


অর্পণ সেনগুপ্ত, কলকাতা: জলবায়ু পরিবর্তনের কত রকম বিপদ যে পৃথিবীর জন্য লুকিয়ে রয়েছে, তার অন্যতম উদাহরণ প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা। তাতে দেখা যাচ্ছে, সুন্দরবনের লবণাক্ত খাঁড়ি থেকে শুরু করে ক্যালিফোর্নিয়া, হাওয়াই, ফুকেত, মালয়েশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার সুদৃশ্য সমুদ্র সৈকত—কোনওটিই প্রবল বিষাক্ত সামুদ্রিক সাপের বিপন্মুক্ত নয়। এছাড়া, ভারতের বিভিন্ন সৈকত শহর তো রয়েছেই। গবেষণা বলছে, বিশ্ব উষ্ণায়ণে সমুদ্রের জল যতই উত্তপ্ত হচ্ছে, তত নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে সরে উত্তরমুখী হচ্ছে সাপের দল। এর ফলেই প্রায়ই ভারতের বিভিন্ন সৈকতে দেখা মিলছে এগুলির।
এমনিতে সামুদ্রিক সাপের সার্বিক পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয়। ৭০ ধরনের সাপের হদিশ এখনও পাওয়া যায়। তার মধ্যে ৯ শতাংশই বিপন্ন, ৬ শতাংশের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। সেটা অন্য বিপদ। তিন দশক আগে এগুলির হদিশ মিলত কোরাল, তিমোর, আরাফুরা সাগর, মাদাগাস্কারের পশ্চিম উপকূল, পাপুয়া নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপিনস, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার উপকূলে। এরা মূলত প্রবাল প্রাচীরে বসবাসকারী মাছ, মুরে ইল ইত্যাদি খেয়ে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যও রক্ষা করে। তবে, সম্প্রতি এগুলি সরে আসছে বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরের উত্তরভাগ, থাইল্যান্ডের বিভিন্ন উপকূলের দিকে। অর্থাৎ, নিরক্ষীয় অঞ্চল ছেড়ে কর্কটক্রান্তীয় এলাকার দিকে বাড়ছে এদের উপস্থিতি।
প্রেসিডেন্সির অধ্যাপক সুমিত মণ্ডল এবং লাইফ সায়েন্স বিভাগের মেরিন ইকোলজির দুই গবেষক দেবস্মিতা শিকদার এবং আহমেদ সাবির একটি গ্লোবাল মডেল তৈরি করেছেন। তা প্রকাশিত হয়েছে এলসিভিয়ারের মেরিন এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ পত্রিকায়। সুমিতবাবু বলেন, ‘আমি নিজেই দু’বার সুন্দরবনে জেলেদের জালে সামুদ্রিক সাপ উঠতে দেখেছি।’ বহু গবেষণাপত্রেই বঙ্গোপসাগরে বিভিন্ন প্রজাতির সাপের সন্ধান মেলার বিষয়টি ইতিমধ্যে প্রকাশিত। তাই বিপদ যে খুব দূরে নয়, সে ব্যাপারে সর্তক করছেন গবেষকরা।
এই সাপেরা ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রির মধ্যে সমুদ্রের জলের তাপমাত্রায় অভ্যস্ত। তবে, নিরক্ষীয় অঞ্চলে সেই তাপমাত্রা বাড়ছে। ভারতীয় উপকূলের ৩০-৩২ ডিগ্রির গড় তাপমাত্রা তাদের উত্তরে টেনে আনছে। গবেষকদের বক্তব্য, সামুদ্রিক সাপের কিছু প্রজাতি গোখরোর চেয়ে ১০ গুণ বেশি বিষাক্ত। এগুলির নিউরোটক্সিক বিষ কামড়ের সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু নিশ্চিত করে। তবে, মানুষের সঙ্গে এগুলির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই বাঁচোয়া। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাড়ছে। এতে একদিকে যেমন পর্যটন ধাক্কা খাবে, তেমনই মৎস্যজীবীদের বিপদও বাড়বে।