পরিবর্তনের পুজো
  • ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ছেলেমেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মা এসেছেন বাপের বাড়ি। তাঁকে নিয়ে জনস্রোতে প্লাবিত মহানগর। আনন্দে উদ্বেলিত গোটা রাজ্য। দুর্গাপুজোর এই শুভক্ষণ বাঙালি জীবনে সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। শুধু শাস্ত্র মেনেই মায়ের আরাধনা নয়, পুজো আজ বাঙালি জীবনে সবচেয়ে বড়ো সামাজিক উৎসবের চেহারা নিয়েছে। এই পরম্পরা, ঐতিহ্য যেন সব মলিনতাকে ধুইয়ে দেয়। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার-এর এমন উৎকৃষ্ট নজির আর কোথায় কীসেই বা মেলে! দেখা যাচ্ছে, এবছর পুজোয় কোথাওবা মাঝে মাঝে ঝিরঝির বৃষ্টি ‘অসুর’-এর মতো ছদ্মবেশে উৎসবের আনন্দে জল ঢেলে দেওয়ারও চেষ্টা করছে বটে, কিন্তু তাতে মানুষের অবশ্য উৎসাহে ভাটা পড়ার কোনো লক্ষণ নেই। মণ্ডপের শিল্পকর্ম, প্রতিমার নির্মাণশৈলী, চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা, ঢাক-কাঁসরের শব্দ, পাড়ার আড্ডা, প্রীতিভোজ, নতুন পোশাকের গন্ধ, মায়ের আগমনিতে বুঁদ আট থেকে আশি। আসলে এমন এক সর্বজনীন উৎসবের স্রোতে গা ভাসাতেই তো প্রহর গোনা চলতে থাকে সারা বছর। এর অন্যথা হওয়ার জো কোথায়!

Advertisement

রাজ্যে পরিবর্তন অবশ্য একটা হয়েছে। সেটা সরকারের। এই পরিবর্তনের হাত ধরে শাসকের চেহারা বদলেছে। এই পরিবর্তনে বঙ্গজীবনে কতটা বদল আসবে তা এখনও বলার সময় আসেনি। তবে গত মে মাসে নতুন বিজেপি সরকার শপথ নেওয়ার পর প্রত্যাশিত বা অপ্রত্যাশিত কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে এই ক’মাসেই। শিল্পে খরার রাজ্য বলে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের একটা সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যুব সমাজের স্বপ্নপূরণে সরকারি ক্ষেত্রে নিয়োগের কিছু উদ্যোগ চোখে দেখা যাচ্ছে। অনেক বিতর্ক ও প্রশ্ন থাকলেও বিগত সরকারের আমলে সীমাহীন দুর্নীতির পর্দা ফাঁস করতে সরব হয়েছে নতুন সরকার। এটা ইতিবাচক পদক্ষেপ। বহু কেন্দ্রীয় প্রকল্প, স্রেফ রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে যা এতদিন ব্রাত্য ছিল এরাজ্যে, তার সফল প্রয়োগের বার্তায় অর্থনীতিতে গতি আসবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। যৌথ উদ্যোগে পরিকাঠামোগত উন্নয়নে যেসব ঘোষণা হয়েছে বা হচ্ছে—তার প্রকৃত বাস্তবায়ন হলে যে রাজ্যের চেহারাটা অনেকটাই বদলে যাবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আবার সরকারের যাবতীয় কুযুক্তি ও মামলার টানাপোড়েন অতিক্রম করে সরকারি কর্মচারীরা তাঁদের মহার্ঘ ভাতা বা বকেয়া ডিএ পেতে শুরু করেছেন পুজোর আগেই— এও কম কথা নয়। এমন আরও কয়েকটি উদ্যোগ যা কানে শোনা যাচ্ছে, চোখে দেখা যাচ্ছে, তা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক।
