নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বৃষ্টির দাপট কমতেই চেনা ছন্দে ফিরে এল কুমোরটুলি। বুধবার সকাল থেকেই ব্যস্ততা মৃৎশিল্পীদের ঘরে। একের পর এক পুজো কমিটির লোকজন আসছেন প্রতিমা নিতে। কুলিদের কাঁধে চেপে ঘর থেকে বেরিয়ে উমা চলেছেন বাইরে অপেক্ষারত ম্যাটাডর, লরির দিকে। তার মধ্যেই বাজছে ঢাক, ঢোল।
এদিন বৃষ্টির দেখা না মেলায় খুশি পুজোর উদ্যোক্তারা। তাঁদের অনেকে মঙ্গলবার রাতেই চলে এসেছেন কুমোরটুলিতে প্রতিমা নিতে। এদিন বেলা যত গড়িয়েছে, কুমোরটুলিতে ভিড় ততই বেড়েছে। রবীন্দ্র সরণি, কুমোরটুলি স্ট্রিট, বনমালী সরকার স্ট্রিটে বিভিন্ন শিল্পীর ঘর থেকে মা দুর্গাকে মণ্ডপে নিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় চোখে পড়েছে। কুলিরা কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছেন মাকে। তবে উদ্যোক্তারা সজাগ, পাছে বের করতে গিয়ে প্রতিমার এক ইঞ্চিও ক্ষতি না হয়। চটে না যায় প্রতিমার রং।
সর্বজনীন পুজো কমিটিগুলির পাশাপাশি বিভিন্ন বাড়ির পুজোর একচালার সাবেকি প্রতিমাও গিয়েছে কুমোরটুলি থেকে। পরিবারের যে সদস্যরা এসেছিলেন প্রতিমা নিতে, তাঁদের অনেককেই দেখা গেল, ম্যাটাডর বা লরিতে প্রতিমা তোলার আগে কুমোরটুলির ঢাকেশ্বরী মায়ের মন্দিরে গিয়ে পুজো দিতে। পুজোর সেই ফুল মা দুর্গার পায়ে ঠেকানোর পর গাড়িতে তোলা হয় মাকে।
মঙ্গলবার দিনভর বৃষ্টির জেরে সমস্যায় পড়েছিলেন মৃৎশিল্পীরা। প্লাস্টিক, ত্রিপল দিয়ে ঘিরেই চলেছে প্রতিমা তৈরির কাজ। তার মধ্যেই বৃষ্টিতে কোনও কোনও প্রতিমার রং একটু-আধটু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বুধবার ফের তাতে রংয়ের প্রলেপ দিয়ে সামাল দিতে হয়েছে শিল্পীদের। কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী সংগঠনের কর্তা বাবু পাল বলেন, বৃষ্টির কথা মাথায় রেখেই অনেকেই তড়িঘড়ি মণ্ডপে প্রতিমা নিয়ে যাচ্ছেন। এতে আমরা খানিকটা স্বস্তি বোধ করছি। কারণ বৃষ্টিতে যদি প্রতিমা নষ্ট হয়ে গেলে আমাদের পক্ষে ডেলিভারি দেওয়া মুশকিল হয়ে যাবে। উপরন্তু খরচও বাড়বে। মঙ্গলবার মাঝরাত থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত শতাধিক দুর্গা প্রতিমা এখান থেকে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলিতে নিয়ে গেছেন উদ্যোক্তারা। এদিন রাতের দিকে আরও প্রতিমা পাড়ি দেবে মণঁডপের দিকে।
এদিন শিল্পী রাজা পালের ঘরে গিয়ে দেখা গেল, কয়েকটি প্রতিমায় চলছে শেষ তুলির টান। কোথাও চলছে জরির কাজ, কোথাও শোলার কাজ। শিল্পী রতন পাল ব্যস্ত একচালার প্রতিমার তৈরির কাজে। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, এখন আমাদের নাওয়া-খাওয়ার সময় নেই। দিন-রাত এক করে কাজ করছি। পুজোর উদ্যোক্তাদের হাতে প্রতিমা তুলে দিতে পারলেই আমরা নিশ্চিন্ত। শিল্পী মায়া পালের ঘরেও চলছে মায়ের সাজসজ্জার কাজ। শিল্পী বরুণ পাল, সমর পাল, সুজয় পালদের ঘরে গিয়ে দেখা যায়, সেই একই ছবি।
এদিন বিভিন্ন মানুষকে দেখা গেল কুমোরটুলি থেকে কুলোর উপর শোলা দিয়ে কারুকাজ করা মায়ের মুখ কিনতে। তবে আলোকচিত্রীদের ভিড় ছিল অন্যান্য দিনের মতোই। এই ভিড়ের মধ্যে অনেককেই ছবি তুলেছেন মণ্ডপমুখী মা দুর্গার। জল থই থই কলকাতার দুর্ভোগের দৃশ্য এদিন উধাও। উৎসবমুখী মহানগর যেন ফের স্বমহিমায় জেগে উঠেছে।