গিরগিটি রং বদলাতে পারে কে না জানে! এছাড়া আর কোনও প্রাণী কি রং বদলাতে পারে না? এমন অনেক পাখি আছে, যারা ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এবং শিকারির হাত থেকে বাঁচতে দেহের রঙে বদল আনতে পারে। এ যেন প্রকৃতির বিস্ময়! সেইরকমই একঝাঁক বিদেশি পাখির খোঁজ দিলেন স্বরূপ কুলভী।
প্রকৃতির পরতে পরতে বিস্ময়। একটু খেয়াল করলেই কত বিচিত্র বিষয়ই না ধরা পড়ে। নিজেকে উজাড় করে সাজিয়েছে প্রকৃতি। যদিও সমস্ত কিছুর পিছনেই রয়েছে বৈজ্ঞানিক কারণ। আমরা সবাই জানি, গিরগিটি রং বদলায়। শিকারির হাত থেকে বাঁচতে, শিকার ধরতে, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলার মতো কারণে গিরগিটির এই রং বদলের ক্ষমতা রয়েছে। শুধু কি গিরগিটি! এমন অনেক পাখি রয়েছে, যারা সময়ের সঙ্গে নিজেদের জায়গা বদল করে। এই তো শীত আসছে। এখন আমাদের দেশের বিভিন্ন জায়গায় পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়। আবার অনেক পাখি ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের রংও বদলে ফেলে। এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে টিকে থাকার তাগিদ। এভাবে ওরা পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেয়। শিকারির কড়া নজরকেও ফাঁকি দিতে পারে। এছাড়াও সঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগও গড়ে তুলতে পারে। তবে কোনও কোনও পাখির এই ভোলবদল চোখে পড়ার মতো হলেও কিছু পাখির আবার রং পরিবর্তন খুবই সূক্ষ্ম। খুব ভালো করে খেয়াল করলে তবেই এই বদল চোখে পড়ে। যাইহোক, এই ক্ষমতা ওদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। একঝলকে এমন কয়েকটি পাখির কথা জেনে নেওয়া যাক।
১) স্নোয়ি আউল
এই প্রজাতির পেঁচার বসবাস মূলত তুন্দ্রা অঞ্চলে। তুষার ঢাকা এই পরিবেশের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই এদের পালকের রং সাদা। উজ্জ্বল সাদা রঙের পালক বরফের সঙ্গে নিজেদের মিশিয়ে ফেলতে সাহায্য করে। কিন্তু পালকের এই রং সারা বছর সাদা থাকে না। গ্রীষ্মে বরফ গলে। বরফে ঢাকা পাথর উন্মুক্ত হয়ে যায়। সঙ্গে জন্মায় বিক্ষিপ্ত গাছপালা। ওই বদলে যাওয়া পরিবেশের সঙ্গে তাল রেখে তুষার পেঁচার পালকে গাঢ় ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। বিশেষ করে স্ত্রী ও অল্পবয়সি তুষার পেঁচার পালকে এই পরিবর্তন চোখে পড়ে। আর তা তুন্দ্রা অঞ্চলে গ্রীষ্মের পরিবর্তিত ভূ-প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের মিশিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারে এই প্রজাতির পেঁচা।
২) রাফ পাখি
রাফ এক ধরনের পরিযায়ী জলচর পাখি। মূলত উত্তর ইউরেশিয়ার জলাভূমি ও জলমগ্ন তৃণভূমিতে এদের বসবাস। সারাবছর এমনিতে এদের পালক বাদামি রঙের। কিন্তু বসন্ত এলেই নাটকীয় পরিবর্তন। গলার কাছে গজিয়ে ওঠে উজ্জ্বল রঙিন পালক। কালো, সাদা, ধূসর ও সোনালির মতো বাহারি রঙে যেন সেজে ওঠে রাফ। বসন্তেই এরা ডিম পাড়ে। এরপরই তারা আবার নিজেদের আসল রং ফিরে পায়।
