নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা জব চার্নক নন। এ জনপদ প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন। সে সভ্যতা সমৃদ্ধশালী। এ সব কথা বরানগরে। আর বরানগরে এক চালচিত্রে সপরিবারে দুর্গা, সঙ্গে কালীঘাটের ইতিহাস। এছাড়া শহর থেকে প্রায় উঠতে চলা ট্রাম। স্মৃতি চাগিয়ে ছুটবে বরানগরে। এছাড়া সবুজরক্ষার মাধ্যমে মানব সভ্যতাকে বাঁচানোর আর্তি। বা নবপত্রিকার প্রতিটি গাছে অধিষ্ঠিত দেবীর রূপ। সবমিলিয়ে বরানগর দেবে ইতিহাস থেকে প্রকৃতিরক্ষার পাঠ। ফিরিয়ে দেবে স্মৃতিমেদুরতা।
সিঁথির মোড়ে বন্ধুদল স্পোর্টিং ক্লাবের পুজো এবার ৬৪ বছরে পা দিয়েছে। তাদের থিম ‘কালীসুতাপুর’। প্রাচীন কলকাতার গল্প তুলে ধরেছে তারা মণ্ডপে। জব চার্নক আসার হাজার হাজার বছর আগেও ছিল এই জনপদ। সে সভ্যতা আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন। সে শহর তখন ছিল ব্যবসা সমৃদ্ধ অঞ্চল। সেই শহরে তার বহু পরে ১৬১০ খ্রীষ্টাব্দে একচালায় সপরিবারে দুর্গা ঠাঁই নেন। দেবীর আরাধনা শুরু করেন লক্ষ্মীকান্ত রায়চৌধুরী ও ভগবতীদেবরা। বড়িশার সাবর্ণ চৌধুরীর পূর্বপুরুষদের হাত ধরে শুরু হওয়া সেই পুজোর চিত্র ফুটে উঠবে মণ্ডপে। প্রবেশ পথেই দশ মহাবিদ্যায় দেবীর দশরূপ। মণ্ডপের মুখে চারশো বছর প্রাচীন রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজোর ছবি। মণ্ডপের অভ্যন্তরে আরও চমক। মূল মণ্ডপের ভিতর হচ্ছে কালীক্ষেত্র কালীঘাট। কালীর রূপ দেখার পর চোখে পড়বে প্রাচীন দুর্গামূর্তি। এছাড়া মণ্ডপের অন্দরমহল সাজছে প্রাচীন কলকাতা শহর ও তার নানা স্থাপত্যে। থিম রূপায়নে ক্লাবকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিয়েছেন সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায়চৌধুরী। পুজো কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক বাসবচন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘কলকাতার প্রাচীন ও বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাস নতুন করে জেগে উঠবে মণ্ডপে। শহরের ধর্ম-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে আমাদের থিম কালীসুতাপুর। দর্শনার্থীরা অভিভূত হবেন।’
মল্লিক কলোনি সর্বজনীনের পুজো এবার ৭৬ বছরে পা দিয়েছে। থিম 'বৃক্ষরূপেণ সংস্থিতা'। মণ্ডপজুড়ে সবুজরক্ষার বার্তা। প্যান্ডেলের বাইরে নবপত্রিকা। ন’খানি গাছে দেবীর রূপ ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। মূল মণ্ডপে বিশ্ব উষ্ণায়ন থেকে পৃথিবীকে রক্ষার ডাক। তৈরি করা হয়েছে বিশাল আকারের গ্লোব। বিভিন্ন প্রাচীন গাছ, ঋষিদের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হবে দেবতাদের রূপ। মায়ের মুখের আদল হবে গ্রাম্যবধূর আদলে। তাঁর দু’পাশে অসুর হাত জোড় করে থাকবেন। পুজো কমিটির কর্ণধার রামকৃষ্ণ পাল বলেন, ‘হিন্দু ধর্মের গভীরে রয়েছে প্রকৃতিরক্ষার বার্তা। নবপত্রিকার ন’টি গাছে মা নানা রূপে অধিষ্ঠান করেন। কচু গাছে কালী, ধান গাছে লক্ষ্মী, বেল গাছে দেবী শিবা। ন’টি রূপই ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রকৃতিকে না বাঁচালে মানব সভ্যতা বাঁচবে না। সেই বার্তা মণ্ডপের ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে।’
ডানলপ রবীন্দ্রনগর যুবকবৃন্দের পুজো এবার ৬৬ বছরে পা দিয়েছে। তাদের থিম-‘চলমান কলকাতা, ১৫০ বছরের ট্রামের ইতিহাস’। ট্রামের ভিতর দিয়ে মণ্ডপে প্রবেশ করতে হবে দর্শনার্থীদের। মণ্ডপের মধ্যে দুর্গা আসবেন রাজকীয় সাজে সেজে। ১৮৭৩ সালে কাঠের ট্রামের মডেল, ১৯০২ সালের ট্রামের চাকা, তৎকালীন সময়ের বড় পাখা, কাঠের চেয়ার দেখার সুযেগ পাবেন দর্শনার্থীরা। মণ্ডপে তুলে ধরা হবে শহরের বুকে প্রায় বন্ধ হতে বসা ট্রাম। তার গৌরবজ্জ্বল ইতিহাস। পুজো কমিটির কর্ণধার শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে ট্রামকে ঘিরে। সেই ট্রামের ইতিহাস চমক দেবে দর্শনার্থীদের। সঙ্গে যোগ হবে রঙের খেলা।’