ঘটনাবহুল জীবন। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আমাদের চারপাশে কিছু না কিছু ঘটে চলেছে। বহু ঘটনা হারিয়ে যায় মুহূর্তের ভিড়ে। কোনও ঘটনা উঠে আসে শিরোনাম হয়ে। আর তার মধ্যে কিছু রেখে যায় দাগ। রক্তের দাগ। এমনই সাড়া ফেলে দেওয়া কয়েকটি ঘটনা ফিরে দেখল বর্তমান। সোহম করের কলমে।
‘রহস্যময়ী’, ‘নির্যাতিতা’। বাংলা সংবাদপত্রে আকছার প্রকাশিত কিছু চেনা শব্দ। কেউ আত্মপ্রকাশ করেছেন শুধুই পুলিসের কাছে। কেউ ফোনের ওপারে, কেউ আবার টিভিতে... কিন্তু আড়াল রেখে। ২২ বছর আগের এক তরুণীকে ছাড়া। তাঁকে দেখেছিলেন বাপি সেন। পার্ক স্ট্রিটে ওই ঘটনার সময়। দেখেছিলেন তাঁর চার বন্ধু এবং অভিযুক্তরা। বাকি আর কেউ নয়। তিনি হারিয়ে গিয়েছেন রহস্যের অন্তরালে। চিরকালের মতো। পুলিস খুঁজেছে তাঁকে। লাগাতার। কিন্তু পায়নি। তিনি ‘ধরা’ দেননি। তদন্ত শেষে বিচার শুরু হয়েছে। অভিযুক্তদের আইনজীবী যুক্তি সাজিয়েছেন। অস্বীকার করেছেন গোটা ঘটনা। এক নতুন গল্প বলেছেন তিনি। বাপি সেন নাকি ওয়েলিংটনে আটকেছিলেন তাঁর মক্কেলদের ট্যাক্সি। মুখে মদের গন্ধ। ব্লু-বুক দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। চালক অস্বীকার করেন। তখনই নাকি বাপি ট্যাক্সির পিছনের দরজা খুলতে যান। চালক মধুকান্ত অস্বীকার করেন এবং গাড়ি চালিয়ে দেন। তখনই পড়ে যান বাপি সেন। ট্রামলাইনে। তার থেকে মৃত্যু। শ্লীলতাহানি? হয়ইনি!
ট্যাক্সিচালক মধুকান্ত ও তাঁর হেল্পার মেওয়ালাল পুলিসি জেরায় যা বলেছিলেন, তা কাঁটায় কাঁটায় মিলে গিয়েছিল বাপির বন্ধুদের সঙ্গে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে আদালতে উল্টো বয়ান দেন তাঁরা। প্রত্যেকের লক্ষ্য ছিল একটাই—বাপি সেনকে মদ্যপ প্রমাণ করা। সপক্ষে প্রমাণও দেওয়া হল। কী সেই প্রমাণ? মেডিক্যাল কলেজের আউটডোর টিকিট। সেখানে প্রাথমিক বর্ণনার পাশে লেখা ছিল, ‘টু পেগস অব অ্যালকোহল’। আদালতে শুরু হয়ে গেল বাপির ‘অসংযমী জীবনযাপনে’র চর্চা। টিআই প্যারেডে অভিযুক্তদের শনাক্ত করেছিলেন বাপির বন্ধুরা। আদালতে বলা হল, ওই অন্ধকারের মধ্যে চিনে রাখা সম্ভব নাকি? পুরোটাই ফালতু।
পুলিস কিন্তু হাল ছাড়ল না। মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার যাবতীয় চেষ্টা আটকে দিল তদন্তকারী অফিসার অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিখুঁত চার্জশিট এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট। মৃত্যুর কারণ সেই রিপোর্টে লেখা ছিল, ‘হোমিসাইডাল ইন নেচার’। অর্থাৎ, ‘খুন’। মেডিক্যাল কলেজের ফরেন্সিক মেডিসিনের বিভাগের প্রধান ডাঃ অজয় গুপ্ত জানালেন, আঘাত