কিন্তু সংবিধান হাতে নিয়ে শপথ নেওয়া একটি সরকার যখন রাজধর্ম পালনের চেয়ে দলীয় আদর্শ ও ভাবধারা রাজ্যের মানুষের উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে উদ্যত হয়—সেই পরিবর্তন কখনোই কাম্য হতে পারে না। অথচ সেটাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিষফোঁড়ার মতো দেখা যাচ্ছে বলে জোরালো অভিযোগ উঠছে। দেখা যাচ্ছে যে ভিন্নতার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এ রাজ্যের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ বলে গোটা দেশ মনে করে, তার গোড়ায় যেন আঘাত দিতে চাইছে নতুন শাসকেরা। এর নজির একাধিক। কয়েকটির উল্লেখ করা যাক। মাস কয়েক আগে মধ্যপ্রদেশ থেকে আসা এক ধর্মগুরু রাজ্যে এসে বাঙালিকে অভিযুক্ত করে বলেন, দুর্গাপুজোর সময় যারা আমিষ খান বা মণ্ডপের আশপাশে আমিষ খাবারের দোকান দেন, তাঁরা ‘পাখণ্ডি’ বা ‘ভণ্ড’! পরবর্তীকালে শাসকগোষ্ঠীর একাধিক নেতা ও পদাধিকারীকে প্রায় নির্দেশের ভঙ্গিতে মুসলিমদের দোকান থেকে খাদ্যসামগ্রী না কেনার হুঁশিয়ারি দিতে শোনা গিয়েছে একাধিকবার! বিতর্ক উঠেছে দুর্গাপুজোকে ‘শারদোৎসব’ বলা নিয়েও। অথচ একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত এই শব্দবন্ধের মধ্যে হিন্দুধর্মকে আরও বড়ো পরিসরে তুলে ধরার চেষ্টা রয়েছে। এই পুজোয় যে কেবল হিন্দুরা আনন্দে মাতেন এমনটা নয়, বরং একের আনন্দ অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার কথা বলে, শারদোৎসব তো তারই বার্তা দেয়। অথচ শাসকের হুঁশিয়ারিতে তা আজ চ্যালেঞ্জের মুখে! আগের সরকারের আমলে পুজোয় ঢালাও অনুদান, বিসর্জনের কার্নিভাল নিয়ে অনেক সমালোচনা, কটাক্ষ, বিদ্রুপ শোনা গিয়েছে বর্তমান শাসকের মুখে। অথচ দেখা গেল অনুদানের সেই ট্র্যাডিশন অব্যাহত। তবে বলা হল যাদের ‘প্রয়োজন’ তা বুঝে। আর সরকারি খরচে বর্ণাঢ্য বিসর্জনের জায়গা নিয়েছে মনোমুগ্ধকর বোধনের অনুষ্ঠান! এই শহর, এই রাজ্য সাক্ষী, গত প্রায় অর্ধ শতাব্দী ধরে বামপন্থীরা, বিশেষত সিপিএম বিভিন্ন পুজো মণ্ডপের অদূরে বইয়ের স্টল দেয়। সেইসব স্টলে মার্কসীয় সাহিত্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দ, জীবনানন্দ, কবি সুকান্ত থেকে বিশ্বখ্যাত বহু লেখকের বইও থাকে। এবার রাজ্যের বিভিন্নপ্রান্তে অনেকটা উৎসবের মেজাজেই বুক স্টল ভাঙার মহোৎসব চলছে নির্বিচারে! এর সাক্ষী পুলিশ দর্শকের ভূমিকায়! অভিযোগ অন্তত তেমনই। মজার কথা হল, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজেপি নেতারা এর দায় এড়িয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে তৎপর। অথচ পুলিশ কোথাও দুষ্কৃতীদের একাজে বাধা দিচ্ছে না। এসব দেখে প্রশ্ন উঠেছে, রাজ্যের মানুষ কি এই পরিবর্তন দেখতে চায়? সারা বছর যতই সমস্যা থাক মানুষ চায় পুজোর দিনগুলিতে অন্তত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকুক।