ো চাপে ফেলে দেওয়া যাবে। কিন্তু এসআইআরের নামে সাধারণ মানুষের হয়রানি এবং যন্ত্রণার দুর্বিষহ ছবিটা কার্যত বিজেপিরই বিরুদ্ধে গিয়েছে। দাবি রাজনৈতিক মহলের। এসআইআর ইস্যুটাকে ধরতে তৃণমূল দেরিও করেনি। এসআইআর পর্বে বাংলার মানুষের পাশে থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে জোড়াফুল শিবির। তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের একটা বড়ো অংশের সমর্থন রাজ্যের শাসক দল ইতিমধ্যে কুড়িয়ে নিয়েছে। ছাব্বিশের লড়াইতে তৃণমূল এসআইআরটাকেই বিশেষ প্রাধান্য দিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে তারা বলছে, যারা সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চাইছে, সেই বিজেপিকে একটিও ভোট নয়। এই প্রেক্ষাপটেই প্রতিটি জনসভায় তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, আগামী ভোট প্রতিবাদের ভোট, প্রতিরোধের ভোট, বিজেপিকে শিক্ষা দেওয়ার ভোট।
ঘটনাচক্রে এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের যে রায় সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে মানুষের স্বার্থে তাঁদের লড়াইয়েরই জয় বলে দেখছে তৃণমূল। এও দেখা গিয়েছে, এসআইআর পর্বে রাজ্যের ৮১ হাজার বুথেই দলীয় কর্মীদের সক্রিয় করতে পেরেছে তৃণমূল। মোদ্দা বিষয় হল, সর্বত্র সক্রিয় ভূমিকায় দল—আন্দোলনমুখী এবং রীতিমতো রাস্তায়। ফলে মানুষের কাছে ভোট চাইতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের কোনো অসুবিধা নেই। অন্যদিকে, পদে পদে প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপিকে।