অশুভ শক্তি বিনাশের লক্ষ্যে লড়াই উৎসবেও
  • ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: এখনও বাতাসে হিমের ছোঁয়া সেভাবে লাগেনি। তবে, কাশফুলের দোলা আর গাছ থেকে টুপ টুপ করে ঝরে পড়া শিউলির দল জানান দিচ্ছিল, মা আসছেন। অপেক্ষার অবসান। আজ মহাসপ্তমী। আলোর জোয়ারে ভাসছে চরাচর। অশুভ শক্তি বিনাশের জন্য মাতৃশক্তির আরাধনায় মেতেছে আপামর বাঙালি। উৎসবের আবহেও জারি আছে লড়াই। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণকারী অশুভ শক্তিকে বিনাশের লড়াই। ভারত গড়ার ভবিষ্যৎ কারিগররা জানে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে দেশজুড়ে যে নিকষ কালো অন্ধকার নেমে আসবে, তা উৎসবের রোশনাইয়েও দূর হবে না। তাই মা আনন্দময়ীর আগমনের আনন্দে গা না ভাসিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে আছে লড়াইয়ের ময়দানে। দুর্গোৎসব নয়, এই মুহূর্তে ‘রাবণপোড়া’ই তাদের প্রিয় উৎসব।

Advertisement

এবারের পুজোটা বঙ্গ বিজেপির কাছে একটু অন্য রকম। একুশের নির্বাচনে মুখ থুবড়ে পড়ার পর ছাব্বিশে বিপুল সাফল্য। রাজ্যে ডাবল ইঞ্জিনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রথম দুর্গোৎসব। রাজনৈতিক দলগুলির কাছে উৎসব মানে তো শুধু আনন্দ আর হুল্লোড় নয়। জনসংযোগ স্থাপনের এক সুর্বণ সুযোগও। সেই সুযোগকে অল্প বিস্তর সমস্ত রাজনৈতিক দলই কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তবে, রাজ্যের শাসক দল সব সময় অনেকটা এগিয়ে থাকে। এবারও আছে। গতবছর পর্যন্ত যাঁরা মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে ফিতে কেটেছিলেন এবার তাঁদেরই কেউ জেলের ঘানি টানছেন, কেউ বা হয়তো চুপচাপ ঘরের কোণে বসে ‘তোমার কর্ম তুমি করো মা, লোকে বলে করি আমি’ গাইছেন। ফলে বিজেপি খেলছে ফাঁকা মাঠে। প্রতিপক্ষ নেই। ফিতে কাটার প্রতিযোগিতায় তারা ‘ওয়াকওভার’ পেয়ে গিয়েছে। তা সত্ত্বেও উৎসবের আনন্দ তেমন নেই। কারণ তাড়া করে বেড়াচ্ছে জেন-জি, ককরোচদের শেষ দেখে ছাড়ার হুঁশিয়ারি।
দুর্গাপুজো থেকে দীপাবলি উৎসবের মরশুম। লক্ষ লক্ষ মানুষ সারা বছর এই সময়টার অপেক্ষায় থাকে। উৎসবের সময় সাধারণত রাজনৈতিক কচকচানি কেউ খুব একটা পছন্দ করে না। তাই জ্বলন্ত ইস্যুও পুজো এলেই হয়ে যায় ঠান্ডা। কিন্তু, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে তা উৎসবের মধ্যেও জারি রয়েছে। পুজোর মধ্যেই বসবে মক পার্লামেন্ট। সেখানে জ্ঞানেশ কুমারের বিচার হবে। ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে হবে বিরোধী জোটের সভা। এছাড়াও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাস্তায় নেমে আন্দোলনের জন্য বিরোধী জোটের নেতাদের তৈরি থাকতে বলেছেন রাহুল গান্ধী। 
