বুদ্ধ সম্বন্ধে স্বামীজী যে সময় কথা কহিতেছিলেন, সেটি এক মাহেন্দ্রক্ষণ; কারণ জনৈকা শ্রোত্রী স্বামীজীর একটি কথা হইতে বৌদ্ধধর্মের ব্রাহ্মণ্য-প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবটিই তাঁহার মনোগত ভাব, এই ভ্রমাত্মক সিদ্ধান্ত করিয়া বলিলেন, “স্বামীজী, আমি জানিতাম না যে আপনি বৌদ্ধ!” উক্ত নাম শ্রবণে তাঁহার মুখমণ্ডল দিব্যভাবে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। প্রশ্নকর্ত্রীর দিকে ফিরিয়া তিনি বলিলেন, “আমি বুদ্ধের দাসানুদাসগণের দাস। তাঁহার মতো কেহ কখনও জন্মিয়াছেন কি? স্বয়ং ভগবান হইয়াও তিনি নিজের জন্য একটি কাজও করেন নাই—আর কি হৃদয়! সমস্ত জগৎটাকে তিনি ক্রোড়ে টানিয়া লইয়াছেন। এত দয়া যে, রাজপুত্র এবং সন্ন্যাসী হইয়াও একটি ছাগশিশুকে বাঁচাইবার জন্য প্রাণ দিতে উদ্যত। এত প্রেম যে, এক ব্যাঘ্রীর ক্ষুধানিবৃত্তির জন্য স্বীয় শরীর পর্যন্ত দান করিয়াছিলেন, এবং আশ্রয়দাতা এক চণ্ডালের জন্য আত্মবলি দিয়া তাহাকে আশীর্বাদ করিয়াছিলেন! আর আমার বাল্যকালে একদিন তিনি আমার গৃহে আসিয়াছিলেন এবং আমি তাঁহার পাদমূলে সাষ্টাঙ্গে প্রণত হইয়াছিলাম! কারণ আমি বুঝিয়াছিলাম যে ভগবান বুদ্ধই স্বয়ং আসিয়াছেন!”
Advertisement
অনেক বার—কখনও বেলুড়ে অবস্থানকালে এবং কখনও তাহার পরে তিনি এইভাবে বুদ্ধদেবের কথা বলিয়াছিলেন। একদিন তিনি আমাদিগকে, যিনি মুখ্য বারাঙ্গনা হইয়াও বুদ্ধকে পরিতোষপূর্বক ভোজন করাইয়াছিলেন, সেই রূপসী অম্বপালীর উপাখ্যান এরূপ প্রাণস্পর্শিনী ভাষায় বর্ণনা করেন যে, রসেটি রচিত মেরী ম্যাকডালীনের আকুলক্রন্দনাত্মন বিখ্যাত অর্থ সনেটটির কথা স্বতই আমাদের স্মৃতিপথে উদিত হইল:
“ওগো, আমায় ছাড়িয়া দাও! দেখিতেছ না, আমার প্রিয়তমের মুখকমল আমায় নিকটে আকর্ষণ করিতেছে? আজ তিনি তাঁহার শ্রীচরণের জন্য আমার চুম্বন, আমার কেশপাশ, আমার অশ্রু মাগিতেছেন? ওগো, কে বলিয়া দিবে আবার কবে, কোথায় তাঁহার ঐ শোণিতালিপ্ত পদযুগল আমি আলিঙ্গন করিতে পাইব? তিনি যে আমায় ভালবাসিয়াছেন, আমায় চাহিতেছেন, আমায় ডাকিতেছেন; যাই, আমি যাই!”
কিন্তু স্বদেশপ্রেমই যে প্রত্যহ আলোচ্য বিষয় হইত, এমত নহে। কারণ, একদিন প্রাতঃকালে সর্বাপেক্ষা অধিক নূতনত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা হইয়াছিল। সেদিনকার দীর্ঘ আলোচনার বিষয় ছিল ‘ভক্তি’—প্রেমাস্পদের সহিত সম্পূর্ণ তাদাত্ম্য, যাহা চৈতন্যদেবের সমসাময়িক ভুম্যধিকারী ভক্তবীর রায় রামানন্দের মুখে এরূপ সুন্দরভাবে প্রকাশ পাইয়াছে—
“পহিলহি রাগ নয়নভঙ্গ ভেল;
অনুদিন বাড়ল অবধি না গেল।
না সো রমণ না হাম্ রমণী;
দুঁহ মন মনোভাব পেশল জানি।” ইত্যাদি।
ভগিনী নিবেদিতার ‘স্বামীজীর সহিত হিমালয়ে’ থেকে
“ওগো, আমায় ছাড়িয়া দাও! দেখিতেছ না, আমার প্রিয়তমের মুখকমল আমায় নিকটে আকর্ষণ করিতেছে? আজ তিনি তাঁহার শ্রীচরণের জন্য আমার চুম্বন, আমার কেশপাশ, আমার অশ্রু মাগিতেছেন? ওগো, কে বলিয়া দিবে আবার কবে, কোথায় তাঁহার ঐ শোণিতালিপ্ত পদযুগল আমি আলিঙ্গন করিতে পাইব? তিনি যে আমায় ভালবাসিয়াছেন, আমায় চাহিতেছেন, আমায় ডাকিতেছেন; যাই, আমি যাই!”
কিন্তু স্বদেশপ্রেমই যে প্রত্যহ আলোচ্য বিষয় হইত, এমত নহে। কারণ, একদিন প্রাতঃকালে সর্বাপেক্ষা অধিক নূতনত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা হইয়াছিল। সেদিনকার দীর্ঘ আলোচনার বিষয় ছিল ‘ভক্তি’—প্রেমাস্পদের সহিত সম্পূর্ণ তাদাত্ম্য, যাহা চৈতন্যদেবের সমসাময়িক ভুম্যধিকারী ভক্তবীর রায় রামানন্দের মুখে এরূপ সুন্দরভাবে প্রকাশ পাইয়াছে—
“পহিলহি রাগ নয়নভঙ্গ ভেল;
অনুদিন বাড়ল অবধি না গেল।
না সো রমণ না হাম্ রমণী;
দুঁহ মন মনোভাব পেশল জানি।” ইত্যাদি।
ভগিনী নিবেদিতার ‘স্বামীজীর সহিত হিমালয়ে’ থেকে


