ডাঃ বিশ্বজিৎ ঘোষ: আয়ুর্বেদ কেবলমাত্র চিকিৎসা বিজ্ঞান নয়,এটি পূর্ণাঙ্গরূপে জীবন বিষয়ক বিজ্ঞান। যেখানে চিকিৎসা ছাড়াও অজস্র এমন নীতিমালার বর্ণনা রয়েছে যার দ্বারা মানুষ নিজেই নিজের স্বাস্থ্যসচেতনতা,ব্যাধিক্ষমত্ব অর্থাৎ অনাক্রমতা, খাদ্যাভাস এবং সর্বোপরি রোগ প্রতিরোধে কার্যকরী উপায়সমূহ দ্বারা সুস্বাস্থ্য গড়ে তুলতে পারে। এখন প্রশ্ন হল, ময়দা কতটা ক্ষতিকারক?
Advertisement
চরক সংহিতায় অন্নপানবিধি অর্থাৎ নানান রকমের খাদ্যের দ্রব্যগুণ নিয়ে সুবিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। যেমন গমের গুণ সমন্ধে বলা হয়েছে এটি মধুররস যুক্ত, স্বাদু, স্নিগ্ধ, জীবনীয়, বাতশামক, বৃষ্য অর্থাৎ বীর্যবর্ধক, বৃংহনীয় অর্থাৎ পুষ্টিকারক এবং গুরু গুণযুক্ত। গমের আটা স্বাস্থ্যের পক্ষে যতটা স্বাস্থ্যকর, ময়দা সেই তুলনায় বেশ ক্ষতিকারক।যেমন—
১) পুষ্টিগুণের অপর্যাপ্ততা ও পরিপাকে সমস্যা:
আটার তুলনায় ময়দায় পুষ্টিগুণ বেশ কম থাকে। ফাইবার,ভিটামিন, মিনারেলের স্বল্পতা যেমন রয়েছে— পাশাপাশি ফাইবারের ঘাটতির জন্য নিয়মিত ময়দা বা ময়দা জাতীয় খাদ্যদ্রব্য খেলে স্বাভাবিক পরিপাক ক্রিয়া বেশ ব্যাহত হয়। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, অজীর্ণ, মাথা যন্ত্রণা, ওজন বৃদ্ধি ইত্যাদি সমস্যা দেখা যায়।
২) আর্থারাইটিস, ডায়াবেটিস ও স্থূলত্ব রোগীর অপথ্য:
ময়দার হাই গ্লাইসেমিক ইনডেক্স থাকায় এটি ডায়াবেটিস,স্থূলতা, আর্থারাইটিস রোগীর ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক। এতে সুগার বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি গমের খোসা বর্জিত হওয়ায় ময়দা অনেকটাই পুষ্টিহীন হয় এবং অ্যাসিটিক প্রকৃতির যা নিয়মিত খেলে হাড়ের ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয় এবং এতে আর্থারাইটিস রোগীর ব্যথা-যন্ত্রণাও বাড়ে।
৩) সিলিকন ডিজিজের আশঙ্কা:
বিভিন্ন গবেষণায় জানা গিয়েছে ময়দার উপস্থিত গ্লুটেনিন এবং গ্লিয়াডিন জলের সঙ্গে মিশে গ্লুটেন তৈরি করে যা ময়দার স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে সহায়ক। এবং গ্লুটেনই বিবিধ শারীরিক সমস্যার অন্যতম কারণ। তারমধ্যে অন্ত্রে পুষ্টি শোষণে ব্যাঘাত করাকে মলবদ্ধতা জাতীয় সমস্যাও একটি কারণ।
অতিরিক্ত গ্লুটেন সেবনে সিলিকন ডিজিজের আশঙ্কা বাড়ে।
ময়দা নাকি প্লাস্টিকের মতো? শরীরে প্রবেশ করে, অথচ কোনও কাজে আসে না?
