পিনাকী ধোলে, পুরুলিয়া: রথযাত্রায় জাঁকজমকে এখন পুরুলিয়া জেলাও পিছিয়ে নেই। পুরুলিয়া, হুড়া, কাশীপুর, বলরামপুরের রথযাত্রাকে নিয়ে রয়েছে নানা চমকপ্রদ কাহিনী। প্রতিবছর এসমস্ত রথের রশি টানতে ভক্তদের ভিড় উপচে পড়ে।
পিনাকী ধোলে, পুরুলিয়া: রথযাত্রায় জাঁকজমকে এখন পুরুলিয়া জেলাও পিছিয়ে নেই। পুরুলিয়া, হুড়া, কাশীপুর, বলরামপুরের রথযাত্রাকে নিয়ে রয়েছে নানা চমকপ্রদ কাহিনী। প্রতিবছর এসমস্ত রথের রশি টানতে ভক্তদের ভিড় উপচে পড়ে।
পুরুলিয়া শহরের চকবাজারের রথযাত্রার সূচনা হয়েছিল এক বাইজির হাত ধরে। পুরুলিয়ার ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, কাশীপুরের রাজা নীলমণি সিংদেওর উচ্চাঙ্গ ঘরানার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি টান ছিল। সন্ধ্যায় নৃত্য ও সঙ্গীতের আসরে মজে থাকতেন রাজা। সেসময় সুদূর লখনউ থেকেও বাইজিরা সেখানে আসতেন। এমনই এক বাইজি ছিলেন মুন্নিবাই। তাঁর যেমন কণ্ঠ, তেমনি রূপ ছিল। মুগ্ধ রাজা তাঁকে মণিবাই বলেই ডাকতেন। রাজার সঙ্গে মণিবাইয়ের প্রেমের কথা রাজবাড়িতেও চাউর হতে থাকে। রাজপরিবারের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে রাজা তাঁকে প্রচুর ধনসম্পত্তি দিয়ে পুরুলিয়া শহরের চকবাজারে পাঠিয়ে দেন। পরবর্তীতে মণি বাই বৈষ্ণবমতে দীক্ষিত হন। তাঁর নাম হয় মনোমোহিনী বৈষ্ণবী। ১৮৯৮সালে প্রায় ৬০বছর বয়সে চকবাজারে রাধাগোবিন্দ জিউয়ের মন্দির গড়ে তোলেন তিনি। ১৩২০বঙ্গাব্দে তথা ইংরেজির ১৯১৩সালে তাঁর হাত ধরে পুরুলিয়া শহরে রথযাত্রার প্রচলন হয়। সেই থেকে পুরুলিয়া শহরের ঐতিহ্যবাহী মনোমোহিনী বৈষ্ণবী তথা মণি বাইজির রথযাত্রা হয়ে আসছে। প্রায় ১৯০বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২সাল থেকে পুরুলিয়ার হুড়ার কেশরগড়ে রথযাত্রা শুরু হয়েছে। কেশরগড় হাটতলা প্রাঙ্গণে উল্টোরথ অবধি আটদিনব্যাপী রথের মেলা হয়। পঞ্চকোট রাজপরিবারের ষষ্ঠ রাজধানী ছিল কেশরগড়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, পঞ্চকোটের তৎকালীন রাজা ভরতকিশোর ওরফে গরুড়নারায়ণ সিংদেওর হাত ধরে ১৭৯৩সাল নাগাদ এই রথযাত্রার সূচনা হয়। পরে পঞ্চকোট রাজবংশের রাজধানী কাশীপুরে স্থানান্তরিত হলে ১৮৩২সাল থেকে ওই রথের চাকা পুরোপুরি থেমে গিয়েছিল। ২০২২সালে শতাব্দীপ্রাচীন পঞ্চকোটরাজের রথযাত্রার পুনঃপ্রবর্তন হয়।
পুরুলিয়ার বলরামপুরে ১০০বছরের বেশি সময় ধরে রথযাত্রা চলে আসছে। ১০০বছর আগে ঠাকুরদাস মাঝি ও তাঁর চার পুত্র-শ্রীকান্ত মাঝি, সহদেব মাঝি, নকুল মাঝি ও দুবরাজ মাঝি বলরামপুরে সচ্ছলভাবে জীবন কাটাচ্ছিলেন। প্রভু জগন্নাথের ভক্ত শ্রীকান্ত বছরে প্রায় তিন-চারবার জগন্নাথ দর্শনে পুরীধাম যেতেন। পুরীর রথযাত্রা দেখে তাঁর মনে নিজের মাতৃভূমিতেও রথযাত্রা শুরুর ইচ্ছে জাগে। সেইমতো জগন্নাথধাম থেকে দারুবিগ্রহ নিয়ে এসে বলরামপুরে রথযাত্রার সূচনা করেন। পুরুলিয়া, বরাবাজার, আড়ষা, বাঘমুণ্ডি সহ ঝাড়খণ্ড থেকেও বহু মানুষ এসে ভিড় জমান। আদ্রা, রঘুনাথপুর সহ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে রথযাত্রা ঘিরে বাসিন্দারা উৎসবে মেতে ওঠেন।