ককরোচ ও বিরোধী জোটের আন্দোলনের চাপে জ্ঞানেশ কুমারের পরিণতি কী হবে, সেটা সময় বলবে। তবে, এই আন্দোলন বিজেপির রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন। কারণ রাহুল গান্ধী এতদিন ছিলেন কংগ্রেস নেতা। এই আন্দোলন তাঁকে এনে দিয়েছে বিরোধী জোটের নেতার মর্যাদা। রাস্তায় নেমে তাঁর লাগাতার লড়াই, বিরোধী জোটকে নেতৃত্ব প্রদান, তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে দেওয়ার মতো প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে একজন পরিণত নেতার ছাপ। অনেকে বলছেন, এতদিন বিরোধী জোটের কোনো মুখ ছিল না। তাই মোদি-অমিত শাহরা ছিলেন পরম নিশ্চিন্তে। কিন্তু, রাহুল গান্ধী যেভাবে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাতে বিরোধী মুখের সংকট বেশি দিন থাকবে না।
বিজ্ঞান আমাদের শিখিয়েছে, শক্তি অবিনশ্বর। শক্তি সৃষ্টি করা যায় না, আবার ধ্বংস করাও যায় না। শক্তি পৃথিবী সৃষ্টির আদিতে যা ছিল, এখনও তা-ই আছে। কেবল শক্তির রূপান্তর ঘটে। এক শক্তি 
অন্য প্রকার শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। কখনো বিদ্যুৎ শক্তি রূপান্তরিত হয় গতিশক্তিতে। আবার 
কখনো স্থায়ী শক্তি তাপশক্তিতে পরিণত হয়। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এইভাবেই এক শক্তি থেকে অন্য শক্তির রূপান্তর ঘটে। আর গণতন্ত্রে শক্তির নয়, রূপান্তর ঘটে শক্তিধারীর। সেই কারণেই রাজনীতিতে ঘটে ক্ষমতার বদল।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যারা রাষ্ট্রশক্তি বা শাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করে তারা মানুষের চোখে ‘শুভ শক্তি’ বলেই বিবেচিত হয়। কারণ অনেকে মনে করেন, রাষ্ট্র হচ্ছে শোষণের যন্ত্র। তাই বিরোধীদের লড়াই, আন্দোলন, যুক্তি-তর্কের জোরে রাষ্ট্রশক্তি ধীরে ধীরে হয়ে যায় ‘আসুরিক শক্তি’। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য রাষ্ট্রশক্তি এমনভাবে নখ, দাঁত বের করতে থাকে যখন তার থেকে মুক্তি পাওয়াই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। তাকে সরানোর জন্য শুরু হয় জীবনপণ লড়াই। 
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষ যাদের ‘শুভ শক্তি’ মনে করে ক্ষমতায় বসায় তারা কেন ‘অশুভ শক্তি’তে পরিণত হয়? কেন তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য মানুষ এত মরিয়া হয়ে ওঠে? এর একমাত্র কারণ ক্ষমতায় টিকে থাকার বাসনা। তারা ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতা ধরে রাখতে যত মরিয়া হয় ততই মানুষ থেকে দূরে সরে যায়।
যে শক্তি সমাজের কল্যাণ ও মঙ্গল করে মানুষের চোখে সেটাই ‘শুভ শক্তি’। মানুষ সেই শক্তিরই আরাধনা করে। তাকে চোখের মণির মতো আগলে রাখে। কিন্তু যখন সেই শক্তিই মানুষকে ভয় দেখিয়ে, ক্ষমতার দম্ভে অন্যায়কে ন্যায় বলে চালাতে চায়, তখন সে হয়ে যায় ‘অশুভ শক্তি’। মানুষ কায়মনোবাক্যে সেই শক্তির বিনাশ চায়। 
সমালোচনা এবং পরিচালনার মধ্যে যে আশমান-জমিন ফারাক, সেটা ক্ষমতায় না বসলে টের পাওয়া যায় না। সমালোচনা করা যতটা সোজা, পরিচালনা করা ততোধিক কঠিন। বিরোধীরা যখন শাসকের সমালোচনা করে, সমস্যা তুলে ধরে তখন সমস্যাজর্জরিত মানুষ তার সঙ্গে একাত্মতা বোধ করে। মনে করে, সরকার পরিচালনার দায়িত্ব এমনই একটি দলের পাওয়া উচিত। তারা ক্ষমতায় এলেই সব সমস্যা থেকে মিলবে মুক্তি। শিল্পের খরা কাটবে। বেকারদের চাকরি হবে। পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিন রাজ্যে যেতে হবে না। বছরের পর বছর স্বল্প বেতনে কাজ করা অস্থায়ী শ্রমিক ও কর্মীদের চাকরি হবে পাকা। সরকারের ব্যর্থতা আর সমস্যার কথা যারা বলে বঞ্চিতদের চোখে তারাই ‘শুভ শক্তি’। 