আগেই বললাম ফাইবারের পরিমাণ কম থাকায় এবং গ্লুটেনের ফলে ময়দায় এইরকম স্থিতিস্থাপকতা দেখা যায় এবং কম পুষ্টিগুণযুক্ত হওয়ায় ময়দার তৈরি খাদ্য কেবল মুখরোচক কিন্ত স্বাস্থ্যকর নয়।
বাঙালি বাড়িতে ময়দার লুচি, পরোটা হট ফেভারিট। পুজো-আচ্চাতেও ময়দাকে অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। তাই উপোসও ভাঙা হয় ময়দার লুচি-পরোটা দিয়ে! এই নিয়ম তো অনেকদিন ধরে চলে আসছে। সেক্ষেত্রে কীভাবে গণ্ডগোল হতে পারে?
বাঙালিরা আসলে বেশ ভোজনপ্রিয় জাতি। আমরা সুস্বাদু খাবারের দিকে নজর দিতে গিয়ে সেই খাদ্যদ্রব্যের পুষ্টিগুণ প্রায়ই খেয়াল রাখি না, আবার পেটরোগাও। ধর্মীয় বিধিনিষেধের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সম্পর্কে সমান সচেতন হওয়াটাও জরুরি। দীর্ঘক্ষণ উপোসের পর তরল পানীয়,ফলের রস বা পেয়া, বিলেপী জাতীয় খাবার এবং তারপরে স্যুপ, সুজি, বার্লি খেলে তা শরীরের পক্ষে উপকারী। অন্যদিকে সাধ করে এক-আধদিন লুচি পরোটা খাওয়া যেতেই পারে কিন্তু নিয়মিত ময়দা বা ময়দা জাতীয় খাবার খেলে জঠরাগ্নির সাম্যতায় বিঘ্ন ঘটে শরীর কিন্তু গণ্ডগোল পাকাতে বাধ্য।
ময়দা আমরা নানা ভাবে খাই, উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে,পাউরুটি, বার্গার, রুমালি রুটি, তন্দুরি রুটি, পাস্তা, নুডলস! সব ক্ষেত্রেই কি সমান ক্ষতি হয়?
যেভাবেই খাওয়া হোক আসলে ময়দাই তো শরীরে যাচ্ছে! কিন্তু সেটা বিভিন্নভাবে এবং সত্যি কথা বলতে উপরের সবগুলি খাদ্যদ্রব্য কিন্তু কমবেশি হজমের স্বাভাবিক পরিপাক ক্রিয়াকে ব্যাহত করে। আয়ুর্বেদ দৃষ্টিকোণে জঠরাগ্নি বলে একটি কথা আছে এবং সহজভাবে বললে মন্দাগ্নি অর্থাৎ যেখানে অগ্নিবল কমে যাওয়াকে বোঝায় এবং এই অগ্নিবলের অসাম্যতাই নানা রোগের কারণ। সহজপাচ্য ও সুপাচ্য খাদ্যের বদলে যত ময়দা জাতীয় খাবার রয়েছে বেশিরভাগটাই এই অগ্নির স্বাভাবিক ক্রিয়াকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাহত করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা, পেট ব্যথা, অম্বল, মাথার যন্ত্রণা, অনিদ্রা, ক্ষুধামান্দ্য ইত্যাদি সমস্যা দেখা যায়। তাই ক্ষতির পরিমাণে তারতম্য হলেও ক্ষতি কিন্তু রয়েছেই।
আরও একটি জরুরি কথা, বাচ্চাদের এই জাতীয় খাবারের অভ্যেস আরও ভয়াবহ। এতে খুব অল্প বয়সে পেটের সমস্যা,স্থূলত্ব,অজীর্ণ ইত্যাদি থেকে আরও বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে।
(নুন)
একজন মানুষের প্রতিদিন কতটা নুন প্রয়োজন?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এর মতে, সাধারণত একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ প্রায় পাঁচ গ্রামের কম লবণ প্রতিদিন খেতে পারেন,অন্যদিকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ-এর মতে আরও কম অর্থাৎ দৈনিক প্রায় দুই গ্রামের মতো লবণ সেবন করা যেতে পারে।
নুন আমাদের শরীরে কী কী কাজে আসে?
