অমর মিত্র: এই বছর কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার বয়স ৪৮ হল। এর আরম্ভ থেকেই আছি। আছি মানে গিয়েছি। সেই রবীন্দ্র সদনের উল্টোদিকে, এখন যা মোহরকুঞ্জ, যেখানে বসেছিল বইয়ের এই অভিনব মেলা, সেখান থেকেই আছি। লম্বা টিকিটের লাইন। আমি তখন একটি দু’টি গল্প লিখেছি মাত্র, অখণ্ড মেদিনীপুর জেলার দূর এক গ্রামে অফিস। বসে বসে ভাবি লিখব। সেই আমি মেলা এলে দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে কলকাতা চলে আসতাম। লাইনে গুঁতোগুঁতি করে যা তখন ছিল প্রায় ৪১ পয়সায় হিট সিনেমার লাইনের মতো, মেলায় ঢুকে পড়ে শ্বাস নিতাম। সোয়েটার ঠিক করে নিয়ে এক পা এগিয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড। সবই বইয়ের দোকান। মস্ত এক কলেজ স্ট্রিট এসে পড়েছে সেই সবুজ মাঠের উপর। ক্রেতারা ঘুরছেন স্টলে স্টলে। লেখক-কবি ঘুরছেন, পণ্ডিত-অধ্যাপক ঘুরছেন ক্রীত বইয়ের সম্ভার ব্যাগে ভরে। একদিন দেখি আমাদের বস। জেলা সেটেলমেন্ট অফিসার দু’জন বন্ধু নিয়ে ঘুরছেন মেলায়। একই স্টলে তিনি ও আমি। লুকিয়ে পড়ব? অফিস পালিয়ে সপ্তাহের মধ্যভাগে আমি কলকাতায় কেন? তিনি তো কলকাতায় আসেনই। মন্ত্রীর সঙ্গে মিটিং, আরও কত মিটিং, আমি যাই তাঁর ডাকা মিটিংয়ে জেলা সদরে। তিনি লক্ষ করেছেন আমাকে। বুক দুর দুর করে উঠল। তিনি কি আমাকে চিনেছেন? চিনবেন নিশ্চয়ই, মাসে একবার তাঁর ঘরে হাজির হয়ে সকলের সঙ্গে আমাকেও দিতে হয় কাজের হিসেব। মেলা সেদিন জমল না। মনে একটা কিন্তু কিন্তু ভাব রয়ে গেল। ভয় করতে লাগল। পরের দিন শনিবার। শনিবার কি আমি ফিরে যাব কাজের জায়গায়? সেই বাংলা, বিহার, ওড়িশার সীমান্তে বাস থেকে নেমে এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট পায়ে হেঁটে দুর্গম সেই গ্রাম বংশীধরপুরে আমার ক্যাম্প অফিসে ফিরে যাব। উনি যদি...। তবে এটা জানি, ওঁর গাড়ি আমার ক্যাম্প অফিসে যেতে পারবে না। রাস্তাই নেই। তখন শনিবারে হাফ হলি ডে ছিল। ফিরে যাইনি। সোমবারেও ফিরিনি। মঙ্গলে ফিরেছিলাম বইমেলায় কেনা বই কিছু সঙ্গে নিয়ে। দিন পনেরো বাদে মিটিংয়ে গিয়েছি। সঙ্গে সারা মাসের কাজের হিসেব। তিনি আমাকে দেখে আচমকা জিজ্ঞেস করলেন, খুব বই পড়েন?
Advertisement
হ্যাঁ স্যার। আমি কোনওক্রমে বললাম। খুব ভীতু। সবে দু’বছর চাকরি হয়েছে। জরুরি অবস্থা চলছে। আমলাদের হাতে অনেক ক্ষমতা। ইতিমধ্যে ঘুষ নেওয়ার দায়ে দু’জন সাময়িক বরখাস্ত হয়েছে শুনেছি। অফিস পালানো কম অপরাধ নয়। তিনি খুব রাগী। কাজে ফাঁকি সহ্য করেন না। আমি পঁচিশ, তিনি বছর পঁয়ত্রিশ। কিন্তু হাবভাবে প্রায় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ। চুরুট সেবন করেন। তরুণ মুখে তৈরি করা গাম্ভীর্য। সকল অধস্তন অফিসারদের চেনেন। কে কী করছে জানেন। কেউ যদি-গ্রুপ কর্মচারীকে নিয়ে মিটিংয়ে আসে, সে খবর রাখেন। গ্রুপ ডি কর্মচারী তার ব্যাগ বহন করতেই আসে। তিনি ধমকে দিয়েছিলেন সেই অফিসারকে। মোটামুটি সন্ত্রস্ত করে রাখতেন আমাদের। নতুন চাকরি। প্রথম বাড়ির বাইরে। প্রথম স্বাধীনতা। চাকরি গেলে করবটা কী? মহারাজা তোমারে সেলাম।
কী বই কিনলেন?
