রাজু চক্রবর্তী, কলকাতা: সংগঠনের অভ্যন্তরে চূড়ান্ত ডামাডোল। ছ’মাস কাটলেও নতুন রাজ্য সভাপতি নির্বাচন ঝুলে রয়েছে। প্রদেশ থেকে জেলাস্তরে গোষ্ঠীকোন্দল চরমে। বছর ঘুরলেই বিধানসভা নির্বাচন। তার প্রাক্কালে সংগঠনের এহেন দৈন্যদশায় রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল আক্ষরিক অর্থেই দিশাহীনতায় ভুগছে। সিংহভাগ বঙ্গবাসীর সমর্থন পেতে ভোটের আগে প্রচার তুঙ্গে তুলতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রচারের অভিমুখ কী হবে, তা নিয়েই গেরুয়া শিবিরে ঘোর সংশয় দেখা দিয়েছে। উগ্র হিন্দুত্বকে আঁকড়ে বাংলায় সুস্পষ্ট মেরুকরণ, নাকি ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’-এর ঢঙে রাজ্যবাসীকে সার্বিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখানো—কোন অভিমুখে প্রচার চলবে, তা নিয়ে ধন্দ বাড়ছে পদ্ম-পার্টির ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্ক’-এ। ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটে বিজেপির ‘থিম’ ছিল চরম মেরুকরণ, যা কার্যত ব্যুমেরাং হয়েছিল। গত বছর লোকসভা ভোটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দেখানো পথে হেঁটে বাংলার সংখ্যালঘুদের প্রতি নরম বার্তা দিয়েছিল বিজেপি। তাতেও এ রাজ্য থেকে জেতা হাফ ডজন আসন খোয়াতে হয়েছিল তাদের। স্বভাবতই বাঙালি অস্মিতা জাগাতে সঠিক ‘রাজনৈতিক টোটকা’ খুঁজছে গেরুয়া শিবির।
এই ধন্দের কথা কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন দলের একাধিক রাজ্য নেতা। তাঁদের দাবি, বিরোধী দলনেতা হিন্দুত্বকে সামনে রেখে বাজি জেতার চেষ্টা করছেন। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় দলের বুথ কিংবা মণ্ডল কমিটি গঠনের দরকার নেই। অথচ স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সংখ্যালঘুদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের উন্নয়ন যজ্ঞের ফর্দ তুলে ধরার পরমার্শ দিয়েছেন। এক নেতার কথায়, ‘তিন তালাক রদ সহ মোদি সরকারের একাধিক সিদ্ধান্ত বিজেপির প্রতি শিক্ষিত মুসলমান মহিলাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে।’ স্বভাবতই বিরোধী দলনেতার একবগ্গা মনোভাব পার্টি অনুমোদন করে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওই নেতা। দলের এক আদি নেতার বক্তব্য, শুধু উন্নয়নের কথা বলে ভোটে জেতা যায় না। তেমনটা হলে ২০০৪ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারের পতন হতো না। আগে দেশের দক্ষিণের রাজ্যগুলি ডোল পলিটিক্সে অভ্যস্ত ছিল। অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়রা তার সফল প্রয়োগ করেছেন নিজেদের রাজ্যে। সেই পথে হেঁটেই ওড়িশা, মহারাষ্ট্র, দিল্লি সহ একাধিক রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। বাংলার ক্ষেত্রে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের পাল্টা সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার পক্ষপাতী ওই বিজেপি নেতা। তবে সেক্ষেত্রে এমন গ্রহণযোগ্য মুখ চাই, যাঁর কথা বাঙালি বিশ্বাস করবে। ক্ষমতায় এলে প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন, সেরকম বিশ্বাসযোগ্য নেতৃত্বের অভাব যে রয়েছে, মানছেন তিনি। সেই সূত্রেই তিনি ছাড়াও দলের অনেকের বক্তব্য, বর্তমানে পার্টিতে ছড়ি ঘোরানো অধিকাংশ নেতাই দলবদলু বা উড়ে এসে জুড়ে বসা কেউ। তাই কোন অস্ত্রে তৃণমূলের কাউন্টার করা হবে, তা দ্রুত ঠিক করতে হবে বঙ্গ বিজেপিকে।