শব্দকল্পদ্রুম-এ লবণের নিরুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘লুনানি ইতি লবণম’। অর্থাৎ যার মধ্যে মূলত ছেদন গুণ বর্তমান আবার খাদ্যদ্রব্যের স্বাদ বুঝতে লবণ অতি প্রয়োজনীয়।
আয়ুর্বেদের চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতায় লবণের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় এবং যেখানে সৈন্ধব লবণকে পথ্য অর্থাৎ নিয়মিত সেবনযোগ্য এবং সমস্ত লবণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবে ধরা হয়েছে। গুণে সৈন্ধব লবণ রুচিকারক, দীপনীয়, বৃষ্য, চোখের পক্ষে হিতকারক, অবিদাহী (যা দাহভাব তৈরি করে না), হৃদ্য, হিক্কা রোগে হিতকর ইত্যাদি এবং প্রায় সব ধরনের লবণ স্নিগ্ধগুণ, উষ্ণ, তীক্ষ্ম ও দীপনীয়, কফ নিবারক। দোষ ভিত্তিক দৃষ্টিকোণে লবণ বাত নাশক, পিত্ত ও কফ বর্ধক।
কাদের ছোটবেলা থেকেই নুন খাওয়া উচিত নয়?
বেশ কিছু ক্ষেত্রে নুন খাওয়ার বিধিনিষেধ মেনে চলা উচিত। যাদের কিডনির সমস্যা,উচ্চরক্তচাপ, জন্মগত হার্টের সমস্যা, শরীরে ফোলাভাব, স্থূলত্ব, ডায়াবেটিস, লিভার সিরোসিস ইত্যাদি রয়েছে তারা চিকিৎসকের পরামর্শ মতো লবণ খান।
বেশি নুন খেলে রক্ত জল হয়ে যায়। কথাটা কতটা সত্যি?
প্রথমেই বললাম অধিক মাত্রায় লবণ সেবন রক্তদুষ্টি ঘটায়, যেখানে রক্তের গুণগত পার্থক্যের পাশাপাশি অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে তরলের আধিক্য বাড়ায় তাই সতর্কতা হিসেবে এই উপমা প্রচলিত।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত নুন গ্রহণ কীভাবে আমাদের শরীরের ক্ষতি করে?
আয়ুর্বেদ মতে অতিরিক্ত লবণ সেবনে শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক প্রভাব দেখা দেয়। মূলত পিত্ত প্রকোপ, তৃষ্ণা, মূর্ছা, ত্বকের রোগ, বন্ধ্যাত্ব, অকালে চুল ঝরে পড়া, চুল পেকে যাওয়া,শরীরে ফোলাভাব, অম্লপিত্ত, রক্তদূষিত জনিত বিবিধ সমস্যা, শরীরে জ্বালা ভাব, পেটের সমস্যা, অকালে দাঁত পড়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।
কিছু কিছু খাদ্য থাকে যেগুলির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে লুকনো নুন থাকে। সেই খাদ্যগুলো খাওয়াও কি সমান ক্ষতিকর?
অধিক লবণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকারক তা যেভাবেই যেকোনও ফর্মে খাওয়া হোক না কেন। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে অধিকাংশ লোকজনই প্রত্যহ বিভিন্ন খাবারের মধ্যে লবণের মাত্রা প্রায় অজান্তেই ছাড়িয়ে ফেলছি। বাড়ির রান্নার ক্ষেত্রে লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পাশাপাশি প্যাকেটজাত বা বাইরের খাবার খেলে নজর রাখতে হবে সেটাতে যাতে লবণের মাত্রা অতিক্রম না হয়।
অনেকে বলেন নুন খোলায় ভেজে খান। এভাবে নুন খেলে কি সত্যিই ক্ষতি হয় না?
