বিমল বন্দ্যোপাধ্যায়, বজবজ: বেহালা পূর্বাঞ্চলের শুকদেবপুরের দামোদর ভবন। সেখানে দুর্গাকে মা মনে করে আরাধনা করেন গৃহকর্তা নির্মলকুমার ভট্টাচার্য এবং গৃহকর্ত্রী প্রতিমা ভট্টাচার্য। উভয়েই বংশগতভাবে পরিবারের আধ্যাত্মিক পরম্পরার উত্তরসূরি। কিন্তু তাঁদের বড় ছেলে বাসুদেব ভট্টাচার্য এবং সহধর্মিনী ইপ্সিতা ভট্টাচার্যের কাছে দুর্গা হল বড় কন্যা। পরিবারের আদরের মেয়ে। সেইভাবেই বড় মেয়ে উল্লেখ করে আত্মীয় ও পরিজনদের নিমন্ত্রণের চিঠি লেখেন। বাসুদেববাবু যত্ন করে বড় মেয়ের মূর্তি নিজে হাতে তৈরি করেন। বাড়ির ঠাকুরদালানে বৈশাখে শুরু হয় কাজ। মূর্তি তৈরি শেষে চক্ষু আঁকার কাজ করেন পুজো শুরুর কয়েকদিন আগে।
বাসুদেববাবুর ছেলে অগ্নিপ্রভ একাদশ শ্রেণির ছাত্র। মেয়ে আর্যা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। তারা মনে করে দুর্গা তাদের বড়দিদি। ছোট থেকে দুর্গাকে দিদি বলে ডাকে। শিউলি ফুল তুলে সকালে দিদির কাছে দিয়ে আসে। বাসুদেববাবু বড়মেয়ের অর্থাৎ দুর্গার জন্য চারটি শাড়ি কেনেন। কিন্তু পরিবারের জন্য কেনেন না। গুরুমাতা ও দীক্ষাগুরু প্রতিমাদেবীর হাতে শাড়ি তুলে দেন। দশমীতে একটি শাড়ি ইপ্সিতাকে দেন প্রতিমা। বলেন, তোমার বড় মেয়ে দিল। তা পরে বড় মেয়ের সিঁথিতে সিঁদুর পড়ান ইপ্সিতা।
এই বাড়ির পুজো শুরু হয়েছিল পূর্ববঙ্গে। তারপর তা চলে আসে শুকদেবপুরে। পণ্ডিতপ্রবর হরিদাস তর্ক সিদ্ধান্ত বাসুদেববাবুর ঠাকুর্দা। সত্তর বছর আগে তিনি পূর্ববঙ্গ থেকে শুকদেবপুরে আসেন। একসময় পরিবার মণ্ডপ তৈরির প্রস্ততি নিচ্ছিল। অনেকে বলেন, তখন দুর্গা কন্যা রূপে এসেছিলেন বাসুদেববাবুর ঘরে। প্রতিমাদেবী তাকে দেখে চিনতে পারেননি। ২০০৯ সালে প্রতিমাদেবী লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়ছিলেন ঠাকুরঘরে। নীচে নির্মলবাবু ছাত্র পড়িয়ে ঘরে ঢুকে একটি মেয়েকে দেখতে পান। চিৎকার করে ওঠেন। প্রতিমাদেবী চিৎকার শুনে দৌড়ে আসেন। মেয়েটি অচেনা। গায়ের রং রোদে পুড়ে তামাটে। মুখে অপূর্ব লালিত্য। চাপা হাসির রেখা ঠোঁটের কোণে। হাতে নতুন খবরের কাগজের প্যাকেট। মেয়েটি ইশারায় দেখায় পুজোর ফলের ঝুড়ি থেকে দু’টি ফল নিয়েছে। প্রতিমা ফল দু’টি নিতে বলে মেয়েটিকে। তারপর সে বেরিয়ে যায়। বাড়ির যে পুকুরে ঠাকুর বিসর্জন হয়, সেই ঘাটের পাশ দিয়ে গিয়ে রাস্তায় ওঠে। তারপর অন্ধকারে হারিয়ে যায়। সে যাওয়ার পর দেখা যায় ঘরের মধ্যে ছোট ছোট সুন্দর পায়ের ছাপ। গঙ্গার পলিমাটি যেমন মুছলে চট করে ওঠে না তেমন এই ছাপও মোছা যাচ্ছে না। ওই বছর শীতে বৃষ্টি হয়নি। তাহলে কাদামাখা পায়ে মেয়েটি এল কি করে? অনেকে তখন বলেন, মা এসেছিলেন মণ্ডপ তৈরির প্রস্তুতি দেখতে। তারপর দীর্ঘসময় কেটে গেলেও মেয়েটিকে আর দেখা যায়নি। নিজস্ব চিত্র