জনা পঞ্চাশ কী তার বেশি কানুনগো অফিসাররা হাজির হিসেব নিয়ে। সকলেই শঙ্কিত থাকতেন কাজের টার্গেট পূরণ হয়নি বলে তিরস্কৃত হবেন। তো সে সব বাদ দিয়ে বইয়ের কথা। আমি আমার এক মাসের কাজের হিসেব দেব কী, বলতে লাগলাম, আন্তন চেখভের গল্প, ফিওদর দস্তয়েভস্কির বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠগল্প, বই বাজার থেকে পাওয়া অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাস। তিতাস! পেয়েছেন! বিস্ময়ে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
তিনি বললেন তিনি নিজে কী কিনেছেন। আর বললেন, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ তিনি পড়েননি, তাঁকে যেন আমি পড়তে দিই। পড়ে ফেরত দেবেন।
বইমেলা আমাকে হিরো বানিয়ে দিল। তিনি জিজ্ঞেসই করলেন না, শুক্রবারে আমি কলকাতায় কী করে গেলাম? ছুটি নিয়েছিলাম কি? তিনি স্বপন চক্রবর্তী আইএএস। বহু বছর বাদে আমি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেলে তিনি ফোন করেছিলেন। যে ভাবে হোক নম্বর সংগ্রহ করে। বলে উঠলেন, আপনি সেই অমর। আমি স্বপন চক্রবর্তী, আমাকে মনে আছে আপনার? বই নিয়ে গোপীবল্লভপুরে ফিরতেন। লিখতেন সেখানে বসে। কলকাতা পুস্তক মেলা এরপর আসে ময়দানে। পার্কস্ট্রিটের ওখানে যে বিস্তীর্ণ সবুজ, সেখানে বই নিয়ে সেই মেলা বসত। কলকাতায় মেট্রোরেল হল। যাতায়াতে খুব সুবিধে। তখন একটি দু’টি বই বেরিয়েছে। সেই বইমেলায় থাকে। স্টলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকি, কেউ কি আমার বই কিনল? দেখছি, একজন হাতে নিয়ে পরখ করছে, তারপর রেখে দিল। একদিন মেলায় পৌঁছে শুনি দু’ কপি বিক্রি হয়ে গিয়েছে। ইস আগে কেন এলাম না। আমার একজন, দু’জন পাঠক হয়েছে, তাদের আমি চিনি না। অচেনা পাঠক। মহাশ্বেতাদি, শ্যামলদা বলতেন, অচেনা পাঠক যখন বই কিনবে, বুঝবি ঠিক পথে এগচ্ছিস। হ্যাঁ, সেই অচেনা পাঠকের কেউ কেউ পরে চেনা হয়ে যান, বইমেলাতেই। আর আমিও তো অচেনা পাঠক হয়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প, মহাশ্বেতা দেবীর গল্প, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প ও উপন্যাসে মন ডুবিয়েছিলাম একদিন। মেলা থেকে বই কিনেছি, পড়েছি। পড়তে পড়তে তাঁদের কাছে গিয়ে প্রণাম করেছি। লেখক আগে পাঠক। পাঠক না হলে লেখা হবে কী করে? বইমেলা আসলে পাঠকের মেলা।
রবীন্দ্রসদন ও ময়দানের বইমেলায় শেষ দিনে বই বাজার হতো। একটু ছেঁড়া ফাটা বই কম দামে পাওয়া যেত। সেই সময় পাঁচের দশকের লেখকদের উত্থানের সময়। মহাশ্বেতা দেবীর উত্থানের কাল। আমরা যারা ওই সময়ে লিখতে এসেছি বইমেলা পেয়েছি। ময়দানে ছিল অনেক জায়গা। স্টলের সামনে মাঠের সবুজ ঘাসে খবরের কাগজ পেতে আড্ডা হতো। সেই আড্ডা উঠে গিয়েছে ময়দান থেকে মেলা সরে যাওয়ায়। ময়দান ত্যাগ করতে হয়েছিল পরিবেশ সংক্রান্ত মামলায়। সে মনে হয় ২০০৭ সালের কথা। যুবভারতী স্টেডিয়ামের ধারে মেলা হয়েছিল সেবার দেরি করে। তারপর মিলন মেলা। দুরূহ ছিল যাতায়াত। এখন বয়স বেড়েছে, সেই সায়েন্স সিটির উল্টো দিকে মিলন মেলা থেকে ফিরতাম বিধ্বস্ত হয়ে। সেখান থেকে মেলা এল বিধাননগর সেন্ট্রাল পার্কে। যাতায়াত আরও সহজ হয়ে যাবে মেট্রোরেল সংযোগ সম্পূর্ণ হলে, মানে শিয়ালদা থেকে ধর্মতলা মেট্রো চালু হলে।
এবার কলকাতা বইমেলার থিম কান্ট্রি জার্মানি। নয়ের দশকে মনে হয় নোবেল জয়ী, টিন ড্রাম উপন্যাস খ্যাত গুন্টার গ্রাস কলকাতা বইমেলায় এসেছিলেন। সেবার জার্মানি থিম ছিল কি না জানি না, কিন্তু তিনি এসেছিলেন। বড় লেখক ঈশ্বরের মতো। এক দুপুরে গিল্ড ব্যবস্থা করেছিল গুন্টার গ্রাসের সঙ্গে এখানকার লেখকদের একটি সাক্ষাৎকারের। তা মঞ্চে হয়নি। হয়েছিল গিল্ড প্যাভিলিয়নে, একটি ঘরে। শিল্পী শুভাপ্রসন্ন ছিলেন এই ব্যাপারে অগ্রণী। সেই দুপুর মনে আছে। বাকি জীবনেও মনে থাকবে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, শুনেছিলাম তাঁর কথা। আন্তর্জাতিক লেখক বলতে এরপর কথা বলেছি দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কো-উন-এর সঙ্গে। তা কাজাখস্তানে এশীয় লেখক সম্মেলনে। একবার অস্ট্রেলিয়া থিম হয়েছিল। সে দেশের লেখক প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথাবার্তার ব্যবস্থা করেছিল গিল্ড। সেও অমূল্য স্মৃতি। এই আয়োজন করেছিলেন কবি মুকুল গুহ। তিনি নেই।
কলকাতা বইমেলা আমাদের বয়সিদের যৌবনকালে আরম্ভ হয়েছিল, আমাদের ভিতরে ধীরে ধীরে জরা এসেছে, কিন্তু মেলাটির প্রাণের শেষ নেই। টিকিট কেনার ব্যাপার নেই, প্রবেশ অবাধ। সেই কাউন্টারের সামনে গুঁতোগুঁতির কথা মনে পড়ে যায়। আমার এক বন্ধু, কবি এবং সিনেমা বানানোর স্বপ্ন নিয়ে অকালে মারা যাওয়া বিকাশ জানা প্রথম বার সঙ্গী ছিল। ভিড় ও লম্বা লাইন দেখে বিকাশ চিৎকার করতে লাগল, আরে ভাই রাইটার এসেছে, রাইটার, তাঁকে আগে ঢুকতে হবে...। লোকে তাকিয়ে খুঁজতে লাগল কই রাইটার। তখন কলকাতায় সাদা কালো ডি ডি বাংলা চ্যানেল নিয়ে টেলিভিশন এসেছে সবে। লেখকরা বইয়ে থাকেন। জ্বলজ্বল করে নাম। শরৎচন্দ্র, থেকে শংকর...। তাঁদের দেখতে পাওয়া যায় নাকি? তাঁরা অগোচরেই থাকেন। সুতরাং পাবলিক লেখক খুঁজতে লাগল। আমি মাথা নিচু করে আছি। বছর পঁচিশ। এই বয়সে কেউ লেখক হয়? লেখকের বয়স তো পঞ্চাশ পার হতে হবে। সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত লেখক। যাইহোক বিকাশ টিকিট ম্যানেজ করেছিল। সগর্বে আমাকে নিয়ে মেলায় ঢুকল। সেই সব দিন এখন অলীক মনে হয়।
আমাদের বইমেলা ছিল খুঁজে খুঁজে বই কেনার। আর ময়দানের ঘাসে বসে আড্ডার। আড্ডা কবিতা শোনার। কবি পকেটে করে কবিতা আনতেন। সেই সব কবিরা আজ নেই। নতুনরা এসে গিয়েছেন। অনেকে হারিয়ে গিয়েছেন। আবার ফিরেও আসছেন পাঠকের হাত ধরে। তুষার রায় ছিলেন ব্যান্ড মাস্টার কাব্যগ্রন্থের কবি। বড় কবি। মেলাতে টের পেলাম তুষার হারিয়ে যাননি। অকালে চলে গেলেও বাঙালি পাঠক ভালো লেখক, কবিকে ভোলেন না। ফিরিয়ে আনেন। তুষার রায়কে নিয়ে উপন্যাস লেখা হয়েছে। বইমেলায় তা প্রকাশিত হয়েছে। লিখেছেন কবি অংশুমান কর। আমার মনে পড়ে আফসার আমেদ, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, শচীন দাশ, দীপঙ্কর দাস, রবিশঙ্কর বল এমনই কত লেখক বন্ধুদের কথা। তাঁরা আর মেলায় আসেন না। আসবেন না কোনও দিন। এসব নিয়ে বিষণ্ণ হয়ে কোনও লাভ নেই। পাঠক অতি নির্মম। ভালো না লাগলে লেখককে পরিত্যাগ করেন ধীরে ধীরে। আবার পাঠক এক একজন করে আসেন লেখকের কাছে। তা মেলায় গেলে ধরা যায়। কেউ বই নিয়ে সই করাতে আসেন। কেউ আসেন অমুক বইটি ভালো লেগেছে, সেই কথা বলতে। এখন লেখক আর অদৃশ্য নেই। মোবাইল ফোন আছে তাঁর, ফেসবুক আছে তাঁর, টেলিভিশনের নানা চ্যানেলে তিনি দেখা দেন। তাঁর মুখ তাঁর পাঠক চেনে। মেলায় দেখতে পেলেই সামনে এসে দাঁড়ায়। বইমেলা আসলে পাঠকের মেলা। পড়ুয়া সেই ব্যক্তি, নারী বা পুরুষ হয়তো ছ’মাসের কিংবা এক বছরের রসদ সংগ্রহ করে নিয়ে যান, কয়েকদিন মেলায় এসে। আমার কম বয়সের বন্ধু তপনজ্যোতি মিত্র থাকেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে। কবিতা লেখেন। মেলার আগে নিয়ম করে কলকাতায় ফেরেন সস্ত্রীক। বই কেনেন। কিনেই যান। বইয়ের ভারে ন্যুব্জ হয়ে প্রতিদিন ক্যাবে করে পার্ক স্ট্রিট ফেরেন। পার্কস্ট্রিটেই কোথায় যেন তাঁর এক মাসের আশ্রয়। সেই বই অনেকটা সঙ্গে নিয়ে ফেরেন। বাকিটা জাহাজে যায়।
