নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: সোমবার ভোররাতের বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই আনন্দপুর লাগোয়া নরেন্দ্রপুর থানার নাজিরাবাদের জোড়া গোডাউন। গোডাউন দুটির মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত মোমো প্রস্তুতকারক কোম্পানি এবং অপরটি একটি ডেকরেটার্স সংস্থার। ভয়াবহ এই আগুনে সোমবার পর্যন্ত অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দুই গোডাউনের ২১ জন কর্মী এখনও নিখোঁজ। নিখোঁজদের সিংহভাগই পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ময়না, পাঁশকুড়া ও তমলুক এলাকার বাসিন্দা। ধ্বংসস্থল থেকে বেশ কয়েকজনের দেহাংশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাঁরা কারা, জানতে ডিএনএ পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিধ্বংসী আগুনের খবর শুনে সোমবার সকালেই ছুটে আসেন কর্মীদের আত্মীয় পরিজনরা। প্রিয়জনের ছবি হাতে ছলছল চোখে অপেক্ষা করেন তাঁরা। আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে সেটা নেভাতে হিমশিম খেতে হয় দমকল কর্মীদের। ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পরও বেশ কিছু জায়গায় মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ধিকিধিকি আগুন জ্বলতে দেখা গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে এদিন বিকেলে সেখানে যান রাজ্যের পুর-নগরোন্নয়নমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী দুর্ঘটনায় মৃতদের পরিবার পিছু ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে ঘোষণা করেন। তবে ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়ার পরই তা মিলবে বলে তিনি জানান। দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু এদিন সকালে সেখানে গিয়ে কিছুটা বিক্ষোভের মুখে পড়েন। ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন ময়নার বিধায়ক অশোক দিন্দাও।
চলতি বিয়ের মরশুমে ওই ডেকরেটার্সের গোডাউনে ব্যস্ততা ছিল তুঙ্গে। রাতে সেখানে ছিলেন অনেক কর্মী। চলছিল রান্নাবান্না। অভিযোগ, তার থেকেই দুর্ঘটনাবশত আগুন লেগে যায়। বিয়েবাড়ির সাজসজ্জায় ব্যবহৃত কার্পেট, কাপড়, কাঠ, প্লাস্টিকের সরঞ্জাম, শুকনো ফুল দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। ডেকরেটার্স সংস্থার পাশেই মোমো প্রস্তুতকারী সংস্থার গোডাউন। সেখানেও ছড়িয়ে যায় আগুন। সূত্রের খবর, সেখানে তিনজন কর্মী ছিলেন। গোডাউনের মূল গেট ছিল বন্ধ। আর পিছনের দিকে যে পথ দিয়ে বের হওয়া যেত, আগুনের তাপে ছাউনি ভেঙে তা অবরুদ্ধ হয়ে যায়। আটকে যান ওই কর্মীরা। ডেকরেটার্সের গোডাউনে সেসময় ছিলেন ২৫ জনের বেশি কর্মী। তাঁদের মধ্যে ভাগ্যবান কয়েকজন কোনওক্রমে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলেও, সিংহভাগই আটকে পড়েন। নিখোঁজ কর্মীদের পরিবারের লোকজন এদিন বিকেলে নরেন্দ্রপুর থানায় বিক্ষোভ দেখান।
মঙ্গলবার সকালে নাজিরাবাদের দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেল, পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া জোড়া গোডাউনের কঙ্কাল। ইতিউতি ছড়ানো হাড়গোড়, পোড়া গন্ধ আর ধ্বংসস্তূপ। কয়েকটি পকেটে তখনও ধোঁয়া বের হচ্ছিল। অ্যাসবেস্টসের ছাউনি ভেঙে পড়েছে। তাপে বেঁকে গিয়েছে লোহার কাঠামো। অকুস্থলের পিছনে কংক্রিটের আরও একটি গোডাউনের সব সামগ্রী পুড়ে ছাই। ধ্বংসস্তূপ ঘেঁটে হতভাগ্যদের দেহাংশ খোঁজার কাজ করছেন পুলিশ ও দমকল কর্মীরা। হাড়গোড় মিললে, তা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে। এদিন ঘটনাস্থলে আসে ফরেনসিক দলও। নমুনা সংগ্রহ করেন তাঁরা। রাতে নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশ ডেকরেটার্স সংস্থার মালিক গঙ্গাধর দাসকে এলাচি থেকে গ্রেপ্তার করেছে। ২০০৬ সালে তৈরি নাজিরাবাদের এই গোডাউন দুটির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভিতরে অগ্নিনির্বাপক কোনও ব্যবস্থা ছিল না। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দমকল ও নরেন্দ্রপুর থানার তরফে দুটি অভিযোগ দায়ের হয়েছে।