বিশ্বজিত্ মাইতি, বরানগর: ‘বাংলা মার, প্রচুর লাগবে’। পাশে ছোটো করে লেখা সন্তান’। এমন ব্যানার ও হোর্ডিংয়ে ঢাকা দমদম রোড। চলতি বছরে শুরু হওয়া দমদম রোডের উপর প্রথম দুর্গাপুজোর থিমকে ঘিরে আলোড়ন ছড়িয়ে পড়েছে শহরবাসীর মধ্যে। ভিন রাজ্যে বাঙালিদের উপর অত্যাচার ও বাংলা ভাষার উপর আক্রমণের থিমের পাশাপাশি ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’, ‘তোমাদের চৈতন্য হোক’, অন্তরালের মতো নানান থিমে সাজছে মণ্ডপ। মায়ের রূপেও বৈচিত্র্যের ছোঁয়া। কোথাও মায়ের কোলে দেখা যাবে জগন্নাথ ও বলরামকে, কোথাও মায়ের আঁচল ধরে রক্ষার আকুতি করবে কার্তিক, সরস্বতী, গণেশ ও লক্ষ্মী।
দমদম রোডে এবার প্রথম দুর্গাপুজো করেছে জপুর জয়শ্রী। তাঁদের থিম ‘‘বাংলা মায়ের ‘সন্তান’ প্রচুর লাগবে’’। মণ্ডপে ঢোকার মুখে বড়ো জেলখানা। সেখানে আটকে রয়েছেন নির্মাণ শ্রমিকরা। চোখে মুখে হাহাকার। পাশেই নির্মীয়মাণ দেওয়াল। পড়ে রয়েছে কোদাল, বেলচাসহ ঘর তৈরির নানান সামগ্রী। মণ্ডপের ভিতরে থাকা সেলেও আটকে রয়েছেন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। খাঁচায় বন্দি ‘অক্ষরবৃক্ষ’। মানুষের অবয়ব খাঁচার মধ্যে। তার হাত থেকে গাছের ডালপালার মতো বেরিয়ে থাকা শাখা-প্রশাখায় ঝুলছে বাংলা অক্ষর। তারকাঁটার বেড়ার ওপারে হাহাকার করছে শয়ে শয়ে মানুষ। তাঁরা পুশব্যাকের শিকার। উল্টো দিকে খাঁচাবন্দি পুতুল। ছোট্ট শৈশবের ভয়াবহ পরিণতি। মণ্ডপে মা রয়েছেন বরাভয়দাত্রী রূপে। মায়ের দুই দিকের আঁচল ধরে ভয়ার্ত চোখে বসে আছে চার সন্তান। মায়ের চারপাশে পোস্টবক্সের সারি। তাতে ভিন রাজ্যে গিয়ে হেনস্তার শিকার বাঙালিদের নাম ও ঠিকানা লেখা। সিলিংয়ে উড়ছে হাজারো প্রজাপতি। তাদের ডানায় ঝুলছে বাংলা অক্ষর। থিম ভাবনায় রয়েছেন শিল্পী টিঙ্কু ঘোষ। রূপায়ণের দায়িত্বে রয়েছেন শিল্পী দেবতোষ কর। পুজোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক সঞ্জয় দাস বলেন, বাঙালিকে জেলে ভরে বাংলা ভাষার মাধুর্য ও বিশ্বজনীন আবেদনকে রোখা যাবে না। বাঙালি ও বাংলা ভাষার উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে স্বয়ং জগজ্জননী বরাভয়দাত্রীরূপে আর্বিভূত হবেন।
দক্ষিণ বেদিয়াপাড়া দুর্গোৎসব কমিটির পুজো এবার ৩৬ বছরে পা দিয়েছে। তাদের থিম মরুতীর্থ হিংলাজ। পাকিস্তানের বালুচিস্তানে অবস্থিত এই সতীপীঠকে অবিকল ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মণ্ডপে। বিশাল পাহাড় ও গুহার অভ্যন্তরে ঢুকে দেখতে হবে জগজ্জননীকে। পাহাড়ের কোলে রয়েছে বিশালাকার দুই কামান। এখানে মা আসছেন পাহাড়ি দেবীর রূপে। পুজো কমিটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক মৃন্ময় দাস বলেন, হিংলাজে সতী মায়েরর মস্তক পতিত হয়েছিল। ওই পুণ্য মন্দির পাকিস্তানে হওয়ায় সবাই যাওয়ার সুযোগ পায়না। সেই মরুতীর্থ হিংলাজ এবার এখানেই দেখা যাবে।
দমদম এয়ারপোর্ট ২ নম্বর গেট লাগোয়া এলাকায় নবপল্লি স্পোর্টিং ক্লাবের পুজো এবার ৩২ বছরে পা দিয়েছে। তাদের থিম ‘তোমাদের চৈতন্য হোক’। অভিনব থিম ভাবনায় ফুটে উঠেছে সাধারণ বঙ্গসন্তান থেকে চৈতন্য মহাপ্রভু হয়ে ওঠার যাত্রাপথ। বাংলা ও ওড়িশার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। মণ্ডপ সেজেছে পিংলার পট, ওড়িশার রঘুরাজপুরের শিল্পকর্মে। এখানে মা আসছেন গোষ্ঠমাতা রূপে। মায়ের কোলে থাকবে জগন্নাথ ও বলরাম। পুজো কমিটির সম্পাদক জনি দাস বলেন, রথযাত্রার সময় জগন্নাথদেবের সাজ যারা তৈরি করেন তাঁরাই মায়ের সাজ তৈরি করেছেন। জগন্নাথদেবের মন্দিরের সেবাইতরা এসে মাকে সেই সাজ পরিয়েছেন। আমাদের থিম ও মায়ের রূপ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করবে।
নাগেরবাজার সাতগাছি এলাকার লাহা কলোনি বিবেক সংঘ সর্বজনীন দুর্গোৎসব এবার ৭৫ বছরে পা দিয়েছে। তাদের থিম অন্তরালে। অক্ষয় বটের মতো পরিবারের ছাতা হয়ে থাকা বাবাকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মা আসছেন আটপৌরে বাঙালি বধূর রূপে। পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ সায়ন সাহা বলেন, প্রতিটি সংসারে অন্তরালে থেকে যায় বাবাদের লড়াই। সেই লড়াইকে শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানাতে আমাদের এই থিম ভাবনা। সেজে উঠেছে জপুর জয়শ্রীর মণ্ডপ।-নিজস্ব চিত্র