এই বইমেলায় আমার সদ্য প্রয়াত অগ্রজ লিটল ম্যাগাজিনের মস্ত প্যাভিলিয়নের মাথায় রয়েছেন। মনোজ মিত্রর নামে তারুণ্যের স্পর্ধা দিয়ে নির্মিত লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন হওয়ায় গিল্ড কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই। সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটকের শতবর্ষ, তাঁদের নামে তোরণদ্বার। জীবনানন্দ একশো পঁচিশ। তাঁর নামে একটি তোরণ। এবারের মেলায় মুক্ত মঞ্চ নেই। তার জন্য আপত্তি সঙ্গত। কিন্তু অনেকেই বলছেন এতে শব্দদূষণ কমেছে। লিটল ম্যাগাজিন রূপকথার সম্পাদক তাই-ই বললেন আমাকে। হ্যাঁ, এবার শব্দদূষণ কম। নিশ্চিন্তে হাঁটা যাচ্ছে। কথা বলা যাচ্ছে। মনে পড়ে সেই ময়দানের বইমেলার কথা। মৃদু স্বরে পুরনো দিনের বাংলা গান বেজেই চলত। তা পুরনো হয়ে গিয়েছে। গত বছরও শুনেছি বইমেলার থিম সং, বই ডাকছে বই। এবার তা নেই। নেই ক্ষতি হয়নি। বই যেখানে নিস্তব্ধতার আধার, সেখানে শব্দ যত কম থাকে ভালো। কথা বলা যায়। আড্ডা দেওয়া যায়। তবে আগের সেই ময়দান তো নয় যে মাটিতে কাগজ পেতে বসে আড্ডা হবে, সে জায়গা কই? সময় বদলে গিয়েছে। স্টলের আড্ডা হয় না আর, এক সময়ে যা ছিল প্রতিক্ষণ প্রকাশনের বড় আকর্ষণ। সেখানে দেখেছি কবি শামসুর রাহমানকে। দেখেছি রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে। সুনীল, শ্যামল, দিব্যেন্দু, শীর্ষেন্দুকেও দেখেছি। দেবেশ রায় ছিলেন মধ্যমণি। এখন স্টলের আয়তন কম। বই উপচে পড়ছে। কোথাও কয়েকজন বসে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ নেই। এখন প্রকাশক অনেক। সকলকে জায়গা দিতে পঞ্চাশ বর্গ ফুট স্টলও হয়েছে। আবার যিনি স্টল পাননি, তিনি চেনা কোনও প্রকাশকের পঞ্চাশ বর্গ ফুটেই ঢুকে পড়েছেন। এ যেন রুশ দেশের উপকথা দাদুর দস্তানার মতো। আগে বই প্রকাশ হতো না। এখন হয়। স্টলে স্টলে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কবি ঔপন্যাসিক বন্ধু তাপস রায়। বই সামনে বুকের কাছে ধরে মোবাইলে ছবি আর ফেসবুকে সাঁটিয়ে দিয়েই উদ্বোধন প্রক্রিয়া। তা করতে হচ্ছে। স্টলে গেলেই ছবি। তারপর ফেসবুক। প্রযুক্তি সব বদলে দিয়েছে। ময়দান, রবীন্দ্র সদনের বিপরীতে এখনকার মোহরকুঞ্জের মাঠ আর বিধাননগর সেন্ট্রাল পার্ক এক নয়। সেই সময় আর এই সময় এক নয়।
এখন বইমেলায় কেউ হারায় না। সকলের হাতে মোবাইল। ইন্টারনেট। হারাতেই দেবে না। হারিয়ে যাওয়া মানুষের নাম লাউড স্পিকারে ঘোষণা করাও হবে না। সে ছিল একটা সময়। চাপদানি থেকে এসেছেন সুকুমার কুমার। চাপদানির মানুষ এসেছেন, জানা যেত। তিনি সুকুমার কুমার। তিনি এখন হারিয়ে যান না। ঘোষিকার সুমধুর কণ্ঠটি হারিয়ে গিয়েছে সত্যি।
আমাদের বন্ধু সম্পাদক প্রদীপ ভট্টাচার্য মেলায় নিজের স্টলে বসেই ঢলে পড়েছিলেন। আগুনে পুড়েছিল বইমেলা, তাও দেখেছি হাহাকার করতে করতে।
আবার সেই ভস্মরাশির ভিতর থেকে সাতদিন বাদে জেগে উঠেছিল নতুন মেলা। উড়াল দিয়েছিল। এসব আমাদের বইমেলার বিষাদ আর গৌরবের কথা।
বইমেলার ডায়েরি
খুদের জন্য ‘দিদির বই’
জাগো বাংলার স্টলের ভিতর চার দেওয়ালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন ছবি টাঙানো রয়েছে। ঘুরে ঘুরে সেগুলিই দেখছিলেন এক দম্পতি। কোলে থাকা শিশু কন্যার অবশ্য সেদিকে নজর নেই। তার চোখ মাঝখানে থাকা বইয়ের টেবিলে। সেখানে ছড়ানো মুখ্যমন্ত্রীর লেখা নানা বই। বারবার সেদিকে যাওয়ার জন্য বাবার কাছে বায়না জুড়েছে বাচ্চাটি। শেষমেশ টেবিল থেকে বেছে বেছে তোলা হল, ‘শিশুদোলা’, ‘শিশুমন’। রঙিন বই দু’টি পেয়ে হাজার ওয়াটের হাসি শিশুমুখে।