এটা অনেকেরই একটা বদ্ধমূল ধারণা যে কাঁচা নুনের পরিবর্তে ভাজা নুন কম ক্ষতিকারক। কিন্তু তেমন কোনও ব্যাপার নেই। নুন যেভাবেই খান অবশ্যই মাত্রানুযায়ী খান। মাত্রাতিরিক্ত নুন খাওয়া সর্বদা ক্ষতিকারক।
নুন খাওয়া কি সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া যায়?
নুনের বহুবিধ স্বাস্থ্যগুণ রয়েছে, তাই নুন সম্পূর্ণরূপে ছাড়লে শরীরে লবণের অভাবঘটিত সমস্যা দেখা দেয়। শরীরের ডিহাইড্রেশন কমাতে, পরিপাক ক্রিয়ায়, রক্তচাপের সাম্যতা বজায় রাখতে, দাঁতের যত্নে নুনের ভূমিকা রয়েছে। এককথায় মাত্রানুযায়ী এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ সেবন নৈব নৈব চ।
(চিনি)
একজন মানুষের প্রতিদিন কতটা চিনি খাওয়া দরকার?
প্রথমত চিনি তো না খেলেই ভালো, তার পরিবর্তে গুড় বা মধু খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী। নেহাতই খেতেই হলে বয়স, ওজন এবং দৈনিক পরিশ্রমের উপর ভিত্তি করে পরিমাণ মতো খাওয়া উচিত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক দিনে প্রায় কুড়ি গ্রাম মতো খেতে পারেন। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তা দশ থেকে পনেরো গ্রাম পরিমাণ নেওয়া যায় এবং ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে চিনি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভালো।
চিনি কি আমাদের শরীরে কোনও কাজে আসে?
শরীরে গ্লুকোজের পরিমাণ বজায় রাখতে ও দ্রুত ক্লান্তি নাশে চিনি বেশ সাহায্য করে। স্বাদের ক্ষেত্রে এবং শরীরের ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধে কার্যকর এছাড়াও বেশ কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা তো রয়েছেই।
ছোটরা চিনি বা মিষ্টি খেতে ভালোবাসে। ওদেরও কি চিনি দেওয়া বন্ধ করে দিতে হবে?
প্রথমত ছোটদের যতটা সম্ভব চিনি খাওয়ার অভ্যাস না করানোই উচিত। চিনির পরিবর্তে মধু, গুড়, স্টিভিয়া, মিছরি ইত্যাদি দেওয়াই ভালো।
অসংখ্য এমন খাদ্য থাকে যার মধ্যে সরাসরি দানা বা গুঁড়ো আকারে চিনি না দিলেও তার মধ্যে নানাভাবে মিষ্টি যোগ করা থাকে। অর্থাত্ কোনও কোনও খাদ্যে থাকে ফ্রুক্টোজ, গ্লুকোজ। বিষয়টি কি সত্যি? তাতে কি কোনও উপকার হয় নাকি একইরকম ক্ষতি হয়?
যে সকল খাদ্যের মধ্যে সরাসরি চিনি ছাড়াও নানা রকমভাবে মিষ্টি যোগ করা থাকে এবং ফ্রুক্টোজ এবং গ্লুকোজ রয়েছে সেক্ষেত্রে তার পরিমাণ দেখে নেওয়া উচিত। এই দু’টি শর্করা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির উৎস তবে এই শর্করাগুলি অত্যধিক পরিমাণে গ্রহণ করলে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অত্যধিক শর্করা গ্রহণের কারণে শরীরের ইনসুলিন উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ডায়বেটিস, মোটা হওয়া এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে দাঁড়াতে পারে। তাই খাদ্যে সর্বদা শর্করার পরিমাণ সীমিত রাখা উচিত।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখছিলাম, গবেষকরা বলছেন, বেশি চিনি খেলে মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। অস্থির হয়ে পড়ে। কোনও কিছুতে মনোনিবেশ করা যায় না। বিশেষ করে স্কুল গোয়িং বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বেশি মিষ্টিজাতীয় খাদ্য লেখাপড়ার চরম ক্ষতি করতে পারে। সত্যিই কি এমন হয়?
