শুভজিৎ অধিকারী: শ্রী গণেশের ডান পাশে নববধূর সাজে কলাবউ। পরণে ধবধবে সাদা থান। ললাটে গাঢ় সিঁদুরের চওড়া টিপ! এ আবার হয় নাকি? শাস্ত্রে তো কোথাও লেখা নেই। বরং প্রচলিত শাস্ত্রীয় বিধি হল, কলাবউকে স্নান করিয়ে আনার পর টকটকে লালপাড়ের সাদা শাড়ি পরানো। কোথাও কোথাও লালপাড় হলুদ শাড়ি পরানোরও শাস্ত্রীয় বিধান রয়েছে। এমন বিধানের সামাজিক গুরুত্বও অপরিসীম। বিশেষ করে বাঙালি সংস্কৃতিতে লালপাড় সাদা শাড়ি হল সধবা নারীর পবিত্রতা ও মাঙ্গলিক শক্তির আধার। তবে কেন কলাবউকে সাদা থান পরিয়ে মাখিয়ে দেওয়া হল সিঁদুর?
আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছর আগে দুঃসাহসিক এই প্রশ্নটা তুলে দিয়েছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অন্যতম পার্ষদ শ্রীনিত্যানন্দ মহাপ্রভু। রে রে করে উঠেছিলেন তৎকালীন অতি রক্ষণশীল তালেবররা। তখন এমনিতেই গোটা সমাজ ব্যবস্থা কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। তার উপর বাংলায় সদ্য হাবসিদের উৎপীড়নমূলক শাসনকাল শেষ হয়েছে। তার আগে বাংলা পেরিয়ে এসেছে তুর্কি-শাসনের দীর্ঘ মন্দ অধ্যায়। আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-আচরণে সব ওলটপালট অবস্থা। নিজেদের ধর্ম-সংস্কৃতির উপর আস্থার জায়গাটা নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে। ফের নতুন করে সবকিছু গোছাতে সংস্কারবাদী আন্দোলন শুরু করেছেন শ্রীচৈতন্য। সমাজের বঞ্চিত, অবহেলিত অংশকে ভক্তিরসের ধারায় সম্পৃক্ত করে সনাতনী-সংকটের মোকাবিলা করতে চাইছেন। বৈদিক সাত্বত ধারা মেনে শাক্ত সাধনার উপরও জোর দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, আবার তন্ত্র, শাক্ত, শৈব মতাবলম্বীদের দীর্ঘ সংঘাত ঘুচিয়ে হিন্দুধর্মের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের কাজ শুরু করেছেন নবদ্বীপের আর এক পণ্ডিত রঘুনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়-ভট্টাচার্য। তিনি স্মার্তধারার পণ্ডিত মানুষ। শ্রীচৈতন্য ও রঘুনন্দনের উদ্দেশ্য একই—বেদ-উপনিষদ ও স্মৃতিকে আঁকড়ে হিন্দুধর্মের পুনর্জাগরণ। তবে, দু’জনের পথ ছিল ভিন্ন। শ্রীচৈতন্য চেয়েছিলেন বেদ বহির্ভূত উগ্র ব্রাহ্মণ্যবাদকে উপড়ে ফেলে আমূল সামাজিক সংস্কার। আর রঘুনন্দন চাইতেন, আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রগুলির মত-পার্থক্যের সমন্বয় সাধন।
ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে শ্রীচৈতন্য বাংলায় ভক্তিবাদ আন্দোলনকে সুসংহত রূপ দিতে নিয়োগ করলেন নিত্যানন্দকে। নির্দেশ দিলেন, গঙ্গার দু’পাড় বরাবর ভক্তিরসের ধারাকে প্রবাহিত করার। নিত্যানন্দ এসে উঠলেন ভাগীরথীর পাড় সংলগ্ন খড়দহ গ্রামের পুরন্দর পণ্ডিতের বাসভবনে। নিত্যানন্দ শাক্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান। চৈতন্য-সান্নিধ্যে তিনি এখন পরম বৈষ্ণব। পুরন্দর পণ্ডিত তাঁকে ২৬ বিঘা জমি দান করলেন। সেই জমিতে নিত্যানন্দ গড়ে তুললেন বসতবাড়ি—‘কুঞ্জবাটি’।
