Bartaman Logo
৫ জুন, ২০২৬
বর্তমান / বিনোদন

নাটকের আলোচনা: মঞ্চে অসুরের খোঁজ

নাটক 'অসুর' আদিবাসীদের সংগ্রাম ও রাবণের গল্প তুলে ধরেছে। ১৫ জুন নতুন প্রযোজনা। বিস্তারিত জানুন।

নাটকের  আলোচনা: মঞ্চে অসুরের খোঁজ
  • ৫ জুন, ২০২৬ ০৪:০০

• মহাকাব্যে ‘অসুর’ আসলে কারা? তারা কি রাক্ষস খোক্ষস দত্যি দানো? নাকি ইতিহাসের পাতাজোড়া তাঁদের উপস্থিতি ভারতের আদি জনগণ হিসেবে? একটি মিনিট দশেকের বিরতি সহ প্রায় দু’ঘণ্টা দশ মিনিটের নাটক ‘অসুর’ সেই প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করায়। আনন্দ নীলাকান্তনের নাটক ‘অসুরা’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘অসুর’ নাটকটির চিত্রনাট্যের বুনট তৈরি করেছেন নাট্য পরিচালক আরাত্রিক ভদ্র। ভারতের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের সংগ্রাম, বেঁচে থাকার শ্রেণি-রাজনীতি ও আদি যুগ থেকে তাঁদের প্রতি নানা বঞ্চনা এই নাটকের মূল বিষয়। তলে তলে এই বোধ পুঁজি করে নাটক এগলেও গল্পের বহিরঙ্গে বয়ে চলে রামায়ণে রাবণের গল্প।

Advertisement

পারিবারিক বঞ্চনা ও অপমান থেকে বাঁচতে অসুর জনজাতির রাজা মহাবলির সন্নিকটে রাবণের আসা থেকে লঙ্কা ধ্বংস, এই প্যানোরমিক মহাকাব্যিক দৃশ্য ফুটে ওঠে গোটা নাটক জুড়ে। এ গল্পে সূত্রধার আসলে রাবণেরই অন্যতম বিশ্বস্ত অনুচর ভদ্র। রাবণ তাঁর রাজা হলেও, ভদ্রের জীবনেও রাবণের স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার ক্ষত রয়েছে। 
সেই ভদ্রই চলে এসেছেন কলকাতার নামী এক কলেজে, যেখানে আদিবাসী এক ছেলেকে ‘অসুর’ বলে দেগে দিয়েছে তারই বন্ধুরা। আদিবাসী এক মেয়ে সোহাগ ধর্নায় বসলে জল এত দূর গড়ায় যে ক্যাম্পাসে পুলিশ আসে। শেষ সেমিস্টারের পরীক্ষা বানচাল হওয়ার উপক্রম হয়। নিজের জাতিকে অপমানের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে রাষ্ট্রের হাতে গ্রেপ্তার হয় মেয়েটি। নাট্যকার এখানেও আধুনিক ছেলেমেয়েদের মনের ভিতরের অন্ধকার ও ভ্রান্তিকে তুলে ধরেছেন। এই প্রজন্মের সুবিধাবাদী অবস্থান, মৌলবাদী ভাবনা, স্বার্থপরতা যেমন উঠে এসেছে, তেমনই  তাদেরই কেউ কেউ এই ঘটনার বিরুদ্ধে সরব হচ্ছে এমন আশার আলোও রয়েছে তাতে। 
কালের স্রোতে বাল্মীকির রামায়ণের ভিতরেও যে নানা বিনির্মাণ মিলেমিশে গিয়েছে সেই জায়গাকেও এই নাটকে উল্লেখ করেছেন পরিচালক। মূল গল্প কী, সে তো নাটকটির পরবর্তী প্রযোজনায় দেখবেন, কিন্তু নাটকটি কেমন? সেটি নিয়ে বরং ধারণা দেওয়া যাক। কলকাতা ও জেলার বুকে নানা ছোটো নাটকের দল আছে, যারা ভালো কাজ করে। কলাকুশলীরা কম বাজেটের মধ্যেও নানা সৃজনশীল ভাবনা দিয়ে নাটক ভাবেন, ‘কসবা উদ্ভব’ তেমনই এক দল। এই প্রযোজনাও তার ব্যত্যয় নয়। কাজটিতে নিষ্ঠা রয়েছে। রীতিমতো পরিশ্রম রয়েছে। পুরাণ ও ইতিহাস মেলানো নাটকে যে তথ্যবিকৃতি ও গল্প বুনতে না পারার ভয় থাকে, সেই ভয় এই দলকে তাড়া করেনি। সৌজন্যে একটি স্মার্ট চিত্রনাট্য। গোটা নাটক জুড়ে ভরপুর নাচ, গান এমনকি রাম-রাবণের যুদ্ধের মতো ভারী অ্যাকশনও রয়েছে। সেখানেও কলাকুশলীদের মুনশিয়ানার ছাপ রয়েছে। রাবণের চরিত্রে বেশ ভালো শুভঙ্কর কর্মকার। ভদ্রের চরিত্রে মৃগাঙ্ক মণ্ডলও আলাদা করে ছাপ রাখেন। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন শিবমৃতা, শ্রীঋদ্ধা, ভার্গব, রুচিরা, উপাসন, পূর্বাশ্রী, জ্যোতিশ্রী, সন্দীপন, অর্ণব, প্রণব সহ আরও অনেকেই। তারা প্রত্যেকে নিজেদের চরিত্রে যথাযথ। রুচিরা মুখোপাধ্যায়ের অভিনয়ের সঙ্গে উকুলেলে বাজিয়ে গান, শাশ্বত চৌধুরীর সরোদবাদন মনে থেকে যায়। ধামসা বাজিয়েছেন অনুরাগ চট্টোপাধ্যায়। তবে নাটকের মঞ্চ নির্মাণ নিয়ে সৌরভ পয়রা আরও কিছুটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেও পারেন ভবিষ্যতে। এই গল্প তাঁকে সেই সুযোগও দেবে। নাটকটির রূপক আশ্রয় বেশ প্রশংসার দাবি রাখে। আবহ, সঙ্গীতভাবনা গল্পের সঙ্গে বেশ জুতসই। পল্লব জানার আলো প্রেক্ষাপনে দু’-একটি মুহূর্তের ত্রুটি ছাড়াও মোটের উপর ভালো। এ নাটক একাধিকবার দেখার মতোই। নাটকটির পরবর্তী প্রযোজনা ১৫ জুন, অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে। 
মনীষা মুখোপাধ্যায়

সম্পর্কিত সংবাদ