Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

একতরফা রাজস্ব সংগ্রহের নেশা

মানুষের অভিজ্ঞতা এটাই যে, জিনিসের দাম একবার বাড়লে আর কমে না।

একতরফা রাজস্ব সংগ্রহের নেশা
  • ২১ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মানুষের অভিজ্ঞতা এটাই যে, জিনিসের দাম একবার বাড়লে আর কমে না। বরং ধাপে ধাপে বৃদ্ধিরই ফুরসত খোঁজে। তবে হ্যাঁ, ভোট বড়ো বালাই। ভোটের আগে অল্প কিছুদিনের জন্য জিনিসের দামবৃদ্ধি সরকার থামিয়ে রাখে, দাঁতে দাঁত চেপে তীব্র যন্ত্রণা সইবার মতো করে। এই ‘ঐতিহ্যই’ ফিরে এল সম্প্রতি। ভোট মিটতেই গত শুক্রবার একধাক্কায় বাড়ানো হয়েছিল লিটারে ৩ টাকা। চারদিনের মাথায় মঙ্গলবার ফের বাড়ল পেট্রল-ডিজেলের দাম। রাজধানী দিল্লিতে পেট্রলের দাম বাড়ল প্রতি লিটারে ৮৭ পয়সা। ৯৬ পয়সা কলকাতায়। একইভাবে দামি হল ডিজেলও। দিল্লিতে প্রতি লিটারে ৯১ পয়সা। ৯৪ পয়সা কলকাতায়। আগামীদিনে আরো বাড়বে বলেই পেট্রলিয়াম মন্ত্রক সূত্রের খবর। বর্তমান চড়া দামে ক্রেতারা আপাতত অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। তারপরই সুযোগ বুঝে কোপ দেবে ওস্তাদ সরকার। এটাই নিয়মের চেহারা নিয়েছে। কদিন পর পর ৮০ পয়সা থেকে ১ টাকা করে এই পর্বে ৮ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট মহল। ভারত পেট্রলিয়াম, ইন্ডিয়ান অয়েল এবং হিন্দুস্তান পেট্রলিয়ামের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলির দাবি, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধপরিস্থিতির যে ধাক্কা তাদের উপর এসে পড়েছে তাতে সংস্থাগুলির দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ গড়ে ৭৫০ কোটি টাকা! কোম্পানিগুলির দাবি, তাই অস্তিত্বরক্ষার জন্যই তারা দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। 

Advertisement

কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যে লাভ, লোকসান দুটিই স্বাভাবিক ফল। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ভীষণ কম ছিল তখন ভারতীয় কোম্পানিগুলি বিপুল অর্থই লাভ করেছিল। দেশবাসীকে সেই দামের সুবিধা তখন কিন্তু দেওয়া হয়নি। নাগরিকের কাছ থেকে টানা চড়া মাশুলই আদায় করা হয়েছিল সেইসময়। তেল কোম্পানিগুলি তখন ফুলেফেঁপে উঠেছিল বস্তুত সেই টাকায়। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বেসরকারি—উভয় মালিকানার কোম্পানিগুলি আজকের পরিস্থিতিতে মোটেই হাত তুলে দিতে পারে না। জনস্বার্থে তেলের দাম কম রাখাটাই হবে তাদের পক্ষে ব্যবসায়িক ধর্মপালন। দায় এড়াতে পারে না মোদি সরকারও। তেলের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগগুলির সদ্ব্যবহার করা হচ্ছে না বলেই খবর রয়েছে। এই ঘটনা সরকারের অদক্ষতা ও ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। এর জবাব সরকারকে দিতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেই দায়গ্রহণ এবং জবাবদিহিতার রাস্তায় গেলেন না। বরং সেসব এড়িয়ে কিছু ‘ভালো ভালো পরামর্শ’ দিলেন দেশবাসীকে। সেখানে সংযম এবং মিতব্যয়িতার জ্ঞানদান ছাড়া কিছুই পাওয়া গেল না। এসব বাণী বইপত্রেও সুলভ। তার জন্য সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজন পড়ে না। দামবৃদ্ধির প্রসঙ্গে প্রশ্ন হল, তেলের দামবৃদ্ধিতে এখানেই কি ইতি পড়বে? তেলের দাম বৃত্তান্ত এবং স্বাভাবিক বুদ্ধি বলে দামবৃদ্ধি এখানেই থামবে না। ধাপে ধাপে বাড়তেই থাকবে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মতোই। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই আঘাত কতটা সইতে পারবে? বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণির প্রকৃত আয়—বৃদ্ধির পরিবর্তে যে নিম্নমুখী! এই ঘন ঘন মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তারা জুঝবে কী করে? দামবৃদ্ধির এই দায় কে নেবে? তাহলে সরকার থাকার মানেটা কী? নিজের ম্যাও যদি নিজেকেই সামলাতে হয়, তাহলে এত কসরত করে, অপরিমেয় ত্যাগ স্বীকার করে সরকার গড়ে কী লাভ? 
তাও আবার, এবার পশ্চিমঙ্গে তৈরি হয়েছে ডবল ইঞ্জিন সরকার। রাজ্যে পাঁচ দশকে প্রথম ডবল ইঞ্জিন সরকার এবং স্বাধীনতার পর প্রথম বিজেপি সরকার। স্বভাবতই কেন্দ্র এবং রাজ্য উভয়েরই কাছে বাংলার মানুষের প্রত্যাশা বিপুল। অন্তত পাঁচ দশকের মধ্যে সর্বাধিক সুরাহা মিলবে বলে আশাই করে আছে তারা। মানুষের প্রত্যাশার দিকটি মাথায় রেখেই পদক্ষেপ করুক সরকার। সবার আগে মাথায় রাখুক, তেলের দাম কিন্তু একা বাড়ে না। তেলের দামবৃদ্ধি সমস্ত পণ্য ও পরিষেবাকে দামি করে দেওয়ার নির্ণায়ক। কারণ এই সূত্রে সবার আগে বেড়ে যায় পরিবহণ খরচ। পরিবহণ ব্যয়ের আঁচ সবকিছুরই গায়ে লাগে। শুধু তেল নয়, দাম বাড়ছে সিএনজিরও। ১৫ মে দিল্লি ও মুম্বইসহ একাধিক শহরে সিএনজির দাম কেজিতে ২ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। এরপর রবিবার আবারো সিএনজির দাম কেজিতে ১ টাকা বেড়েছে। এরপর পালা কি কলকাতাসহ বাকি মহানগরগুলির? রান্নার গ্যাসের মতো জ্বালানিরও দামবৃদ্ধির আশঙ্কা গভীর হচ্ছে। একে গ্যাস অগ্নিমূল্য এবং তার জোগানও অত্যন্ত সীমিত। এরপর কী হবে ভাবতেই শিউরে উঠছে সকলে। এই ভয়াবহ গোলযোগে কর্মসংস্থান ধাক্কা খেলে ধস নামতে পারে গোটা অর্থনীতিতে। তাই তেল ও গ্যাসের দামবৃদ্ধির বিষয়টিকে সরকার যেন হালকাভাবে না নেয়। এই সূত্রে একতরফা রাজস্ব সংগ্রহের নেশার পরিণাম আগামী দিনে ভয়াবহ হতে পারে। তাই সাধু সাবধান!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