মোটেও গাড়ি থেকে পড়ে বা তেমন কোনও কারণে হয়নি। ‘ডিফেন্সিভ উন্ড’ আছে। তিনি আরও জানালেন, ভারী বুটজুতো জাতীয় কিছু দিয়ে মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। খুনের উদ্দেশ্যেই লাথি-কিল-ঘুষি মারা হয়েছিল। আর ওই আউটডোর টিকিট? বাপি কি মদ্যপান করেছিলেন? রহস্য যে সেখানেও। কারণ, টিকিটে কারও সই নেই। দু’রকম হাতের লেখা। সেটাও দু’রকম কালিতে। তাহলে কার নির্দেশে ওই লেখা? রক্ত পরীক্ষা না করেই কীভাবে ‘অ্যালকোহল’ পাওয়া গেল? তাও দু’পেগ? মেডিক্যাল কলেজ থেকে খিদিরপুরের কাছের যে বেসরকারি হাসপাতালে বাপি সেনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানকার চিকিৎসকও জোরের সঙ্গে বিরোধিতা করেন অভিযুক্তদের ‘মদ্যপ তত্ত্বে’র। তিনি বলেছিলেন, এখানে আনার পর প্রাথমিক পরীক্ষা হয়েছিল। এতদিনের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, তিনি মদ্যপ ছিলেন না।
আউটডোর টিকিটের ‘প্রমাণ’ পত্রপাঠ খারিজ করল আদালত। আর টিআই প্যারেড? বিদ্যুৎ সংস্থা ডিসি ডিডি’কে জানাল, সেদিন কোনও বিদ্যুত্ বিভ্রাট হয়নি। রাস্তায় পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো ছিল। আর সবক’টা জ্বলছিল। ফলে টিআই প্যারেড নিয়ে অভিযুক্তদের আইনজীবী যে যুক্তি সাজিয়েছিলেন, সেটাও নাকচ করল কোর্ট। পুলিসের শেষ অস্ত্র ছিলেন গণেশ বারিক ও সমীর ঘোষ। স্থানীয় একটি বেসরকারি কোম্পানির নিরাপত্তা রক্ষী। সেদিন রাতপাহারায় ছিলেন। বয়ান দিলেন তাঁরা। জানালেন সেদিনের মর্মান্তিক ঘটনা। নিম্ন আদালত ১ জুলাই, ২০০৪ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিল দোষীদের। মামলা গেল হাইকোর্ট... বহাল থাকল রায়। তারপর সুপ্রিম কোর্ট। মামলাই শুনল না আদালত।
৩৫ বছর বয়সে প্রাণ হারানো সার্জেন্ট আজ বেঁচে থাকলে অবসরের দোরগোড়ায় দাঁড়াতেন। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে। পর্ণশ্রীর সুদৃশ্য লেকের ধারের সরকারি আবাসনেই তাঁরা থাকেন। অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলে দরজার নেমপ্লেটে লেখা ‘সেন’স’। বেল বাজাতে এক বৃদ্ধা বেরিয়ে এলেন। বললেন, ‘বুঝেছি কেন এসেছেন। এখন ছেলেরা বড় হয়েছে। এসব নিয়ে কথা বলতে চায় না। কিছু মনে করবেন না।’ এই কারণেই হয়তো সামনে আসেননি ‘রহস্যময়ী’। হয়তো তিনি আছেন আমাদের আশপাশেই। চেনা চৌহদ্দির মধ্যে। হয়তো নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাতদখল করেছেন। হয়তো তাঁর আড়ালে থাকার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। না হলে যতবার নির্যাতন, ততবার ‘প্রতিক্রিয়া’র ঝাপটায় ছিন্নভিন্ন হতে হতো তাঁকে। কে তিনি?