নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: পুজো মরশুমে শিল্পভাবনার পালে বাতাস লাগে। স্মৃতি থেকে পুরাণ, জীবনের আখ্যান হাতড়ে কখনও মন্থন করে তুলে আনা হয় থিম। চলতে থাকে অনুসন্ধান, এককথায় রোমন্থন এবং মন্থন। পরিণাম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, গালে হাত দিতে বাধ্য করে। সৌন্দর্য চোখ ঝলসে দেয়।
এমনই দুই বাস্তব আধারিত কিন্তু কল্পনার ছোঁয়া লাগা পুজোর আয়োজন এবার চমকে দেওয়ার যাবতীয় অস্ত্র সাজিয়ে বসেছে। দু’টি পুজোকে কেন্দ্র করে শ্রীরামপুর ও চুঁচুড়ার চমকের বাসরে অতিরিক্ত মাত্রা জুড়ছে। শ্রীরামপুরের চাতরা দত্তপাড়া সর্বজনীনের এবারের আয়োজন ‘দুর্গামাধব’। রথযাত্রার সময় পুরী ও জগন্নাথ নিয়ে অনন্ত চর্চা হয় কিন্তু শারদীয়া পর্বের জগন্নাথধাম সম্পর্কে বিশেষ চর্চা হয় না। তাতেই অনেকটা পর্দার আড়ালে থেকে গিয়েছে ‘গুপ্ত-গুণ্ডিচা’। সেই বিষয়টিকেই থিমে ধরেছেন উদ্যোক্তারা। জগন্নাথের আদলে দুর্গাকে গড়ে তোলা হয়েছে। শ্যামবর্ণা দেবীর সেই নান্দনিক অবয়বই নজর কাড়ে। দেবীর বংশীবাদন ভঙ্গি। তাঁর সন্তানসন্ততিরা থাকছেন চৈতন্যের নগরসংকীর্তনের ভঙ্গিতে। দেবী বিমলা পুরীতে আদ্যশক্তি হিসেবে অবস্থিত। শারদীয়ার সময় বিমলা মন্দিরেই পাঠানো হয় জগৎপ্রভুকে। তিনি দুর্গামাধব হিসেবে পুজো নেন। কোনারক শিলালেখ অনুসারে, ১২৩৮ বঙ্গাব্দে রাজা প্রথম নরসিংহদেব দুর্গামাধব পুজো করেছিলেন। জগন্নাথের তখন অবতার হয়, জগনমোহন। দেবী তখন পুরীর শক্তিপীঠের যোগমায়া হয়ে ওঠেন আর জগন্নাথ তাঁর ভৈরব। এসব কিছু মণ্ডপ থেকে প্রতিমাসজ্জায় তুলে ধরছেন উদ্যোক্তারা। থাকছে পুরী তথা ওড়িশার পটচিত্রের আদলে মণ্ডপসজ্জা। আলোকসজ্জাতেও থাকছে ওড়িশার পটচিত্রের আদল, থিমের অনুসরণ। সবমিলিয়ে বেনজির এক অবয়বের সঙ্গে চোখধাঁধানো মণ্ডপসজ্জা সাজিয়ে বসেছে দত্তপাড়া সর্বজনীন। পুজো উদ্যোক্তা অভিষেক প্রামাণিক বলেন, ‘পুরাণ থেকে জনশ্রুতি, গুপ্ত-গুণ্ডিচাকে আমরা দর্শকের সামনে তুলে ধরব। জগৎপ্রভু ও যোগমায়ার সম্মিলন এবার বাঙালির কাছে আত্মপ্রকাশ করবে।’
বেনজির দেবীর পাশাপাশি রয়েছে এক বেনজির আয়োজনও। প্রথমবার থিম পুজোর পসরা সাজিয়ে বসেছে চুঁচুড়ার কেওটা অগ্রগামী সঙ্ঘ। পুজোর আয়োজনও প্রথমবারের। কেওটার বড় রাস্তার ধারে একটি সুবর্ণ প্যালেস তৈরি করা হচ্ছে। থিমের নাম, ‘মাতৃরূপে রাজস্থানের রূপকথা’। রাজস্থানের হাওয়া মহল সহ একাধিক রাজভবনের স্থাপত্যকে এক জায়গায় এনে নয়নাভিরাম মণ্ডপসজ্জা দেখা যাবে। সমস্ত মণ্ডপকেই সোনার সাজে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে। যা রাতের অন্ধকারে এক মহাকাব্যিক চেহারা নেবে। সেই আয়োজনে বিশেষ রকমের আলোকসজ্জা ব্যবহার করা হচ্ছে। দেবী মৃণ্ময়ী। কিন্তু তাঁর আদলে থাকবে রাজস্থানী পটশিল্পের ছোঁয়া। রাজস্থানের রূপকথার পূর্ণাঙ্গ রূপারোপের জন্য শতাধিক মডেল ব্যবহার করা হচ্ছে। তার মধ্যে অতি অবশ্যই থাকছে মরু জাহাজ, উট। রাজস্থানী পুতুল, পুতুলে রাজস্থানী নাচ দেখানোর বন্দোবস্তও মণ্ডপসজ্জার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে। পুজো উদ্যোক্তা সঞ্জীব কর্মকার বলেন, ‘দর্শকরা চিত্তসুখে বঞ্চিত হবেন না, নিশ্চিত করে বলতে পারি।’