সালটা ১৫৩০। ওই ‘কুঞ্জবাটি’তে কাত্যায়নী রূপে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করলেন নিত্যানন্দ। বৈষ্ণবীয় আচারে শাক্ত সাধনা। সপ্তমীর সকাল। গঙ্গার ঘাট থেকে কলাবউ বা নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে এনেছেন নিত্যানন্দ। বৈদিক উপাচার মেনে তাঁকে মায়ের বেদিতে অধিষ্ঠিত করবেন। নিত্যানন্দ চূড়ান্ত ব্যস্ত। দূরদূরান্ত থেকে তাঁর ভাবশিষ্য, শিষ্যারা এসেছেন। সবার হাতে নানা দান সামগ্রী। হঠাৎ, এক বিধবা সুন্দরী রমনী শশব্যস্ত হয়ে নিত্যানন্দের সামনে হাজির। তাঁর হাতে সযত্নে ধরা সাদা একটা কাপড়ের থান। দেখে চমকে উঠলেন নিত্যানন্দ। কিছু বলার আগেই সাদা থানটি নিত্যানন্দের হাতে ধরিয়ে অন্তর্হিত হয়ে গেলেন ওই বিধবা রমনী। নিত্যানন্দ পড়লেন গভীর চিন্তায়। কিছুক্ষণ ধ্যানমগ্ন থাকার পর বিধবার দেওয়া সেই সাদা থানটি নিজের হাতে পরিয়ে দিলেন কলাবউ বা নবপত্রিকাকে। তারপর যেটা করলেন, সেটা রক্ষণশীল সমাজের কাছে গা জ্বলে যাওয়ার জোগাড়! নিত্যানন্দ ওসব না ভেবে কলাবউকে পরানো ওই সাদা থানে এঁকে দিলেন গাঢ় সিঁদুরের টিপ! একেই পরম বৈষ্ণবের শাক্ত সাধনা, তার উপর এমন দুঃসাহসিক আচার—নিত্যানন্দের উপর সেদিন চটে লাল হয়ে গিয়েছিলেন তন্ত্র ও শাক্তমতের সাধকরা। কিন্তু, নিত্যানন্দ সবার চোখরাঙানি উপেক্ষা করে কলাবউকে সাদা থানা পরানোর ধারা বজায় রেখেছিলেন জীবদ্দশা পর্যন্ত। পরে নিত্যানন্দের বংশধররা বাংলার নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েন। তাঁদের অনেকের বাড়িতে এক সময় কাত্যায়নী রূপে দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল। নিত্যানন্দের প্রচলিত নিয়ম মেনে কলাবউকে সাদা থান পরানো হতো। এখন নিত্যানন্দের চতুর্দশতম বংশধর মেজোবাড়ির সন্তান সরোজেন্দ্রমোহন গোস্বামী সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন। নিত্যানন্দেরর পরিবারের বড়োবাড়িতেও কলাবউকে সাদা থান পরানোর ধারা আজও অব্যাহত।
এখন প্রশ্ন হল, কলাবউকে সাদা থান পরিয়ে তাতে সিঁদুর লেপে আসলে কী বার্তা দিতে চেয়েছিলেন নিত্যানন্দ? জবাব পেতে হলে কলাবউকে নিয়ে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার দিকে একটু চোখ ফেরাতে হবে। আমাদের একাধিক শাস্ত্রে নানা মুনির নানা মত। এলাকা ভিত্তিকও মতের তারতম্য রয়েছে। আমাদের এই বাংলা বরাবরই স্ব-ঐতিহ্যের পূজারি। সেই মতো বাঙালিরা মূর্তিপুজোর অনুসারী। অথচ, আমাদের চতুর্বেদ ও স্মৃতি শাস্ত্রগুলিতে প্রকৃতির আরাধনার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। বৈদিক ঋষিরা মূলত প্রাকৃতিক শক্তি, উর্বরতা এবং উদ্ভিদের পুজো করতেন। তাই যজুর্বেদ এবং তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দেবীকে শস্যদাত্রী এবং বনস্পতি হিসাবে বন্দনা করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এই ভাবধারা থেকেই পুরাণে ‘দেবী শাকম্ভরী’র আবির্ভাব। শ্রীশ্রী চণ্ডী বা মার্কেণ্ডেয় পুরাণে বলা হয়েছে, একবার ব্রহ্মাণ্ডে অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। দেবতারা মহামায়ার স্তবস্তূতি শুরু করেন। দেবী তখন নিজের দেহ থেকে উৎপন্ন শাকসবজি ও ফলমূল দিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের সকল জীবের ক্ষুধা নিবারণ করেন। তারপর থেকেই মহামায়ার নাম হয় ‘শাকম্ভরী’। বৈদিক ও পৌরাণিক মতে, শস্য উৎপাদনের এই ভাবনারই বাস্তব রূপ হল নবপত্রিকা বা কলাবউ।
কিন্তু, মধ্যযুগের শেষার্ধে এই বৈদিক ও পৌরাণিক তত্ত্বকে যে যাঁর মতো ব্যাখ্যা দিয়ে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে উঠে পড়ে লাগল সমাজের মাতব্বরদের একটা অংশ। সেটাকে রোধ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন লিখলেন যুগজয়ী গ্রন্থ—‘দুর্গোৎসব তত্ত্ব’। সেখানে তিনি দেবী দুর্গার সঙ্গে প্রাকৃতিক শক্তির মেলবন্ধন ঘটাতে নবপত্রিকা পূজনের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিলেন। রঘুনন্দনের আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল, সেটা হল সমাজের ফসল উৎপাদক শক্তি, সেই বঞ্চিত অবহেলিত কৃষককুলকেও দুর্গা আরাধনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা। নবপত্রিকা বা কলাবউ সম্পর্কে রঘুনন্দন লিখলেন—‘কদলী দাড়িমী ধান্যঃ হরিদ্রা, মানকংকচুঃ। বিল্বাশোকৌ জয়ন্তী চ বিজ্ঞেয়া নবপত্রিকাঃ।’ অর্থাৎ, নবপত্রিকা নির্মাণ করতে হবে কদলী (কলা), হরিদ্রা (হলুদ), মানকচু, দাড়িম্ব (ডালিম), কচু, অশোক, বিল্ব (বেল), ধান্য (ধান) এবং জয়ন্তী গাছের পাতা, কাণ্ড, ফল ইত্যাদি। সবক’টি উদ্ভিদকে একত্র করে শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। কৃত্তিবাসী রামায়ণেও আমরা দেখতে পাই—‘বাঁধিলা পত্রিকা নববৃক্ষের বিলাস।’
অতঃপর, নববৃক্ষ বা নবপত্রিকা হল ন’টি উদ্ভিদের সমষ্টি। প্রতিটি উদ্ভিদের প্রাকৃতিক শক্তির সঙ্গে আধ্যাত্মিক গুরুত্বকেও মিলিয়েছেন শাস্ত্রজ্ঞরা। কদলী বা কলাগাছ—দেবী ব্রহ্মাণী, সৃষ্টির প্রতীক। কচুগাছ— দেবী কালিকা, অশুভ শক্তির সংহারের প্রতীক। হরিদ্রা বা হলুদ গাছ— দেবী দুর্গা, রক্ষা ও মঙ্গলের প্রতীক। জয়ন্তীগাছ— দেবী কার্তিকী, বিজয় ও শক্তির প্রতীক। বিল্ব বা বেলগাছ—শিব বা দেবী শিবানী, মঙ্গল ও জ্ঞানের প্রতীক। দাড়িম্ব বা ডালিম গাছ—দেবী রক্ত দন্তিকা, অসুর বিনাশের প্রতীক। অশোক গাছ—দেবী শোকরহিতা, শোক ও দুঃখ মোচনের প্রতীক। মানকচু—দেবী চামুণ্ডা, সাহসের প্রতীক। সর্বশেষে ধানগাছ—দেবী লক্ষ্মী, ধনসম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