আমার মতে, বেশি চিনি কম চিনি এই ঘেরাটোপের বাইরে গিয়ে চিনি ছাড়া অভ্যাস গঠন জরুরি। কারণ দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বিভিন্ন খাবারের মাধ্যমে চিনি আমাদের শরীরে বহুভাবে হয়তো অজান্তেই চলে যাচ্ছে। কেক, পেস্ট্রি, চকলেট, চা পানের অভ্যাস, কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়া ইত্যাদি প্রত্যক্ষভাবে সুস্বাস্থ্যের অন্তরায়।
আবার হেলথ ড্রিঙ্কস-এর নামে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত চিনি হানিকারক। তাই বিষয়টিকে লঘু করে না দেখে প্রাকৃতিক মিষ্টি জাতীয় ফলমূল, ড্রাই ফ্রুট ইত্যাদির মাধ্যমে চিনিকে রিপ্লেস করা উচিত। বর্তমানে খুব অল্প বয়সে দাঁতের ক্যাভিটি, ওবেসিটি, ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার জাতীয় সমস্যাগুলোর সমাধানে লাইফস্টাইল ও সঠিক খাদ্যাভ্যাসই বিকল্পহীন পথ।
বেশি মিষ্টি খেলে কি সুগার হয়?
আয়ুর্বেদ মতে প্রমেহ (সুগার)-এর কারণ হিসেবে অতিরিক্ত পরিমাণ এবং বারেবারে পায়েস, কৃশরা (চালের তৈরি যবাগু বিশেষ), ইক্ষু অর্থাৎ আখ থেকে তৈরি খাদ্যদ্রব্য, দুধ, দই, মিষ্ট পদার্থ, শাক, তিল, জলে বাসকারী প্রাণীর মাংস, অতিরিক্ত ঘি যুক্ত মটর, উরদ জাতীয় ডাল খাওয়া থেকে একেবারেই শারীরিক কসরত না করা, দীর্ঘক্ষণ আলস্যপ্রবণ হয়ে শুয়ে থাকা ইত্যাদি প্রমেহ (সুগার) রোগের মুখ্য কারণ।
কিছু কিছু খাদ্য থাকে যেগুলির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে লুকানো চিনি থাকে। সেই খাদ্যগুলো খাওয়াও কি সমান ক্ষতিকর?
এককথায় অতিরিক্ত চিনি খাওয়া ক্ষতিকারক তা যেভাবেই শরীরের মধ্যে প্রবেশ করুক না কেন।
বেশি চিনি খেলে শরীরের কীভাবে ক্ষতি হয়?
বেশি চিনি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি শরীরের অহেতুক ফ্যাট বাড়ানো, সুগার, হাই প্রেশার, হার্ট, চোখের সমস্যা, বাতব্যাধি, দাঁতের ক্যাভিটি,ফ্যাটি লিভার, অবসাদ, অনাক্রমতা অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমানো, বিবিধ ত্বকের সমস্যা, কিডনির সমস্যা থেকে আরও অনেক সমস্যার তৈরি করে।
চিনি খাওয়া পুরোপুরি ছেড়ে দিলে কী কী উপকার মেলে?
চিনির খাদ্যগুণ অপেক্ষা ক্ষতিকারক প্রভাব বেশি থাকায় চিনি খাওয়া পুরোপুরি ছেড়ে দিলে ক্ষতি কিছু নেই, এতে বহু অবাঞ্ছিত রোগের ঝুঁকি কমে। যাঁরা পারবেন না তাঁরা মাত্রানুযায়ী খেতে পারেন। কিন্তু যাঁরা জিভের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে একেবারেই অপারগ তাঁরা চেষ্টা করুন চিনিটা এড়িয়ে চলতে।
আজিনামোটো
আজিনামোটো কোন কোন খাদ্যে থাকে?
