শনিবার রাজ্যে শপথ নিল নতুন সরকার। পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন শুভেন্দু অধিকারী। বাংলায় পাঁচ দশকে প্রথম ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে কোনো সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানও এই প্রথম। উপস্থিত ছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ছিলেন বিজেপি/এনডিএ শাসিত বাকি রাজ্যগুলিরও মুখ্যমন্ত্রী, উপমুখ্যমন্ত্রীরা। রবীন্দ্র জয়ন্তীতে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। অনুষ্ঠানে আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিলেন মোদিজি। বাংলার জনগণের উদ্দেশে আভূমিনতমস্তকে প্রণাম করেন তিনি। এখানেই শেষ নয়, বিজেপির প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গসন্তান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সহযোদ্ধা নবতিপর মাখনলাল সরকারের পাঁ ছুঁয়েই প্রণাম করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর গায়ে শাল জড়িয়ে সংবর্ধনাও জানান তিনি। ‘বিজেপি বাংলা ও বাঙালি বিরোধী’ বলে অন্য দলগুলি নির্বাচন পর্বে যে তীব্র সমালোচনা করেছিল, প্রধানমন্ত্রীকে এই ভূমিকায় আবিষ্কার ছিল অবশ্যই তার মুখতোড় জবাব! আমরা লক্ষ করেছি, বাংলা ও বাঙালির মন জয়ের জন্য মোদিজি বহুদিন ধরেই মরিয়া। তাঁর ভাষণের মধ্যে বাংলা শব্দ ও বাক্যের সংযোজন ছিলই। ওই সঙ্গে পালটে যাচ্ছিল বিজেপি বা গেরুয়া শিবিরের স্লোগান। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর মুখে ‘বন্দে মাতরম্’-এর সঙ্গে অহরহ উচ্চারিত হচ্ছিল ‘জয় মাকালী’, ‘জয় মাদুর্গা’—‘জয় শ্রীরাম’-এর বদলে। এছাড়া ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, জগন্মাতা সারদাদেবী, স্বামী বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ মনীষীর নামে জয়ধ্বনি শোনা গিয়েছে গেরুয়া শিবিরের প্রায় প্রত্যেকের মুখে।
বিজেপির দীর্ঘ এক দশকের প্রস্তুতি ও নিরলস প্রয়াস অবশেষে বিশেষ সাফল্যের মুখ দেখল। দুই শতাধিক আসনে জিতে রাইটার্স দখল করলেন শুভেন্দু অধিকারীর আড়ালে নরেন্দ্র মোদি। নতুন রাজ্য সরকারের অভিভাবক হিসাবে মোদিজিকে পেয়ে বাংলার মানুষও আশ্বস্ত বোধ করতে পারেন। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, নতুন সরকারকে তিনি সঠিক দিশা দেখাবেন এবং সর্বতোভাবে তার পাশে থাকবেন। আর যেন কেন্দ্রের বঞ্চনা, দিল্লির বঞ্চনা, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জলাঞ্জলি প্রভৃতি আমরা শুনতে না পাই। তবেই নির্বাচনি প্রচার পর্বে প্রকাশিত সংকল্পপত্রের প্রতিশ্রুতিগুলি যথাসময়ে পূরণ করা সম্ভব হবে। উন্নয়নে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে। এই দেশের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা রকমারি বৈষম্য ও বেকারত্ব। বস্তুত বৈষম্যই যাবতীয় সমস্যার জনক। তাই বৈষম্য দূরীকরণে গুরুত্ব আরোপসহ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার সবার আগে। শিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত—বেকারত্ব দুই শ্রেণির মধ্যেই যথেষ্ট। পুরুষের চেয়ে মহিলাদের মধ্যে বেকারত্ব সর্বাধিক। কর্মক্ষেত্রে তাঁরা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার। তাই চাকরি ও কর্মসংস্থান প্রসারে এই বাস্তব দিকটি মাথায় রাখতে হবে গোড়াতেই। অন্নদাতা কৃষক এবং শিল্প-বাণিজ্যের আসল রূপকার তো শ্রমিক শ্রেণি। তাঁদের পরিস্থিতি এরাজ্যে অন্তত পাঁচ দশক ধরেই খারাপ। শ্রমিক-কৃষক এবার তাঁদের সুদীর্ঘ বঞ্চনার অবসান চান। তারা শিল্প-বাণিজ্য-বান্ধব বলেই বিশেষ প্রশংসা রয়েছে বিজেপির। আশা করা যায়, বণিক সভাগুলি এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের পরামর্শক্রমে নতুন সরকার বাংলায় শিল্প-বাণিজ্যের খরা দ্রুত কাটিয়ে ফেলতে সক্ষম হবে। শিল্প-বাণিজ্যের জন্য অবশ্যই প্রয়োজন রাজ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বা আইনের শাসন। বস্তুত বাংলার মানুষ এসব প্রশ্নে ‘রাহুমুক্তি’র প্রতীক্ষা করছে বললে অত্যুক্তি হবে না।
আপাতত মিটেছে সরকারের শপথগ্রহণ। আশা করা যায়, মন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টন শীঘ্রই শেষ হবে এবং অনুষ্ঠিত হবে মন্ত্রিসভার বৈঠক। মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাকি সব মন্ত্রীই রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নে ব্রতী হবেন। সুশাসন দেওয়ার জন্য পুলিশ এবং প্রশাসনকেও মুখ্যমন্ত্রী জনস্বার্থে সাজিয়ে ফেলছেন নিশ্চয়। এবার একে একে মিটুক—মেট্রোরেল সম্প্রসারণ, শিক্ষকদের চাকরি, স্কুলসহ সমস্ত সরকারি শিক্ষা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির পরিকাঠামো, সরকারি কর্মীদের বকেয়া ডিএ, মনরেগা, আবাস, কৃষিপণ্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি), শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই), বাসসহ গণপরিবহণ প্রভৃতি ক্ষেত্রের গুচ্ছ সমস্যা। মনে রাখতে হবে, মানুষ কিন্তু বড়ো আশা নিয়েই মোদিজির ‘প্রকৃত পরিবর্তন’-এর ডাকে সাড়া দিয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে নতুন সরকারকে কাজগুলি নিপুণ হাতে করতে হবে। আমরা দেখতে চাই, দেশের প্রধানমন্ত্রী এবার ‘জুমলা’ অপবাদ ঘুচিয়ে ফেলতে সক্ষয় হয়েছেন। তাহলে বাংলা ও বাঙালিই সবচেয়ে বেশি খুশি হবে। সেই ‘বাংলা মডেল’ গ্রহণে আগামী দিনে অন্য রাজ্যগুলিরও কোনো আপত্তি থাকবে না নিশ্চয়।