হিমাংশু সিংহ: গত কয়েকটা নির্বাচনে যাঁরা পাশে ছিল, ঘুরিয়ে তাঁদেরই বিপন্ন করছে গেরুয়া শিবির। মতুয়া আর রাজবংশীদের বিশ্বাসের এই পরিণাম? সিবিআই -ইডি ব্যর্থ। দলবদলুরা আছেন শুধু ভাষণে আর টিভির পর্দায়। কিন্তু দিশাহারা হয়েও ক্রমাগত সেই একই কায়দায় বাংলা দখলের খেলাটা চলছে দিল্লি থেকে রিমোটে। এবার সোজা আঙুল ঈষৎ বেঁকিয়ে নির্বাচন কমিশনকে ঢাল করে। এসআইআর নামটা শুনলেই গ্রামে গঞ্জে আতঙ্কের ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে মানুষের শিরদাঁড়ায়। বাঁকা আঙুলে ঘি তুলতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই আরও বড় সর্বনাশ ডেকে আনছেন না তো বঙ্গের গেরুয়া নেতারা? শুরুটা হয়েছিল কয়েক মাস আগেই। যখন দেশের বিভিন্ন রাজ্যে চরম হেনস্তার মুখে পড়ে রক্তাক্ত হচ্ছিল বাঙালির স্বতন্ত্র সত্তা ও অস্মিতা। সৌজন্যে দেশের উত্তর ও পশ্চিম ভারতের ডাবল ইঞ্জিন সরকার। আর নভেম্বরের শুরুতে এই বাংলায় আর একবার আঘাত নামিয়ে এনে আহ্লাদিত বিজেপি। ভাবটা এমন, সংখ্যালঘুদের বাদ দিলেই ক্ষমতার মধুভাণ্ড তাঁদের দখলে!
বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন, যার কেতাবি নাম এসআইআর। সবাই জানে, রিভিশন বা সংশোধন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। মৃতদের নাম বাদ দেওয়ার কেউ বিরোধী নন। কোনও সুস্থ মানুষ এর বিরোধিতা করতে পারে না। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে, ভোটের ৬ মাস আগে কেন? তেইশ বছর আগের এসআইআরের ভিত্তিতে তৈরি তালিকা মেনে ভোট হয়েছিল দু’বছর পর ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে। তখন রাজ্যে মোট ভোটার ছিল ৪ কোটি ৫৮ লক্ষের মতো। এখন তা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ না হলেও কাছাকাছি। রাজ্যের প্রায় সাড়ে সাত কোটি ভোটারকে নির্বাচনের ঠিক আগে চরম উৎকণ্ঠায় ফেলার অবর্ণনীয় তামাশা কতটা সঙ্গত? জনগণনা করতেই যে সরকার বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয় তাদের এই অতি তৎপরতার কারণ কী? ফেব্রুয়ারিতে নতুন তালিকা প্রকাশ করেই এপ্রিলে ভোট, যেন ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে!
সংখ্যালঘু দেখলেই এরা রোহিঙ্গা বলে দেগে দেয়। সীমান্ত পেরিয়ে নতুন কেউ এলেই অমিত শাহের মুখে একটাই বচন, ঘুসপেটিওকো দূর ভাগাও। এটা ওদের পুরোনো অসুখ! ওই অসুখেই লক্ষ্মী আসে মেরুকরণের টোটকায়, তাই লাগলে পরে আর ছাড়ে না। অথচ এখন যে এসআইআর আক্রমণে নিরীহ মানুষ আতঙ্কে, ভয়ে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন জেলায় জেলায় তাঁরা কেউ রোহিঙ্গা নন, ‘ঘুসপেটিয়া’ কিংবা বেআইনি অনুপ্রবেশকারী বলতে যা বোঝায় তাও নন, কয়েক দশক টানা বাংলায় থাকা ষোলোআনা বাঙালি! ভোটও দিয়েছেন একাধিকবার। তাদের কারও বাস পানিহাটিতে, কারও ইলামবাজার, কেউ আবার বসিরহাটে। কেন শেষ বয়সে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে তাঁদের অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিক্ষেপ। মানুষের অধিকার নিয়ে এমন ভয়ংকর খেলা! অনুপ্রবেশকারী
চিহ্নিত করার আড়ালে কেন বাঙালিয়ানার উপর এমন অযাচিত আঘাত! বেআইনি অনুপ্রবেশ যদি হয়েও থাকে তাহলে তার দায় কার? স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, এত বিএসএফ ও এসএসবি মোতায়েন করে সীমান্ত পাহারা দেওয়ার দায়িত্বটা কার? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কি এর দায় অস্বীকার করতে পারেন? আবার আইনি পথে এসে ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও বেআইনিভাবে থেকে যাওয়া
রুখতে না পারা কাদের ব্যর্থতা, অপদার্থ গোয়েন্দা দপ্তর কি দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে? এর পরও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা কি
অন্যায়! নির্বাচন কমিশন কিংবা গেরুয়া নেতাদের কাছে এর কোনও ব্যাখ্যা আছে? রাস্তাঘাটে বাজারে দোকানে গত কয়েক দিন ঘুরে দেখেছি একমাত্র আলোচনার বিষয় এসআইআর। বেকার সমস্যা, নিত্যদিনের মূল্যবৃদ্ধি সব ভুলে মানুষের একটাই চিন্তা—ভোটার তালিকায় নিজের নাম ও ভোটাধিকার থাকবে কি না, না থাকলে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়াই কি দস্তুর! এনিয়ে যে মেরুদণ্ড দিয়ে উদ্বেগের স্রোত বইছে তার দায় কার? বঙ্গ বিজেপি না মহামান্য নির্বাচন কমিশনের?