শাস্ত্র মতে নবপত্রিকা বা কলাবউ হলেন প্রাকৃতিক শক্তিরই অংশ। সেটাকে সমন্বয়বাদী শাস্ত্রীয় পণ্ডিতরা উৎসবের সঙ্গে বাংলার কৃষিকাজের ঐতিহ্যকে মিলিয়ে দিয়েছেন। প্রকৃতি ও দেবী দুর্গার সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। আমাদের বাংলায় প্রাচীন জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে বৃক্ষপূজার বিরাট চল ছিল। এখনও কোথাও কোথাও বট-অশ্বত্থ গাছে লাল কাপড় জড়িয়ে পুজো করার রীতি চালু রয়েছে। সমন্বয়বাদী শাস্ত্রজ্ঞরা ভাবলেন, হিন্দুধর্মের শক্তিবৃদ্ধি করতে হলে বাংলার প্রাচীন জনগোষ্ঠীগুলির প্রচলিত প্রথাকে বৈদিক আচারের সঙ্গে মেলাতে হবে। তাই, প্রাচীন বাংলার বৃক্ষপুজোর দ্যোতক হিসাবে দেবী দুর্গার বোধন বেল গাছের তলায় সম্পন্ন করার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করতে লাগলেন।
প্রভু নিত্যানন্দও ছিলেন সমন্বয়বাদী শাস্ত্রজ্ঞ। আগেই বলেছি, রঘুনন্দন ও চৈতন্য, দু’জনেই সংস্কারবাদী হলেও পথ ছিল ভিন্ন। চৈতন্য-নিত্যানন্দ, অদ্বৈত, শ্রীবাস, গদাধররা চাইতেন সমাজের সব শ্রেণির সমন্বয় সাধন। সবার মধ্যে সহজ পন্থায় আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে সনাতন ধর্মের পুনর্গঠন। তখন জাতিভেদ প্রথা, কুলীন প্রথা সমাজের কাছে অভিশাপ। ‘বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা’ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলায়। বৃদ্ধ স্বামীর মৃত্যু হলেই অল্প বয়সে বিধবা। সেই বিধবা হয় সতীদাহ প্রথার বলি হতেন, নতুবা সমাজে অচ্ছুত হয়ে দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে দিনযাপন করতেন। সবমিলিয়ে, গৌড়বঙ্গের গোটা সমাজ ঘোরতর সংকটে। তমসাচ্ছন্ন সেই সমাজকে আলোর দিশা দেখাতেই কি নিত্যানন্দ বিধবার দেওয়া সাদা থানে সিঁদুর পরিয়ে নবপত্রিকাকে নববধূর রূপ দিয়েছিলেন? আজও এই প্রশ্নের উত্তর রহস্যে ঢাকা।
সমাজ সংস্কারক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বেদ সহ প্রাচীন শাস্ত্র থেকে অকাট্য তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরে বিধবা বিবাহ আইন প্রচলনে লড়াই করেছিলেন। অবশেষে ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ সরকার আইন প্রণয়ন করে। তা হলে তো এটা বলা যেতেই পারে, চৈতন্য পার্ষদ নিত্যানন্দ কলাবউকে সাদা থান পরানোর ৩২৬ বছর পর সিঁথিতে সিঁদুর পরেছিলেন বিধবারা।



