সংবাদদাতা, রঘুনাথপুর: আশ্বিনের শেষ, কার্তিকের শুরু। ভোরের দিকে হালকা কুয়াশা আর হিমেল হাওয়াই জানান দিচ্ছে শীত আসছে। আর শীতের আগমন বার্তা পেতেই পুরুলিয়ার রঘুনাথপুর মহকুমাজুড়ে শিউলিদের দেখা মিলছে। তাঁরা হাতে দা, কোমরে দড়ি আর কাঁধে মাটির (অনেকে প্লাস্টিকের) কলসি নিয়ে খেজুর গাছে গাছে ঘুরছেন। শুরু হয়েছে খেজুর রস সংগ্রহ ও খেজুর গুড় তৈরির প্রস্তুতি। প্রতি বছরের মতো এবারও রঘুনাথপুর, নিতুড়িয়া, সাঁতুড়ি, কাশীপুর, পাড়া ব্লকের বিভিন্ন গ্রামে এই চিত্র দেখা যাচ্ছে। নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, ঝাড়গ্রাম প্রভৃতি জেলা থেকে শিউলিরা এসেছেন। স্থানীয় শিউলি পরিবারগুলির এখন দম ফেলার সময় নেই।
তাঁরা জানিয়েছেন, এখন গাছ ‘চাঁছা’ ও ‘মুখ কাটা’র কাজ চলছে। খেজুর গাছের মাথার অংশ পরিষ্কার করে বিশেষ কায়দায় কেটে সেখানে নল বসানো হচ্ছে। তার নীচে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে মাটি বা প্লাস্টিকের হাঁড়ি। সারারাত ধরে সেই হাঁড়িতে ফোঁটা ফোঁটা রস জমে। ভোর হওয়ার আগেই সেই রস নামিয়ে আনা হয়। সেই রস জ্বাল দিয়েই তৈরি হয় সুস্বাদু নলেন গুড়, পাটালি। যার প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এবং ভালো বাজারদরও রয়েছে।
নদীয়া থেকে রঘুনাথপুরে আসা শিউলিদের মধ্যে গুরুপদ মাঝি বলেন, দুর্গাপুজো শেষ হলেই আমাদের কাজ শুরু হয়। এবার শীত একটু তাড়াতাড়ি পড়ছে। তাই প্রস্তুতিও তাড়াতাড়ি নিচ্ছি। একটা গাছ থেকে দিনে ২ থেকে ৩ লিটার রস পাওয়া যায়। সেই রস জ্বাল দিলে প্রায় ৩০০-৪০০ গ্রাম গুড় হয়। পুরুলিয়ার খেজুর গুড়ের চাহিদা শুধু জেলায় নয়, বাইরেও প্রচুর। খাঁটি খেজুর গুড়ের জন্য শীতকালে রঘুনাথপুর বাজারে ভিড় লেগে থাকে। ক্রেতারা আগে থেকেই শিউলিদের কাছে বায়না করে রাখেন। পর্যটকরাও গুড় নিতে আসেন।
তবে শিউলিদের আক্ষেপও আছে। অভিযোগ, খেজুর গাছের সংখ্যা দিন দিন কমছে। অনেকেই ইটভাটায় খেজুর গাছ বিক্রি করে দিচ্ছেন। সরকারি সহায়তা পেলে এই ঐতিহ্যবাহী পেশা আরও ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।
দুর্গাপুর থেকে পুজোর মরশুমে বড়ন্তি ঘুরতে আসা পর্যটকদের মধ্যে রেনুকা সেনাপতি, বৃষ্টি দাস বলেন, পুরুলিয়া শীতে ঘুরতে আসি। প্রতি বছর গুড় নিয়ে যাই। এখানে সহজে, কম দামে, খাঁটি গুড় পাওয়া যায়।
আর কয়েকদিনের মধ্যেই রঘুনাথপুরের হাটে বাজারে নতুন খেজুর গুড়ের গন্ধে ম ম করবে। শীতের সকালে গরম রুটির সঙ্গে নলেন গুড়ের স্বাদ নিতে অপেক্ষায় আপামর বাঙালি।