নদীয়ার ক্ষীরের দই
বই-পুজোর উদ্যানে পেটপুজোর ঢালাও আয়োজন থাকে ফি বছরই। এবারও আছে। তবে খাদ্য রসিকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে নদীয়ার ক্ষীরের দই। বইমেলায় ঘুরতে ঘুরতে বন্ধুদের সঙ্গে অনেকেই ভিড় জমাচ্ছেন দইয়ের স্বাদ চেটেপুটে নিতে। এবারে অন্তত চারটি নদীয়ার দইয়ের স্টল বসেছে। সব দোকানেই নজরকাড়া ভিড়। স্টলের মধ্যে থেকে এক মহিলা বিক্রেতা জানালেন, এবারে বিক্রি অনেক বেশি। গরম কিছুটা বেশি হওয়ার কারণেই দইয়ের চাহিদা বেড়েছে।
বইমেলায় বইবাড়ি
তিনচাকা ভ্যানের উপর দোতলা বাড়ি। সারি সারি সাজানো রয়েছে বই। আসলে পুরোটাই একটা বইবাড়ি। দেওয়ার জুড়ে নকশা। পালকির ছবি। বইমেলার ভিড়ে প্রায় সকলেই অন্তত একবার ঢুঁ মারছেন সেই স্টলে। এটি সুবোধ সরকারের ছড়ার গাড়ি। রয়েছে তাঁর বইয়ের সম্ভার। সেখানেই ভিড় জমাচ্ছেন সেলফি-প্রেমীরা। বিশেষ করে কচিকাঁচাদের দেখা যাচ্ছে বইবাড়ির আশপাশে। চলছে দেদার সেলফি তোলা। সেলফি তোলার হিড়িক রয়েছে জার্মানির স্টল ঘিরেও। নতুন প্রজন্মের পাঠক বই হাতে ঘোরাঘুরির পাশাপাশি বইমেলাকে ধরে রাখছেন মুঠোফোনে।
বই বিক্রি নেই
মেলায় আছি, বিক্রিতে নেই! এমন আজব ফরমান খোদ উদ্যোক্তাদের। স্টলে বই সাজিয়ে বসে রয়েছেন সুবেশি বিদেশি বিক্রেতা। অথচ বইয়ের নীচে লেখা ‘নট ফর সেল’। এবারের বইমেলায় পেরু ও জার্মানির স্টল রয়েছে পাশাপাশি। দু’টি ক্ষেত্রেই একই কথা, বই আছে অথচ বিক্রি নেই। স্পেন ও রাশিয়ার স্টলেও বিক্রি নেই। পেরুর স্টলে বই বিক্রির বদলে রয়েছে কিউআর কোড। সেটি স্ক্যান করলেই জানা যাবে, কোথা থেকে এই সব বই পাওয়া যাবে। স্টল থেকে জানানো হচ্ছে, কিউ আর কোড স্ক্যান করলেই বই কেনার হদিশ মিলবে।
কী বই কিনলেন?
জনা পঞ্চাশ কী তার বেশি কানুনগো অফিসাররা হাজির হিসেব নিয়ে। সকলেই শঙ্কিত থাকতেন কাজের টার্গেট পূরণ হয়নি বলে তিরস্কৃত হবেন। তো সে সব বাদ দিয়ে বইয়ের কথা। আমি আমার এক মাসের কাজের হিসেব দেব কী, বলতে লাগলাম, আন্তন চেখভের গল্প, ফিওদর দস্তয়েভস্কির বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠগল্প, বই বাজার থেকে পাওয়া অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাস। তিতাস! পেয়েছেন! বিস্ময়ে তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
তিনি বললেন তিনি নিজে কী কিনেছেন। আর বললেন, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ তিনি পড়েননি, তাঁকে যেন আমি পড়তে দিই। পড়ে ফেরত দেবেন।
বইমেলা আমাকে হিরো বানিয়ে দিল। তিনি জিজ্ঞেসই করলেন না, শুক্রবারে আমি কলকাতায় কী করে গেলাম? ছুটি নিয়েছিলাম কি? তিনি স্বপন চক্রবর্তী আইএএস। বহু বছর বাদে আমি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেলে তিনি ফোন করেছিলেন। যে ভাবে হোক নম্বর সংগ্রহ করে। বলে উঠলেন, আপনি সেই অমর। আমি স্বপন চক্রবর্তী, আমাকে মনে আছে আপনার? বই নিয়ে গোপীবল্লভপুরে ফিরতেন। লিখতেন সেখানে বসে। কলকাতা পুস্তক মেলা এরপর আসে ময়দানে। পার্কস্ট্রিটের ওখানে যে বিস্তীর্ণ সবুজ, সেখানে বই নিয়ে সেই মেলা বসত। কলকাতায় মেট্রোরেল হল। যাতায়াতে খুব সুবিধে। তখন একটি দু’টি বই বেরিয়েছে। সেই বইমেলায় থাকে। স্টলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকি, কেউ কি আমার বই কিনল? দেখছি, একজন হাতে নিয়ে পরখ করছে, তারপর রেখে দিল। একদিন মেলায় পৌঁছে শুনি দু’ কপি বিক্রি হয়ে গিয়েছে। ইস আগে কেন এলাম না। আমার একজন, দু’জন পাঠক হয়েছে, তাদের আমি চিনি