রাজ্যের আড়ে-বহরে প্রত্যন্ত গ্রামে সবার সামনে ল্যাপটপ, কম্পিউটার খোলা থাকে না, অনেকেই সেই শিক্ষায় শিক্ষিতও নয়। তাহলে অনলাইনে তেইশ বছর আগের ভোটার তালিকার সন্ধান তাঁরা পাবেন কীভাবে? হার্ড কপির সঙ্গে ফারাকের অভিযোগের তদন্তই বা কে করবে? আজ যাঁরা কাটোয়ায় থাকেন আড়াই দশক আগে হয়তো তাঁরা নদীয়ায় বসবাস করতেন, আবার আজ যিনি বর্ধমানে তিনি হয়তো নবদ্বীপে বাবা-মায়ের সঙ্গে পৈতৃক বাড়িতে থাকতেন। সেই পুরোনো বুথ, পার্ট নম্বর মনে রেখে তালিকা ডাউনলোড করা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়? জনবিন্যাসের বদলও একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। হঠাৎ কারও মনে হল এই পরিস্থিতি একটি বিশেষ দলের ভোট পাটিগণিতের পক্ষে সহায়ক নয়, রাতারাতি সমীকরণ বদলের তৎপরতা। কিন্তু নুন আনতে পানতা ফুরোনো নিম্ন মধ্যবিত্ত গরিব মানুষের জীবনে এই নতুন কিসিমের হেনস্তা নামিয়ে আনার পিছনে মতলবটা কী? তার দায় কার? আরও রহস্য, কোটি কোটি টাকা খরচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়ে বানানো আধার কার্ডকে মানতে কমিশন প্রথম থেকেই নারাজ ছিল কেন? সচিত্র ভোটার কার্ডও যদি মান্য না হয় তাহলে ভোট দিল কারা, ভিনদেশের নাগরিকরা? সুপ্রিম কোর্টের ভর্ৎসনার পরও দেখছি আধারকে মেনে নিতে কমিশনের টালবাহানা অব্যাহত, এর কারণ অজানা। নোট বাতিলের পর ব্যাংকে লাইন দেখেছি, আধার কার্ড হাতে হরেক কিসিমের সরকারি সুবিধা নিতে আঁকাবাঁকা মানুষের স্রোত, তাও মোটেই অপরিচিত নয়। ওই কার্ডেই চোখের মণির নাচন, আঙুলের ছাপ সব রক্ষিত আছে, তাহলে তা পরিচয়পত্র হিসেবে স্বীকৃত হবে না কেন, মানুষের দৈনন্দিন ভাতকাপড়ের সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ কেন্দ্রের সরকার বাহাদুরের এ কোন তামাশা?