আর যারা লোক ঠকিয়ে, মানুষকে ধাপ্পা দিয়ে টাকার পাহাড় বানায়, তারা সাধারণ মানুষের চোখে হয়ে যায় ‘অসুর’। তখন সেই আসুরিক শক্তিকে সরিয়ে শুভ শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করাই হয় সাধারণ মানুষের লক্ষ্য। ছাব্বিশের নির্বাচনে সেই লক্ষ্যেই মানুষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিল। তাতে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু, মানুষ যাদের ‘অসুর’ চিহ্নিত করল তারা কি শাস্তি পেল? পায়নি। উলটে সেই আসুরিক শক্তি মিশে গেল তথাকথিত ‘শুভ শক্তি’র সঙ্গে। যাঁদের বিনাশ ও শাস্তির জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিল তাঁরাই এখন সরকারের শরিক। তাদের শাস্তি দেওয়া তো দূরের কথা, চোখের মণির মতো আগলে রাখছে।
অশুভ শক্তি হয় ভয়ঙ্কর। বিধ্বংসী। তার সামনে প্রতিরোধ গড়তে গেলেই হতে হয় ক্ষতবিক্ষত। রাষ্ট্রশক্তির বলে শাসক এতটাই বলীয়ান হয় যে তাকে একক শক্তিতে প্রতিহত করা সম্ভব হয় না। সেই শক্তিকে পরাস্ত করতে প্রয়োজন হয় জোট বাঁধার। শুধু মানবকুলেই নয়, স্বর্গেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছিল। পুরাণ সে কথাই বলে। 
অসুরদের অত্যাচারে স্বর্গচ্যুত হয়েছিলেন দেবতারা। আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে দেবতারা বারে বারে পরাজিত হয়েছেন। শেষপর্যন্ত দেবতাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরাস্ত হয়েছিল অসুর। মা দুর্গা হলেন সেই সম্মিলিত শক্তির প্রতীক। অনেক লড়াইয়ের পর আসুরিক শক্তির বিনাশ শেষে স্বর্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শুভশক্তি। 
ভারতবর্ষ বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। গণতন্ত্রে ভোটাররা ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচিত করেন। কিন্তু, জ্ঞানেশ কুমার এমন এক ব্যবস্থা চালু করেছেন যাতে সরকার তার পছন্দের ভোটার বেছে নিচ্ছে। বিরোধী হলেই বাদ। এই সিস্টেমের বিরুদ্ধেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে আন্দোলন। ‘অশুভ শক্তি’কে হটানোর লড়াই। লড়াইয়ের অভিমুখ ক্রমশ জ্ঞানেশ কুমারের দিক থেকে বিজেপির দিকে ঘুরছে। কারণ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জ্ঞানেশ কুমারের সিস্টেমকেই বিজেপি টিকিয়ে রাখতে চায়। প্রতিবাদ করলেই নেমে আসছে দমন-পীড়ন। সেই কারণে একদিন যাদের ‘শুভ শক্তি’র প্রতীক হিসাবে মাথায় তুলে রেখেছিল এখন মানুষ তাদেরই গণতন্ত্রের জন্য ‘অশুভ শক্তি’ বলে মনে করছে। তাই তাকে বিনাশ করতে এতটাই মরিয়া যে অকাল বোধনের পুণ্যলগ্নে উৎসবে না মেতে লড়াইয়ের ময়দানে পড়ে আছে মাটি কামড়ে।