না। অচেনা পাঠক। মহাশ্বেতাদি, শ্যামলদা বলতেন, অচেনা পাঠক যখন বই কিনবে, বুঝবি ঠিক পথে এগচ্ছিস। হ্যাঁ, সেই অচেনা পাঠকের কেউ কেউ পরে চেনা হয়ে যান, বইমেলাতেই। আর আমিও তো অচেনা পাঠক হয়ে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প, মহাশ্বেতা দেবীর গল্প, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প ও উপন্যাসে মন ডুবিয়েছিলাম একদিন। মেলা থেকে বই কিনেছি, পড়েছি। পড়তে পড়তে তাঁদের কাছে গিয়ে প্রণাম করেছি। লেখক আগে পাঠক। পাঠক না হলে লেখা হবে কী করে? বইমেলা আসলে পাঠকের মেলা।
রবীন্দ্রসদন ও ময়দানের বইমেলায় শেষ দিনে বই বাজার হতো। একটু ছেঁড়া ফাটা বই কম দামে পাওয়া যেত। সেই সময় পাঁচের দশকের লেখকদের উত্থানের সময়। মহাশ্বেতা দেবীর উত্থানের কাল। আমরা যারা ওই সময়ে লিখতে এসেছি বইমেলা পেয়েছি। ময়দানে ছিল অনেক জায়গা। স্টলের সামনে মাঠের সবুজ ঘাসে খবরের কাগজ পেতে আড্ডা হতো। সেই আড্ডা উঠে গিয়েছে ময়দান থেকে মেলা সরে যাওয়ায়। ময়দান ত্যাগ করতে হয়েছিল পরিবেশ সংক্রান্ত মামলায়। সে মনে হয় ২০০৭ সালের কথা। যুবভারতী স্টেডিয়ামের ধারে মেলা হয়েছিল সেবার দেরি করে। তারপর মিলন মেলা। দুরূহ ছিল যাতায়াত। এখন বয়স বেড়েছে, সেই সায়েন্স সিটির উল্টো দিকে মিলন মেলা থেকে ফিরতাম বিধ্বস্ত হয়ে। সেখান থেকে মেলা এল বিধাননগর সেন্ট্রাল পার্কে। যাতায়াত আরও সহজ হয়ে যাবে মেট্রোরেল সংযোগ সম্পূর্ণ হলে, মানে শিয়ালদা থেকে ধর্মতলা মেট্রো চালু হলে।
এবার কলকাতা বইমেলার থিম কান্ট্রি জার্মানি। নয়ের দশকে মনে হয় নোবেল জয়ী, টিন ড্রাম উপন্যাস খ্যাত গুন্টার গ্রাস কলকাতা বইমেলায় এসেছিলেন। সেবার জার্মানি থিম ছিল কি না জানি না, কিন্তু তিনি এসেছিলেন। বড় লেখক ঈশ্বরের মতো। এক দুপুরে গিল্ড ব্যবস্থা করেছিল গুন্টার গ্রাসের সঙ্গে এখানকার লেখকদের একটি সাক্ষাৎকারের। তা মঞ্চে হয়নি। হয়েছিল গিল্ড প্যাভিলিয়নে, একটি ঘরে। শিল্পী শুভাপ্রসন্ন ছিলেন এই ব্যাপারে অগ্রণী। সেই দুপুর মনে আছে। বাকি জীবনেও মনে থাকবে। জিজ্ঞেস করেছিলাম, শুনেছিলাম তাঁর কথা। আন্তর্জাতিক লেখক বলতে এরপর কথা বলেছি দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কো-উন-এর সঙ্গে। তা কাজাখস্তানে এশীয় লেখক সম্মেলনে। একবার অস্ট্রেলিয়া থিম হয়েছিল। সে দেশের লেখক প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথাবার্তার ব্যবস্থা করেছিল গিল্ড। সেও অমূল্য স্মৃতি। এই আয়োজন করেছিলেন কবি মুকুল গুহ। তিনি নেই।
কলকাতা বইমেলা আমাদের বয়সিদের যৌবনকালে আরম্ভ হয়েছিল, আমাদের ভিতরে ধীরে ধীরে জরা এসেছে, কিন্তু মেলাটির প্রাণের শেষ নেই। টিকিট কেনার ব্যাপার নেই, প্রবেশ অবাধ। সেই কাউন্টারের সামনে গুঁতোগুঁতির কথা মনে পড়ে যায়। আমার এক বন্ধু, কবি এবং সিনেমা বানানোর স্বপ্ন নিয়ে অকালে মারা যাওয়া বিকাশ জানা প্রথম বার সঙ্গী ছিল। ভিড় ও লম্বা লাইন দেখে বিকাশ চিৎকার করতে লাগল, আরে ভাই রাইটার এসেছে, রাইটার, তাঁকে আগে ঢুকতে হবে...। লোকে তাকিয়ে খুঁজতে লাগল কই রাইটার। তখন কলকাতায় সাদা কালো ডি ডি বাংলা চ্যানেল নিয়ে টেলিভিশন এসেছে সবে। লেখকরা বইয়ে থাকেন। জ্বলজ্বল করে নাম। শরৎচন্দ্র, থেকে শংকর...। তাঁদের দেখতে পাওয়া যায় নাকি? তাঁরা অগোচরেই থাকেন। সুতরাং পাবলিক লেখক খুঁজতে লাগল। আমি মাথা নিচু করে আছি। বছর পঁচিশ। এই বয়সে কেউ লেখক হয়? লেখকের বয়স তো পঞ্চাশ পার হতে হবে। সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরিহিত লেখক। যাইহোক বিকাশ টিকিট ম্যানেজ করেছিল। সগর্বে আমাকে নিয়ে মেলায় ঢুকল। সেই সব দিন এখন অলীক মনে হয়।
