Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভারতবর্ষীয় জীবনজাল

ভারতবর্ষীয় জীবনজাল
  • ৫ নভেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
আর্য্যা নিবেদিতার “ভারতবর্ষীয় জীবনজাল” নামক গ্রন্থখানির কথা আপনাদিগের নিকটে উপস্থিত করিতেছি। দীপশিক্ষা যেমন একই কালে আপনাকে এবং বহুদূরবর্ত্তী অন্ধকারকে প্রদীপ্ত করিয়া তোলে, তেমনি এই পুস্তকখানি আমাদের সমাজের অভ্যন্তরে আপনার রশ্মি প্রেরণ করিয়াছে এবং সেই রশ্মির সাহায্যে আমাদিগের অতীত ইতিহাসের অন্ধকারকে কিয়ৎপরিমাণে দূর করিয়াছে। আর্য্যা নিবেদিতা একস্থানে লিখিয়াছেন—“জাতীয়চরিত্রের মধ্যেই জাতীয় ইতিহাসের সংক্ষিপ্তবার্ত্তা আমরা পাই, ভারতবর্ষ-সম্বন্ধে এ কথা যত সত্য, এমন আর কোন দেশের সম্বন্ধেই নহে।” বস্তুত কথাটি সত্য বলিয়াই কার্য্যক্ষেত্রে খাটাইয়া লওয়া শক্ত। কারণ, জাতীয়-চরিত্রের খণ্ডতা-খর্ব্বতার মধ্যে তাহার পশ্চাতের সহিত অলক্ষ্য যোগসূত্র এবং সম্মুখের দিকে বিকাশোন্মুখ সার্থকতাকে একই সময়ে দেখিতে পাওয়া কঠিন। আমাদের সমাজে, আমাদের ধর্ম্মে, আমাদের আচারে-ব্যবহারে যে বহু প্রাচীনকালের একটি প্রতিভা কাজ করিয়াছে এবং এখনকার নানা বিকৃতির মধ্যেও যে তাহা দুর্লভ নহে, তাহা আছে—এ কথাটি আমরাই উপলব্ধি করিতে পারি না, বিদেশীর পক্ষে পারা যে কি কঠিন, তাহা সকলেই বুঝিবেন। ভারতবর্ষের বিশেষত্ব কোথায়, নিবেদিতা ধরিয়াছেন। আমাদের ইতিহাস এমন বাঁধাধরা নয় যে, তাহাকে একটা-কোন কলের মধ্যে নাম-তারিখ-রাজারাজড়া-সুদ্ধ ফেলিলেই তৈরি হইয়া উঠিবে। বস্তুত কোন ঘটনাবৈচিত্র্য বা মারকাটহাঙ্গামা আমাদের ইতিহাসে খুঁজিয়া পাওয়া দুষ্কর, কাজেই ঐতিহাসিকের পক্ষে তাহা নিদারুণ ক্লেশের, সন্দেহ নাই। তৎসত্ত্বেও আমাদের একটা ইতিহাস আছেই, তাহা কোন ইতিহাস হইতে খাটো নয়। তাহাকে চিনিতে গেলে ভারতবর্ষীয় মনের পরিচয় গোড়ায় পাওয়া চাই। সেই মনকে খনন করিয়া তুলিতে হইবে। তাহা আচারে-বিচারে, প্রথায়-অনুষ্ঠানে, ক্রিয়াকাণ্ডে, ধর্ম্মে-সাহিত্যে, দর্শনে-পুরাণে ছড়াইয়া আছে। তাহা আমাদিগকে যে কি সম্পত্তির অধিকারী করিয়াছে, আমরা জানি না—কিন্তু তাহা আছে, এবং তাহার শক্তিই যে আমাদের ঐক্যের ভিত্তিমূল একদিন হইবে, তাহা বুঝিবার সময় আজকাল আসিয়াছে বলিয়া মনে হয়। তাই নিবেদিতা গোড়াতেই আমাদের স্ত্রীলোকেদের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছেন। স্ত্রীলোকেরাই সভ্যতার মূলধনকে সঞ্চয় করিয়া রাখে। বহুকালের আচাররীতি-নীতিকে প্রতিদিন অবিচলিত নিষ্ঠার সহিত, ভক্তির সহিত রক্ষা করা তাহাদেরই ধর্ম্ম। সভ্যতার ধন তাহাদেরই কোলে প্রতিদিন মানুষ হইতে থাকে, সুতরাং তাহারা কি, তাহাদের মন বিশেষভাবে কি—তাহা জানিলেই সমাজের ভিতরকার ভাবটির সন্ধান পাওয়া যায়। প্রত্যুষে শয্যাত্যাগ করিয়া প্রথম অরুণালোকের অমৃতাশীর্ব্বাদের তলে গৃহদেবতার অভিবাদন ও গাভোদোহন কর্ম্ম হইতে দিবসের প্রতি তুচ্ছকর্ম্ম এবং সন্ধ্যারতি পর্য্যন্ত যে একটি অবিচ্ছিন্ন অপরিমেয় মঙ্গলভাব,—তা ছাড়া নানা অনুষ্ঠান, পূজা ও ব্রতপালনের যে একটি বিরল শুভ্র ত্যাগ কঠিন মাধুর্য্য, যাহার মধ্যে আমাদের কন্যাগণ, বধূগণ ও মাতৃগণ বর্দ্ধিত হন, আমরা তাহাকে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার প্রভৃতি নাম দিয়া উপহাস করি।
রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির প্রকাশিত ‘দীপান্বিতা নিবেদিতা’ থেকে
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