ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রতি বছর সারা পৃথিবীর স্বচ্ছতা চিত্র প্রকাশ করে। বিভিন্ন দেশে, মূলত সরকারি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বা দুর্নীতি কতটা, তার একটি হিসাব নেয়, বিশ্লেষণ করে এবং তার ভিত্তিতে একটি রিপোর্টও প্রকাশ করে এই আন্তর্জাতিক সংস্থা। ওই রিপোর্টে ভারতের জায়গা হয়েছে সবচেয়ে দুর্নীaতিগ্রস্ত দেশগুলির তালিকায়। ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের র্যাঙ্ক ৯১। গত তিন দশকে ভারতের র্যাঙ্কের যে ওঠানামা দেখা যায়, তার মধ্যে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন ধরা পড়ে না। ১৯৯৫ থেকে ২০২৫ সালের ভিতরে ভারতের করাপশান র্যাঙ্কের গড় ৭৮.৪৫। তার মানে যত দিন যাচ্ছে ভারতের সরকারি ক্ষেত্রে দুর্নীতির বহর বাড়ছে! মোদির ‘স্বচ্ছ ভারত’ অভিযান এখনো অব্দি যে প্রচারসর্বস্বই রয়ে গিয়েছে তা বলা বাহুল্য। এর জন্য সরকারি পরিসংখ্যানে নজর করাও জরুরি নয়, প্রায় প্রতিটি নাগরিকের দৈনন্দিন তিক্ত অভিজ্ঞতাই পর্যাপ্ত সাক্ষ্য দেয়।
ভারত পরিচালিত হয় যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায়। তাই দুর্নীতিও চলে ডবল ইঞ্জিনের গতিতে—একদফা কেন্দ্রীয় ক্ষেত্রে এবং আরেক দফা রাজ্য সরকারের কাজ কারবারের এক্তিয়ারে। যেমন বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্প ঘিরে দুর্নীতির ভূরি ভূরি অভিযোগ রয়েছে। ব্যাপারটি রাজ্যগুলির ক্ষেত্রেও কমবেশি সমান। এবার সামনে এল কলকাতা পুলিশের এক মারাত্মক আর্থিক কেলেঙ্কারি। লক্ষ্য ছিল, ওয়্যারলেস যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক করা। সেই কারণেই দিল্লির একটি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে কলকাতা পুলিশ। ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে চালু করা হয়—লং টার্ম ইভোলিউশন (এলটিই) কমিউনিকেশন সিস্টেম। কিন্তু সেই মহার্ঘ ব্যবস্থাই যখন তখন মুখ থুবড়ে পড়ছে। পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হয় এবারের বিধানসভা নির্বাচন পর্বে। বিশেষ করে ভোটগ্রহণ এবং গণনার দিন পুরোপুরি বিকল হয়ে যায় ওই ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক। রাজ্যে পালাবদলের পরেও সেই বিপর্যয় ধারা থামেনি। একের পর এক বিপর্যয়ের ফলে কলকাতা পুলিশের অডিট উইংয়ের তরফে সিট গঠন করে বিভাগীয় নিরীক্ষা শুরু হয়। তাতেই মিলেছে নয়া দুর্নীতির হদিশ। এই ব্যাপারে সামনে এসেছে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার এক কাটমানি কাহিনি। ওয়্যারলেস ব্রাঞ্চের দুই শীর্ষকর্তা, একজন ওসি এবং ওয়্যারলেস সুপারভাইজার পদমর্যাদার কয়েকজন পুলিশকর্মীর ভূমিকা এখন আতশকাচের নীচে। গোটা বিষয়টি নিয়ে লালবাজারে তুমুল আলোড়ন শুরু হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ওয়্যারলেস যোগাযোগের জন্য কলকাতা পুলিশ এর আগে ব্যবহার করত ভেরি হাইফ্রিকোয়েন্সি (ভিএইচএফ) স্ট্যাটিক এবং ম্যানপ্যাক ওয়্যারলেস সেট। যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক করার জন্য দিল্লির একটি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা জার্মানির একটি সংস্থার তৈরি শক্তিশালী সার্ভার ব্যবহার করে লালবাজারের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে অধিক দৃঢ় করার কাজ শুরু করে। চালু করা হয় এলটিই স্ট্যাটিক এবং ম্যানপ্যাক কমিউনিকেশন। আর সেই ব্যবস্থাই বারবার বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। আইপিএল ম্যাচ থেকে নির্বাচন—কোনো গুরুত্বপূর্ণ পর্বেই ভরসা রাখা যাচ্ছে না। স্বভাবতই মহানগরীর আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নেমে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে পুলিশকে। দিল্লির সংস্থাটিকে ইতিমধ্যে শোকজও করা হয়েছে। কিন্তু সন্তোষজনক জবাব মেলেনি আজও।
বিপত্তি এখনো পর্যন্ত শেষবার সামনে এসেছে গত ৮ জুন। রাত পৌনে ৮টা নাগাদ। সমস্যাটি চলে আধঘণ্টার মতো। এই আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ওই সময়ের জন্য পুরো অকেজো হয়ে যায়। এই পরিস্থিতির মধ্যে রবিবার সারা দেশে পালিত হল আন্তর্জাতিক যোগদিবস। কলকাতার অনুষ্ঠানের পুরোভাগে ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বয়ং। এদিন শহরে ছিল আরো একাধিক সরকারি অনুষ্ঠান। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিনটিতে বিপত্তি এড়াতে লালবাজার ফের বাধ্য হয় পুরানো ভিএইচএফ কমিউনিকেশন সিস্টেমে ভরসা রাখতে। সেটি চালু করা হয়েছে গত শুক্রবার থেকেই। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে দিল্লির ওই সংস্থাকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতেও বলা হয়। এই পর্যন্ত সংঘটিত একের পর এক বিরূপ ঘটনায় কর্তৃপক্ষ উদ্বিগ্ন। সংশ্লিষ্ট মহলে দাবি উঠেছে, দিল্লির ওই সংস্থাকে অবিলম্বে কালো তালিকাভুক্ত করা হোক। সরকারি তহবিল থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে এই সিস্টেম কেনা হয়েছে, সেই টাকার পুরোটাই দ্রুত উদ্ধার করার ব্যবস্থা হোক। এই প্রসঙ্গে কাটমানি চক্রের যে অভিযোগ সামনে এসেছে সেটি তো আরো মারাত্মক। কারণ এটি যেমন তেমন দুর্নীতি নয়, একেবারে বাহিনীর সঙ্গেই বিশ্বাসঘাতকতা, রাজ্য তথা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার শামিল! কোন কোন প্রভাবশালী ব্যক্তি এই বেইমানির সঙ্গে জড়িত তাদের অবিলম্বে খুঁজে বের করতে হবে। না-হলে সেটি নিন্দিত হবে সরকারি ক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে আপস হিসাবে।