হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী,
হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী,
নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব...’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বুদ্ধজন্মোৎসব’ কবিতায় যদিও একথা লিখেছিলেন। তবুও পৃথিবী কিন্তু বারেবারেই হিংসায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছে! যার ফলে মানুষকে সম্মুখীন হতে হয়েছে যুদ্ধের! তা সে পুরাণের ত্রেতা যুগের রাম-রাবণের যুদ্ধ কিংবা দ্বাপর যুগের কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ হোক অথবা ইতিহাসের পাতায় স্থান পাওয়া দুই বিশ্বযুদ্ধ! যুদ্ধ মানেই মৃত্যু আর ক্ষয়ক্ষতি। তাই শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বলেন— যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই।
কিন্তু হঠাৎ যদি সুযোগ পেয়ে যাও কোনও যুদ্ধবিমানে চড়ার? না, না, কল্পনা করতে হবে না! কারণ, ইচ্ছে করলেই এমন সুযোগ তোমরা পেতেই পার। তাও মাত্র তিরিশ টাকার বিনিময়ে! সোমবার বাদে সপ্তাহের যে কোনও দিন সকাল এগারোটা থেকে রাত আটটার মধ্যে চলে এসো কলকাতার নিউটাউনের এয়ারক্রাফ্ট মিউজিয়ামে। হয়ে যাবে স্বপ্নপূরণ! ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের আইডি কার্ড দেখালে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রবেশ করতে পারবে এই মিউজিয়ামটিতে।
এটি ভারতবর্ষের দ্বিতীয় নাভাল এয়ারক্রাফ্ট মিউজিয়াম। প্রথমটি তৈরি হয় অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে। আর দ্বিতীয়টি কলকাতায়। ২০২২ সালের ৯ জুন উদ্বোধন হয়েছিল এই মিউজিয়াম। কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (কেএমডিএ) এটি তৈরি করে। ২.২ একর জমির ওপর অবস্থিত এই মিউজিয়ামটি তৈরি হতে প্রায় এগারো কোটি টাকা লেগেছিল।
গেট দিয়ে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়বে সুন্দর কেয়ারি করা গাছের সারি আর বসার বেঞ্চ। মাঝখানে সাড়ে তিন কিলোমিটার রানওয়ের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে ভারী একটি যুদ্ধবিমান। যার নাম টুপোলেভ টু ১৪২ আইএন ৩১৭। যেটি তৈরি হয়েছিল রাশিয়ায়। ১৯৮৮ থেকে ২০১৭ সাল পযর্ন্ত টানা ঊনত্রিশ বছর ধরে নৌবাহিনীর হয়ে এটি কাজ করেছে। লম্বায় ১৭৪ ফুট আর চওড়ায় ১৬৪ ফুট। দুই পাশে রয়েছে মোট আটটা প্রপেলার ইঞ্জিন। আটশো কিলোমিটার বেগে একটানা সতেরো ঘণ্টা ধরে ওড়ার ক্ষমতা রাখত এই বিমানটি। মিউজিয়াম তৈরির সময় এখানে আনার জন্য বিমানটিকে খুলে, ষোলোটি ট্রাকে বোঝাই করে নিয়ে আসা হয়। আবার খোলা পার্টগুলো জুড়ে দেওয়া হয়। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সময় প্রত্যেক মিনিটে এটি ১ হাজার ২০০টি বুলেট ছুঁড়তে পারত! বিমানে ওঠার সময় পেটের কাছের দরজা খুলে যেত। আর একটি বিশেষ ধরনের মইয়ের সাহায্যে মোট দশজন ক্রু মেম্বারদের মধ্যে ন’জন উঠে যেত বিমানে। দশমজন উঠত বিমানটির পেছনের দিক দিয়ে। দশমজনের কাছে থাকত বন্দুক। পেছন থেকে শত্রু আক্রমণ করলে যাতে প্রথমে গুলি ছুঁড়ে সামাল দিতে পারে। এই বিমানটিতে জ্বালানি ধরে মোট সাতাশি টন! তবুও যদি আরও জ্বালানির প্রয়োজন হয়, তখন অন্য বিমান থেকে যাতে উড়ন্ত অবস্থাতেই তেল সংগ্রহ করে নিতে পারে সেই ব্যবস্থাও করা আছে এই বিমানে। দেখতে পাবে বিমানের মুখের কাছে একটা লম্বা পাইপ, যার মাধ্যমে তেল টানা যেত। আছে দশটা তেলের ট্যাঙ্ক, যার মধ্যে দুটো ডানায় চারটে-চারটে মোট আটটা ট্যাঙ্ক এবং মাঝে দুটো। তবে, বিমানটিকে মিউজিয়ামে রূপান্তরিত করার সময় এর কিছু কিছু অংশ কেটে নতুন করে তৈরি করে নেওয়া হয়েছে। বিমানের গা কেটে বানানো হয়েছে লোহার বিশাল সিঁড়ি, যা দিয়ে সোজা বিমানটিতে প্রবেশ করতে পারবে।
ভেতরে পাবে নৌসেনার কর্মীদের, যাঁরা সহজ করে বুঝিয়ে দেবেন বিমানটির ভেতরের প্রযুক্তি। ভেতরটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। সমস্ত যন্ত্রপাতি কিন্তু আসল, কোনও রেপ্লিকা নেই। প্রত্যেকটি সেলের নাম টিসি। বম্ব রাখা থাকত বারোটা ও মিসাইল থাকত তিনটি। মিসাইল ক্যারিয়ার স্পর্শ করলে শরীর শিহরিত হয়ে উঠতে বাধ্য!
বিমানটির কাজ ছিল জলের তলায় শত্রু পক্ষের লুকনো সাবমেরিন খুঁজে বের করা এবং বোমাবর্ষণ করে সেগুলো ধ্বংস করা। এই কাজটির জন্য আছে ‘সোনোবয়’ নামক বিশেষ যন্ত্র। এছাড়াও রয়েছে রেডিও নেভিগেশন এইড, ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার বা ব্ল্যাকবক্স— যা দিয়ে এয়ারক্রাফ্ট অ্যাক্সিডেন্টের কারণ তদন্ত করা যায়। এগারো কিলোমিটার ওপরে উঠলেই অক্সিজেনের দরকার পড়ত, তাই রয়েছে অক্সিজেন সিলিন্ডার। আবার কখনও যদি উড়তে উড়তে বিমানের ভেতরে আগুন ধরে যেত, তখন তা নেভানোর জন্য মজুত করা থাকত কার্বন-ডাই-অক্সাইড সিলিন্ডার।
ভেতরে ককপিটের সিটে বসানো আছে পাইলট, কো-পাইলট, ফ্লাইট নেভিগেটার, ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার প্রমুখ ন’জন ক্রু মেম্বারদের ম্যানিকুইন। দেখতে পাবে তাদের ব্যবহারের জন্য রাখা আলাদা আলাদা কমোড। আছে কফি মেশিন আর হাল্কা খাবার বানানোর জন্য হিটার। এছাড়াও মেঝেতে আছে একটা কাঠের এসক্যালেটার। বিপদ উপস্থিত হলে, সবাই লাইফ-জ্যাকেট পরে এই এসক্যালেটরের ওপর পরপর লাইন দিয়ে বসে পড়তেন। এসক্যালেটার ঘুরতে শুরু করত আর খুলে যেত মেঝের একটা খোপ। তার ভেতর দিয়ে একে একে সবাই ঝুপঝুপ করে নীচে সমুদ্রের মধ্যে লাফ দিতেন!
টুপোলেভ টু ১৪২ থেকে নেমে এসেই দেখতে পাবে একটা ছোট্ট বিমান দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গেলেই অবশ্য বুঝতে পারবে যে সেটা আসলে একটা বাচ্চাদের খেলার স্লিপ! বিমানের আদলে তৈরি। ঠিক যেমনভাবে ওই টুপোলেভ টু ১৪২ যুদ্ধ বিমানের পেটের কাছের ফোঁকর দিয়ে ভেতরে ওঠার ব্যবস্থা ছিল ঠিক তেমন এই খেলনা প্লেনের পেটের কাছে লাগানো মই বেয়ে উঠতে হবে এই স্লিপে! তারপর হামাগুড়ি দিয়ে অন্যদিকে গিয়ে স্লিপ খেয়ে নীচে নেমে আসতে পারবে! মই ছাড়াও স্লিপে চড়ার জন্য আছে রক-ক্লাইম্বার ও নেট-ক্লাইম্বার! এগুলো দিয়েও উঠতে পারবে এই স্লিপ বিমানে! নীচে আছে একটা ছোট চিলড্রেন্স পার্ক। এখানে আছে সামরিক ট্রেনিংয়ের সময় যেমন ব্যালান্সের এক্সারসাইজ থাকে তারই কিছু রেপ্লিকা। যেমন বাঁকানো সিমেন্টের রেলিং দিয়ে হাঁটা, মাটিতে গাঁথা সিমেন্টের বড় বড় পেরেকের ওপর দিয়ে টপকে যাওয়া, রঙিন টায়ারের দেওয়াল বেয়ে ওঠা-নামা, নেট লাগানো পোস্ট বেয়ে ওঠা-নামা ইত্যাদি। তোমাদের মধ্যে যাদের ইচ্ছে বড় হয়ে নৌবাহিনীতে যোগ দেওয়া, তারা এখানে এসে খুবই উৎসাহিত হবে! এছাড়া আছে প্লেনের মতো দেখতে ঢেঁকিও! খুব ছোট বাচ্চাদের চড়ার জন্য আছে ছোট্ট ছোট্ট সিমেন্টের প্লেন আর সিমেন্টের ট্যাঙ্কার! সেখানে বসে ফোটোও তোলা যাবে! ভেতরে আছে টয়লেট ও জলের ব্যবস্থা। তবে কোনও কাফেটারিয়া নেই। বিমানটির নীচে রয়েছে কয়েকটি ডিসপ্লে বোর্ড। তাতে লেখা আছে এই যুদ্ধ বিমানের ইতিহাস।
সন্ধে নামলেই জ্বলে ওঠে আলো। সেও এক মনোরম দৃশ্য! মনে হবে এক্ষুনি হয়তো আকাশে উড়ে যাবে কোনও যুদ্ধক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে এই টুপোলেভ টু১৪২!
হাতের নাগালের মধ্যেই যখন রয়েছে এমন স্বপ্ন-উড়ান, তখন আর দেরি না করে শীতের দুপুরে চলে যাওয়া যায় নিউটাউনের এই এয়ারক্রাফ্ট মিউজিয়ামে!
ছবি: অতূণ বন্দ্যোপাধ্যায়