সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: দুর্গাপুজো যতই এগিয়ে আসছে, ততই কর্মব্যস্ত হয়ে উঠছে কৃষ্ণনগরের অলিগলি। এখানকার ডাকের সাজ মানেই ঐতিহ্যের এক বিশেষ অধ্যায়। প্রতিবারের মতো এ বছরও পুজোর আগে ডাকের সাজ তৈরিতে শিল্পীরা ব্যস্ত রয়েছেন। তাঁদের ঘরে এখন যেন উৎসবেরই আবহ। তার, রঙিন কাগজ, ঝিলিমিলি ফয়েল, থার্মোকল, কাপড়, চুমকি সোনালি-রুপালি সুতোর সমাহারে সাজানো শিল্পের জগৎ। শতবর্ষের পুরনো এই শিল্প আজও কৃষ্ণনগরের গর্ব। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত তো বটেই, দেশের বাইরের অনেক জায়গাতেও ডাকের সাজের প্রতিমার অর্ডার যায়। গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে শিল্পীরা দিনরাত কাজ করে চলেছেন। তাদের ঘরে ঘরে এখন একসঙ্গে উৎসব ও কর্মব্যস্ততা। পুজো ও উৎসবকে কেন্দ্র করে কৃষ্ণনগরের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প শুধু অর্থনৈতিক জোগানই দেয় না, বরং বাংলার সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
কৃষ্ণনগরের প্রতিটি শিল্পীর ঘর এখন ছোট ছোট কর্মশালায় পরিণত হয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে সাজসজ্জার কাজ। কেউ তার বুনছেন, কেউ থার্মোকল কাটছেন, কেউ কাগজে আঠা লাগাচ্ছেন এভাবেই গড়ে উঠছে প্রতিমার সাজসজ্জা। কাজের ব্যস্ততা, রাত জাগা, ক্লান্তি-সবকিছুর মাঝেই আছে আনন্দ, আছে গর্ব। ডাকের সাজের প্রতিটি টুকরো যেন বাংলার সংস্কৃতির এক একটি রঙ। দুর্গাপুজোর আনন্দকে আরও উজ্জ্বল করে তুলতে তাই প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন এই শিল্পীরা। বেশিরভাগ শিল্পীরা বলেন, এ বছর অর্ডারের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। ফলে ব্যস্ততা ও উৎসাহ দু’টোই বেড়েছে। পুজো মানেই আমাদের জন্য কাজের মরশুম। এই সময়টাই সারা বছরের আয়ের বড় ভরসা। কলকাতা, হাওড়া থেকে প্রতিবারের মত এবছরও প্রচুর অর্ডার এসেছে। অনেক মণ্ডপে এবারও থিমের সঙ্গে মিলিয়ে ডাকের সাজের বিশেষ অলংকার তৈরি হচ্ছে। কাঁচামালের দাম বাড়ায় সাজের খরচও কিছুটা বেড়েছে। বড় প্রতিমাগুলোর সাজের দাম ষাট থেকে সত্তর হাজার পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে। আবার আট দশ হাজারেরও আছে। আধুনিক সাজসজ্জার সঙ্গে টক্কর দিতে হলেও, ডাকের সাজের ঐতিহ্য ও শৈল্পিকতার কদর সবসময় থেকে যাবে।
স্থানীয় ডাকের সাজের শিল্পী শান্তনু বাগচী বলেন, «ডাকের সাজ শুধু কাজ নয়, আমাদের আবেগ। এই সাজের কদর সবসময় আছে। তাইতো দিন দিন অর্ডার বেড়েই চলেছে। খুবই ধৈর্য সহকারে কাজটি করতে হয়। আমাদের এবারের বেশিরভাগ ব্যবসা কলকাতাকেন্দ্রিক। বাইরের বেশিরভাগ মাল রেডি হয়ে গিয়েছে। পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আরেক সাজ শিল্পী বাসুদেব পাল বলেন, অর্ডার শুরু থেকেই খুব ভালো ছিল, কিন্ত আবহাওয়ার খারাপের জন্য অনেক অর্ডার বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিতে হয়েছে। এবার শুধু ডাকের সাজ নয়, থার্মোকলের সাজেরও খুব চাহিদা আছে। কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে রাত ৩ টে পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। মহালয়ার আগেই পুরো কাজ শেষ করে ফেলতে হবে।
কৃষ্ণনগরের ডাকের সাজ তাই শুধু শিল্প নয়, এক অটুট উত্তরাধিকার, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে উৎসবের আলো। -নিজস্ব চিত্র