রাহুল চক্রবর্তী, কলকাতা: অঙ্ক বনাম রসায়ন। ছব্বিশের ভোটযুদ্ধে খাতায়-কলমে এখন এই দুটি বিষয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বিজেপির ভোটকৌশলে এখন অঙ্কের কারসাজি! কেননা বিজেপির বক্তব্য শুরু থেকেই কিছু সংখ্যাতত্ত্বনির্ভর। এসআইআর প্রক্রিয়ার শুরু এবং ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার আগে থেকেই এই সংখ্যার কাটাছেঁড়া চলছে বিজেপিতে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা দেখেছেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে রাজ্যের প্রথম শ্রেণির নেতা—অনেকেই দাবি করেছেন এসআইআরে ১.২০ কোটি ভোটারের নাম বাদ যাবে! সবটা যে অঙ্ক কষেই বলা হচ্ছে, তা অনেক বিশ্লেষকের কাছেই পরিষ্কার। এসআইআর প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে এগোনোর সময় বিজেপির দাবিতেই যেন সিলমোহর পড়ে যাচ্ছে! প্রথমে ৫৮.২ লক্ষ লোকের নাম বাদ। পরবর্তীকালে ৬০ লক্ষ নাম ‘বিচারাধীন’। শেষপর্যন্ত কত নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে, সেটাও একটা অঙ্ক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, মুসলিম সমাজকেই টার্গেট করা হয়েছে বলে মূল অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। সমাজের এই অংশের মানুষের উপর ক্রমাগত আক্রমণ নেমে আসছে। মালদহ, মুর্শিদাবাদসহ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলিতেই নাম বাদের চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ। এই গোটা পরিকল্পনার পিছনে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত, হিসাব-নিকাশ করেই এগোচ্ছে মোদির পার্টি। কিন্তু এতসবের পরেও অঙ্ক না মিললে বিজেপি যে বিপুলভাবে ধরাশায়ী হবে, সেটাও স্পষ্ট করে বলছেন বিশ্লেষকরা। ঘটনাপ্রবাহ যে সেদিকেই যাচ্ছে, তারও ইঙ্গিত মিলেছে।
সেক্ষেত্র যুক্তি, অঙ্ক মেলানো একটু কঠিন হয়ে যাচ্ছে বুঝেই বিজেপি এবার নিজেদের টার্গেটও কমিয়ে দিয়েছে। গতবার ‘দুশো পার’ ঘোষণা দিয়ে পেয়েছিল ৭৭। এবার ১৭০ আসন জয়ের টার্গেটে নেমে এসেছে মোদি-শাহ জুটি। এখানেই তৃণমূলের কটাক্ষ, এবারের অঙ্কটা বিজেপির পক্ষে খুবই কঠিন। বিজেপি মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, ভৌগোলিক পরিবেশ, ইতিহাস, অঙ্ক সবেতেই স্পষ্ট, এবার বিজেপির নেতৃত্বে জনগণের সরকার গঠিত হবে।
অন্যদিকে, তৃণমূলের কাছে এবারের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে কেমিস্ট্রি বা রসায়ন। বাংলার আপামর সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্প্রীতি ও ঐক্যের বন্ধনকে আরও আঁটোসাঁটো করার দিকে প্রথম দিন থেকেই জোর দিয়ে আসছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা প্রতিটি সভাতেই জোর গলায় দাবি করেছেন, এবার শুধুমাত্র একটা বিধানসভা নির্বাচন হিসাবে দেখলেই চলবে না, এই ভোটটা হল বাংলাকে রক্ষা করার। তাঁদের বক্তব্য স্পষ্ট করে দিচ্ছে, মানুষের উন্নয়ন এবং পারস্পরিক সৌহার্দের পরিবেশটাই আগামী দিনে বজায় থাকুক, এটাই প্রধান লক্ষ্য। আর সেই কাজে তৃণমূল যে বেশ খানিকটা সমর্থন বাংলার মানুষের কাছ থেকে আদায় করে নিয়েছেন, তা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কথাতেই পরিষ্কার।
তাঁরা বলছেন, প্রথমত, বাংলা ভাষায় কথা বলার ‘অপরাধে’ বাঙালিদের উপর অত্যাচার হয়েছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে। এই দৃষ্টান্ত বিজেপির বিরুদ্ধেই যাবে। আবার যে বাড়িতে ভোটার তালিকা থেকে মা-বাবার নাম বাদ গিয়েছে, সেখানে ছেলে-মেয়েরা কখনোই বিজেপিকে ভোট দেবেন না। এটাও মোটামুটি অনুভব করছেন রাজনীতির কারবারিরা। ফলে বিজেপির উপর চাপটা যেন ক্রমশই বাড়ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের প্রতি মানুষের সমর্থন বৃদ্ধির কারণ, উন্নয়ন ছাড়া, বাংলায় দুর্গাপুজো, বড়োদিন থেকে ইদ সমস্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠান সকলে সমানভাবে পালনের সুযোগ পান। নানা উৎসবের আনন্দ মেতে ওঠেন অভিন্নহৃদয় মানুষজন। আবার খিচুড়িভক্ষণ থেকে বিরিয়ানির স্বাদগ্রহণ, কোথাও কোনো ভাগাভাগি থাকে না।
তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, বাংলার মানুষের সঙ্গে তৃণমূলের সম্পর্কের রসায়ন মসৃণ এবং গভীর। এবার বাংলার মানুষ তৃণমূলের প্রতি তাঁদের উজাড় করা সমর্থনই দেবেন। তারা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জোড়াফুলের উপরই আস্থা রাখেন।