আমাদের বইমেলা ছিল খুঁজে খুঁজে বই কেনার। আর ময়দানের ঘাসে বসে আড্ডার। আড্ডা কবিতা শোনার। কবি পকেটে করে কবিতা আনতেন। সেই সব কবিরা আজ নেই। নতুনরা এসে গিয়েছেন। অনেকে হারিয়ে গিয়েছেন। আবার ফিরেও আসছেন পাঠকের হাত ধরে। তুষার রায় ছিলেন ব্যান্ড মাস্টার কাব্যগ্রন্থের কবি। বড় কবি। মেলাতে টের পেলাম তুষার হারিয়ে যাননি। অকালে চলে গেলেও বাঙালি পাঠক ভালো লেখক, কবিকে ভোলেন না। ফিরিয়ে আনেন। তুষার রায়কে নিয়ে উপন্যাস লেখা হয়েছে। বইমেলায় তা প্রকাশিত হয়েছে। লিখেছেন কবি অংশুমান কর। আমার মনে পড়ে আফসার আমেদ, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, শচীন দাশ, দীপঙ্কর দাস, রবিশঙ্কর বল এমনই কত লেখক বন্ধুদের কথা। তাঁরা আর মেলায় আসেন না। আসবেন না কোনও দিন। এসব নিয়ে বিষণ্ণ হয়ে কোনও লাভ নেই। পাঠক অতি নির্মম। ভালো না লাগলে লেখককে পরিত্যাগ করেন ধীরে ধীরে। আবার পাঠক এক একজন করে আসেন লেখকের কাছে। তা মেলায় গেলে ধরা যায়। কেউ বই নিয়ে সই করাতে আসেন। কেউ আসেন অমুক বইটি ভালো লেগেছে, সেই কথা বলতে। এখন লেখক আর অদৃশ্য নেই। মোবাইল ফোন আছে তাঁর, ফেসবুক আছে তাঁর, টেলিভিশনের নানা চ্যানেলে তিনি দেখা দেন। তাঁর মুখ তাঁর পাঠক চেনে। মেলায় দেখতে পেলেই সামনে এসে দাঁড়ায়। বইমেলা আসলে পাঠকের মেলা। পড়ুয়া সেই ব্যক্তি, নারী বা পুরুষ হয়তো ছ’মাসের কিংবা এক বছরের রসদ সংগ্রহ করে নিয়ে যান, কয়েকদিন মেলায় এসে। আমার কম বয়সের বন্ধু তপনজ্যোতি মিত্র থাকেন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে। কবিতা লেখেন। মেলার আগে নিয়ম করে কলকাতায় ফেরেন সস্ত্রীক। বই কেনেন। কিনেই যান। বইয়ের ভারে ন্যুব্জ হয়ে প্রতিদিন ক্যাবে করে পার্ক স্ট্রিট ফেরেন। পার্কস্ট্রিটেই কোথায় যেন তাঁর এক মাসের আশ্রয়। সেই বই অনেকটা সঙ্গে নিয়ে ফেরেন। বাকিটা জাহাজে যায়।
এই বইমেলায় আমার সদ্য প্রয়াত অগ্রজ লিটল ম্যাগাজিনের মস্ত প্যাভিলিয়নের মাথায় রয়েছেন। মনোজ মিত্রর নামে তারুণ্যের স্পর্ধা দিয়ে নির্মিত লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন হওয়ায় গিল্ড কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই। সলিল চৌধুরী, ঋত্বিক ঘটকের শতবর্ষ, তাঁদের নামে তোরণদ্বার। জীবনানন্দ একশো পঁচিশ। তাঁর নামে একটি তোরণ। এবারের মেলায় মুক্ত মঞ্চ নেই। তার জন্য আপত্তি সঙ্গত। কিন্তু অনেকেই বলছেন এতে শব্দদূষণ কমেছে। লিটল ম্যাগাজিন রূপকথার সম্পাদক তাই-ই বললেন আমাকে। হ্যাঁ, এবার শব্দদূষণ কম। নিশ্চিন্তে হাঁটা যাচ্ছে। কথা বলা যাচ্ছে। মনে পড়ে সেই ময়দানের বইমেলার কথা। মৃদু স্বরে পুরনো দিনের বাংলা গান বেজেই চলত। তা পুরনো হয়ে গিয়েছে। গত বছরও শুনেছি বইমেলার থিম সং, বই ডাকছে বই। এবার তা নেই। নেই ক্ষতি হয়নি। বই যেখানে নিস্তব্ধতার আধার, সেখানে শব্দ যত কম থাকে ভালো। কথা বলা যায়। আড্ডা দেওয়া যায়। তবে আগের সেই ময়দান তো নয় যে মাটিতে কাগজ পেতে বসে আড্ডা হবে, সে জায়গা কই? সময় বদলে গিয়েছে। স্টলের আড্ডা হয় না আর, এক সময়ে যা ছিল প্রতিক্ষণ প্রকাশনের বড় আকর্ষণ। সেখানে দেখেছি কবি শামসুর রাহমানকে। দেখেছি রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে। সুনীল, শ্যামল, দিব্যেন্দু, শীর্ষেন্দুকেও দেখেছি। দেবেশ রায় ছিলেন মধ্যমণি। এখন স্টলের আয়তন কম। বই উপচে পড়ছে। কোথাও কয়েকজন বসে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ নেই। এখন প্রকাশক অনেক। সকলকে জায়গা দিতে পঞ্চাশ বর্গ ফুট স্টলও হয়েছে। আবার যিনি স্টল পাননি, তিনি চেনা