বেশিরভাগ ফাস্ট ফুড, নুডলস, স্ন্যাকস জাতীয় খাবার মূলত চিপস, ফ্রোজেন মিল, সস, কেচাপ, মাংসের বিভিন্ন প্যাকেটজাত রেসিপি, স্যুপ ইত্যাদিতে সচরাচর আজিনামোটো ব্যবহার করা হয়।
আজিনামোটো কীভাবে শরীরের ক্ষতি করে?
এতে প্রচুর মাত্রায় সোডিয়াম, গ্লুটামেট, মনোসোডিয়াম ইত্যাদি থাকায় মাথা যন্ত্রণা, প্রেশার বাড়ানো, হার্ট, নিউরোডিজেনারেটিভ সমস্যা, মেটাবলিক ডিজঅর্ডার এবং শরীরে ফ্রি র্যাডিক্যাল বাড়িয়ে স্বাস্থ্যহানি পর্যন্ত করতে পারে।
এটি কতটুকু খাওয়া যায়?
সাধ করে একআধ দিন খেলেও নিয়মিত না খাওয়ায় ভালো।
এতে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা থাকে?
দীর্ঘদিন ধরে খেলে আশঙ্কা তো বাড়ায়।
১) পুষ্টিগুণের অপর্যাপ্ততা ও পরিপাকে সমস্যা:
আটার তুলনায় ময়দায় পুষ্টিগুণ বেশ কম থাকে। ফাইবার,ভিটামিন, মিনারেলের স্বল্পতা যেমন রয়েছে— পাশাপাশি ফাইবারের ঘাটতির জন্য নিয়মিত ময়দা বা ময়দা জাতীয় খাদ্যদ্রব্য খেলে স্বাভাবিক পরিপাক ক্রিয়া বেশ ব্যাহত হয়। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, অজীর্ণ, মাথা যন্ত্রণা, ওজন বৃদ্ধি ইত্যাদি সমস্যা দেখা যায়।
২) আর্থারাইটিস, ডায়াবেটিস ও স্থূলত্ব রোগীর অপথ্য:
ময়দার হাই গ্লাইসেমিক ইনডেক্স থাকায় এটি ডায়াবেটিস,স্থূলতা, আর্থারাইটিস রোগীর ক্ষেত্রে ক্ষতিকারক। এতে সুগার বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি গমের খোসা বর্জিত হওয়ায় ময়দা অনেকটাই পুষ্টিহীন হয় এবং অ্যাসিটিক প্রকৃতির যা নিয়মিত খেলে হাড়ের ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয় এবং এতে আর্থারাইটিস রোগীর ব্যথা-যন্ত্রণাও বাড়ে।
৩) সিলিকন ডিজিজের আশঙ্কা:
বিভিন্ন গবেষণায় জানা গিয়েছে ময়দার উপস্থিত গ্লুটেনিন এবং গ্লিয়াডিন জলের সঙ্গে মিশে গ্লুটেন তৈরি করে যা ময়দার স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে সহায়ক। এবং গ্লুটেনই বিবিধ শারীরিক সমস্যার অন্যতম কারণ। তারমধ্যে অন্ত্রে পুষ্টি শোষণে ব্যাঘাত করাকে মলবদ্ধতা জাতীয় সমস্যাও একটি কারণ।
অতিরিক্ত গ্লুটেন সেবনে সিলিকন ডিজিজের আশঙ্কা বাড়ে।
ময়দা নাকি প্লাস্টিকের মতো? শরীরে প্রবেশ করে, অথচ কোনও কাজে আসে না?
আগেই বললাম ফাইবারের পরিমাণ কম থাকায় এবং গ্লুটেনের ফলে ময়দায় এইরকম স্থিতিস্থাপকতা দেখা যায় এবং কম পুষ্টিগুণযুক্ত হওয়ায় ময়দার তৈরি খাদ্য কেবল মুখরোচক কিন্ত স্বাস্থ্যকর নয়।
বাঙালি বাড়িতে ময়দার লুচি, পরোটা হট ফেভারিট। পুজো-আচ্চাতেও ময়দাকে অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। তাই উপোসও ভাঙা হয় ময়দার লুচি-পরোটা দিয়ে! এই নিয়ম তো অনেকদিন ধরে চলে আসছে। সেক্ষেত্রে কীভাবে গণ্ডগোল হতে পারে?