সবাই জানে এবং মানে এদেশে নেতাদের প্রতিশ্রুতি মানেই নতুন কোনও ‘জুমলা’। সে দিল্লির কৃত্রিম বৃষ্টিই হোক কিংবা সরকারি চাকরি, বাজারে দাম কমানোর কিস্সা থেকে সবার অ্যাকাউন্টে ২ কোটি টাকা! কৃষকের আয় দ্বিগুণ করার টোপ থেকে সরকারি পদে নিয়োগ বন্ধ রেখে গালভরা স্টার্টআপের স্বপ্ন ফেরি। চা ওয়ালার ব্যাটা থেকে ধনকুবের, কেউ কথা রাখে না। শুধু ভোট প্রচারে আসা হাওয়াই জাহাজের ধুলো গায়ে মেখে সাধারণ ভোটারের অন্ধকার ঘরে ফেরার কিস্সা! কিন্তু দলবদলু নেতার রোহিঙ্গা তাড়ানোর অঙ্গীকার যখন বদলে যায় মতুয়া, রাজবংশী সহ হিন্দু উদ্বাস্তুদের উপর হামলায় কিংবা ছিন্নমূল আদিবাসী পীড়নে, তখন বলতেই হয়, শুধু রোহিঙ্গারা নন, আক্রান্ত গোটা বাংলার মানুষই। বিশেষ করে গরিব মানুষ। কেন এই আক্রমণ? একুশে হয়নি, চব্বিশের লোকসভায় বাংলায় আসন কমে ১৮ থেকে ১২! ইশ্যু থাকলেও এবার দল গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে আরও শোচনীয় অবস্থায়। পুরোনোদের ডাকলে নতুনরা সেই সভায় ব্রাত্য, আর নতুনরা মানেই তৃণমূলের উপর থেকে নীচুতলা পর্যন্ত সব চেটেপুটে খেয়ে এখন অতীত মুছে সেজেগুজে স্নো পাউডার মেখে দিব্যি বিজেপিতে। দলবদলুদের কথা ছেড়েই দিলাম এই অদ্ভুত অবস্থার বদল একটা শমীক ভট্টাচার্য, সুনীল বনসল কিংবা অমিত মালব্যের পক্ষে অসম্ভব। মাঝে মধ্যে অমিত শাহ, মোদিজির গর্জন শোনা যায় বটে, তবে তা থেকে কেউ বর্ষণ আশা করে না। মানুষ জানে, ভাষণ শেষে বিমান বাংলার সীমা ছাড়ালেই বঙ্গ দলে এক অদ্ভুত শূন্যতা। সেখানে কেউ কাউকে মানে না। উপরতলায় মুখ দেখাদেখিও বন্ধ। আর যাই হোক, এই দলকে কি রাজ্যের ভার সঁপে দেওয়া খুব সঙ্গত কাজ হবে?
দিল্লির নেতৃত্বও এই সারসত্যটা বিলক্ষণ জানে। সেই কারণেই এলোমেলো হাওয়া বইলেও এই
বাংলায় শিকড়হীন, সংগঠনহীন এই জাতীয় অথচ নাবালক দলটি কিছুতেই ভোটে সুবিধা করতে না পেরে অস্ত্র হাতড়ে ফেরে। একুশের পর চব্বিশের লোকসভা ভোটেও দল ভাঙো কর্মসূচি ফ্লপ! বাছাই করা নেতাদের ইডি-সিবিআই দিয়ে নাকানি চোবানি খাইয়ে মনোবল ভাঙার রাজসূয় যজ্ঞ ব্যর্থ। টাকা আটকে দিয়ে রাজ্যটাকে পঙ্গু করে দেওয়ার মতলবও মুখ থুবড়ে পড়ায় কেন্দ্রের শাসক এবং তার নাদান বঙ্গ শাখা যারপরনাই শঙ্কিত। কারণ, তাঁরা মানুন আর নাই মানুন পাঁচ বছর আগের চেয়ে দলের সামনে ইশ্যু বাড়লেও তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো সাংগঠনিক পরিস্থিতি নেই।
রোহিঙ্গাদের বাদ দিয়ে রাজ্যের ক’টা বিধানসভায় বিজেপি জিততে পারবে তা ভগবানেরও অজানা। তবে এরাজ্যে সংখ্যালঘু ভোট অন্তত ৮০টি আসনে শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, নির্ণায়ক। আর মতুয়া ভোট? অন্তত ৩০টি আসনে জয়পরাজয়ের ভাগ্য নির্ধারণ করে। রাজবংশী ভোট প্রভাব ফেলে আরও ২০টি আসনে। এসআইআর শুধু সংখ্যালঘুই নয়, মতুয়া ও রাজবংশীদের উপর নির্মম আঘাত। সব হিসেব ধরলে এবার বিজেপি প্রায় ১৪০টি আসন বাদ দিয়ে নির্বাচনী ময়দানে নামছে। মতুয়ারা গতবার বিপর্যয়ের মধ্যেও পাশে দাঁড়িয়েছিল। রাজবংশীরাও তাই। আলিপুরদুয়ার ও ডুয়ার্সের চা বাগানে পরিস্থিতির বদল হয়েছে। নির্বাচনের আগে কেউ এতবড় হারাকিরি করে। কে না জানে, এই বাংলায় হিন্দু ভোটের একটা বড় অংশ বাংলাদেশ থেকে নানা উৎপীড়নের শিকার হয়ে আসা উদ্বাস্তু। এরা প্রতিটি জেলা, শহর, প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে। রোহিঙ্গাদের তাড়াতে গিয়ে হিন্দু উদ্বাস্তুদের স্বার্থ বিপন্ন করলে বিজেপির বাংলা দখলের খোয়াব অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে। একটা আদ্যন্ত বহিরাগত দল এই বঙ্গের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির উপর ছড়ি ঘোরাতে চাইলে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি এবার তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পিছপা হবে না। ব্যর্থ হবে আটশো টাকায় নাগরিকত্ব বিক্রির চক্রান্তও।