কোনও প্রকাশকের পঞ্চাশ বর্গ ফুটেই ঢুকে পড়েছেন। এ যেন রুশ দেশের উপকথা দাদুর দস্তানার মতো। আগে বই প্রকাশ হতো না। এখন হয়। স্টলে স্টলে হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কবি ঔপন্যাসিক বন্ধু তাপস রায়। বই সামনে বুকের কাছে ধরে মোবাইলে ছবি আর ফেসবুকে সাঁটিয়ে দিয়েই উদ্বোধন প্রক্রিয়া। তা করতে হচ্ছে। স্টলে গেলেই ছবি। তারপর ফেসবুক। প্রযুক্তি সব বদলে দিয়েছে। ময়দান, রবীন্দ্র সদনের বিপরীতে এখনকার মোহরকুঞ্জের মাঠ আর বিধাননগর সেন্ট্রাল পার্ক এক নয়। সেই সময় আর এই সময় এক নয়।
এখন বইমেলায় কেউ হারায় না। সকলের হাতে মোবাইল। ইন্টারনেট। হারাতেই দেবে না। হারিয়ে যাওয়া মানুষের নাম লাউড স্পিকারে ঘোষণা করাও হবে না। সে ছিল একটা সময়। চাপদানি থেকে এসেছেন সুকুমার কুমার। চাপদানির মানুষ এসেছেন, জানা যেত। তিনি সুকুমার কুমার। তিনি এখন হারিয়ে যান না। ঘোষিকার সুমধুর কণ্ঠটি হারিয়ে গিয়েছে সত্যি।
আমাদের বন্ধু সম্পাদক প্রদীপ ভট্টাচার্য মেলায় নিজের স্টলে বসেই ঢলে পড়েছিলেন। আগুনে পুড়েছিল বইমেলা, তাও দেখেছি হাহাকার করতে করতে।
আবার সেই ভস্মরাশির ভিতর থেকে সাতদিন বাদে জেগে উঠেছিল নতুন মেলা। উড়াল দিয়েছিল। এসব আমাদের বইমেলার বিষাদ আর গৌরবের কথা।
বইমেলার ডায়েরি
খুদের জন্য ‘দিদির বই’
জাগো বাংলার স্টলের ভিতর চার দেওয়ালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিভিন্ন ছবি টাঙানো রয়েছে। ঘুরে ঘুরে সেগুলিই দেখছিলেন এক দম্পতি। কোলে থাকা শিশু কন্যার অবশ্য সেদিকে নজর নেই। তার চোখ মাঝখানে থাকা বইয়ের টেবিলে। সেখানে ছড়ানো মুখ্যমন্ত্রীর লেখা নানা বই। বারবার সেদিকে যাওয়ার জন্য বাবার কাছে বায়না জুড়েছে বাচ্চাটি। শেষমেশ টেবিল থেকে বেছে বেছে তোলা হল, ‘শিশুদোলা’, ‘শিশুমন’। রঙিন বই দু’টি পেয়ে হাজার ওয়াটের হাসি শিশুমুখে।
নদীয়ার ক্ষীরের দই
বই-পুজোর উদ্যানে পেটপুজোর ঢালাও আয়োজন থাকে ফি বছরই। এবারও আছে। তবে খাদ্য রসিকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে নদীয়ার ক্ষীরের দই। বইমেলায় ঘুরতে ঘুরতে বন্ধুদের সঙ্গে অনেকেই ভিড় জমাচ্ছেন দইয়ের স্বাদ চেটেপুটে নিতে। এবারে অন্তত চারটি নদীয়ার দইয়ের স্টল বসেছে। সব দোকানেই নজরকাড়া ভিড়। স্টলের মধ্যে থেকে এক মহিলা বিক্রেতা জানালেন, এবারে বিক্রি অনেক বেশি। গরম কিছুটা বেশি হওয়ার কারণেই দইয়ের চাহিদা বেড়েছে।
বইমেলায় বইবাড়ি
তিনচাকা ভ্যানের উপর দোতলা বাড়ি। সারি সারি সাজানো রয়েছে বই। আসলে পুরোটাই একটা বইবাড়ি। দেওয়ার জুড়ে নকশা। পালকির ছবি। বইমেলার ভিড়ে প্রায় সকলেই অন্তত একবার ঢুঁ মারছেন সেই স্টলে। এটি সুবোধ সরকারের ছড়ার গাড়ি। রয়েছে তাঁর বইয়ের সম্ভার। সেখানেই ভিড় জমাচ্ছেন সেলফি-প্রেমীরা। বিশেষ করে কচিকাঁচাদের দেখা যাচ্ছে বইবাড়ির আশপাশে। চলছে দেদার সেলফি তোলা। সেলফি তোলার হিড়িক রয়েছে জার্মানির স্টল ঘিরেও। নতুন প্রজন্মের পাঠক বই হাতে ঘোরাঘুরির পাশাপাশি বইমেলাকে ধরে রাখছেন মুঠোফোনে।
বই বিক্রি নেই
মেলায় আছি, বিক্রিতে নেই! এমন আজব ফরমান খোদ উদ্যোক্তাদের। স্টলে বই সাজিয়ে বসে রয়েছেন সুবেশি বিদেশি বিক্রেতা। অথচ বইয়ের নীচে লেখা ‘নট ফর সেল’। এবারের বইমেলায় পেরু ও জার্মানির স্টল রয়েছে পাশাপাশি। দু’টি ক্ষেত্রেই একই কথা, বই আছে অথচ বিক্রি নেই। স্পেন ও রাশিয়ার স্টলেও বিক্রি নেই। পেরুর স্টলে বই বিক্রির বদলে রয়েছে কিউআর কোড। সেটি স্ক্যান করলেই জানা যাবে, কোথা থেকে এই সব বই পাওয়া যাবে। স্টল থেকে জানানো হচ্ছে, কিউ আর কোড স্ক্যান করলেই বই কেনার হদিশ মিলবে।