৩) বোহেমিয়ান ওয়াক্সউইং
উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার উত্তরাঞ্চলে এই পাখির বসবাস। ঋতু বদলের সঙ্গে এদের পালকের রংও পরিবর্তন হয়। তবে তা খুব একটা নজরে পড়ার মতো নয়। শীতকালে এই পাখির পালকে থাকে ধূসর ও বাদামি রঙের মিশেল। শীতে এদের বসবাসের অঞ্চল বরফে ঢেকে যায়। সঙ্গে বিক্ষিপ্ত গাছপালা। এই পরিবেশের সঙ্গে রাফ পাখি মিশে যেতে পারে তাদের রঙের জন্য। কিন্তু বসন্ত এলেই ডানায় দেখা যায় লালচে টিপ। ঝুঁটির গঠন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
৪) লং-টেলড ডাক
এটি এক ধরনের সামুদ্রিক হাঁস। মূলত আর্কটিক অঞ্চল এদের বাসভূমি। এদের পালকের রং শীতে একরকম, আর গরমে অন্য রকম। শীতকালে এই প্রজাতির পুরুষ হাঁসের থাকে সাদা ও কালো পালক। সেইসঙ্গে দর্শনীয় লম্বা লেজ। গ্রীষ্ম এলেই পালকের রং হয়ে ওঠে বাদামি-ধূসর। এই রং তুন্দ্রার পরিবর্তিত পরিবেশে তাদের শিকারিদের নজর এড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে। এই প্রজাতির স্ত্রী হাঁসদের অবশ্য পালকের রঙে হালকা পরিবর্তন হয়।
৫) স্কারলেট ট্যানাজার
আমেরিকার উত্তর অঞ্চলে এই পাখির বসবাস। গ্রীষ্মকালে এই প্রজাতির পুরুষ পাখির শরীরের রং গাঢ় লাল আর দু’টি ডানা কালো। কিন্তু তারপর এদের উজ্জ্বল রং ক্রমশ হালকা হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ডানা হয়ে ওঠে হলদেটে-সবুজ। তখন আর স্ত্রী ও পুরুষদের কোনও তফাত থাকে না। এই নিষ্প্রভ রং পরিযায়ী যাত্রার সময় এদের নিরাপদ থাকতে সাহায্য করে। স্ত্রী স্কারলেট ট্যানাজারদের রংও সামান্য বদলে যায়।
৬) রক পিটারমিগান
এই প্রজাতির পাখিদের বসবাস মূলত আর্কটিক, সাব-আর্কটিক, ইউরেশিয়া ও উত্তর আমেরিকা জুড়ে। আশপাশের ভূ-প্রকৃতির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এই পাখি পালকের রং বদলায়। এর মাধ্যমে পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মিশিয়ে ফেলতে পারে। শীতে বরফাবৃত পরিবেশে শিকারিদের নজর থেকে আড়াল রাখে এদের পালকের সাদা রং। বসন্তে পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পালকের রং হয়ে ওঠে ধূসর ও বাদামি। আর পুরুষ পাখিদের চোখের কাছে ফুটে ওঠে লালচে ছোপ।
৭) স্নো বান্টিং
আর্কটিক অঞ্চলের আরও এক ধরনের পরিযায়ী পাখি। শীতে পুরুষ স্নো বান্টিং তুষার শুভ্র সাদা রঙের জন্য বিখ্যাত। তবে এদের ডানা কালো রঙের। গ্রীষ্ম আসার পর বরফ গলার সঙ্গে সঙ্গে স্নো বান্টিংয়ের পালক বাদামি হয়ে ওঠে। বরফ গলা পাথুরে জমিতে তাদের আড়াল রাখতে সহায়ক হয়ে ওঠে ওই রং। স্ত্রী স্নো বান্টিং পাখিদের পালকের রংও হালকা থেকে গাঢ় হয়ে ওঠে।