বাঙালিরা আসলে বেশ ভোজনপ্রিয় জাতি। আমরা সুস্বাদু খাবারের দিকে নজর দিতে গিয়ে সেই খাদ্যদ্রব্যের পুষ্টিগুণ প্রায়ই খেয়াল রাখি না, আবার পেটরোগাও। ধর্মীয় বিধিনিষেধের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সম্পর্কে সমান সচেতন হওয়াটাও জরুরি। দীর্ঘক্ষণ উপোসের পর তরল পানীয়,ফলের রস বা পেয়া, বিলেপী জাতীয় খাবার এবং তারপরে স্যুপ, সুজি, বার্লি খেলে তা শরীরের পক্ষে উপকারী। অন্যদিকে সাধ করে এক-আধদিন লুচি পরোটা খাওয়া যেতেই পারে কিন্তু নিয়মিত ময়দা বা ময়দা জাতীয় খাবার খেলে জঠরাগ্নির সাম্যতায় বিঘ্ন ঘটে শরীর কিন্তু গণ্ডগোল পাকাতে বাধ্য।
ময়দা আমরা নানা ভাবে খাই, উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে,পাউরুটি, বার্গার, রুমালি রুটি, তন্দুরি রুটি, পাস্তা, নুডলস! সব ক্ষেত্রেই কি সমান ক্ষতি হয়?
যেভাবেই খাওয়া হোক আসলে ময়দাই তো শরীরে যাচ্ছে! কিন্তু সেটা বিভিন্নভাবে এবং সত্যি কথা বলতে উপরের সবগুলি খাদ্যদ্রব্য কিন্তু কমবেশি হজমের স্বাভাবিক পরিপাক ক্রিয়াকে ব্যাহত করে। আয়ুর্বেদ দৃষ্টিকোণে জঠরাগ্নি বলে একটি কথা আছে এবং সহজভাবে বললে মন্দাগ্নি অর্থাৎ যেখানে অগ্নিবল কমে যাওয়াকে বোঝায় এবং এই অগ্নিবলের অসাম্যতাই নানা রোগের কারণ। সহজপাচ্য ও সুপাচ্য খাদ্যের বদলে যত ময়দা জাতীয় খাবার রয়েছে বেশিরভাগটাই এই অগ্নির স্বাভাবিক ক্রিয়াকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যাহত করে। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা, পেট ব্যথা, অম্বল, মাথার যন্ত্রণা, অনিদ্রা, ক্ষুধামান্দ্য ইত্যাদি সমস্যা দেখা যায়। তাই ক্ষতির পরিমাণে তারতম্য হলেও ক্ষতি কিন্তু রয়েছেই।
আরও একটি জরুরি কথা, বাচ্চাদের এই জাতীয় খাবারের অভ্যেস আরও ভয়াবহ। এতে খুব অল্প বয়সে পেটের সমস্যা,স্থূলত্ব,অজীর্ণ ইত্যাদি থেকে আরও বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে।
(নুন)
একজন মানুষের প্রতিদিন কতটা নুন প্রয়োজন?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এর মতে, সাধারণত একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ প্রায় পাঁচ গ্রামের কম লবণ প্রতিদিন খেতে পারেন,অন্যদিকে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ-এর মতে আরও কম অর্থাৎ দৈনিক প্রায় দুই গ্রামের মতো লবণ সেবন করা যেতে পারে।
নুন আমাদের শরীরে কী কী কাজে আসে?
শব্দকল্পদ্রুম-এ লবণের নিরুক্তিতে বলা হয়েছে, ‘লুনানি ইতি লবণম’। অর্থাৎ যার মধ্যে মূলত ছেদন গুণ বর্তমান আবার খাদ্যদ্রব্যের স্বাদ বুঝতে লবণ অতি প্রয়োজনীয়।
আয়ুর্বেদের চরক সংহিতা, সুশ্রুত সংহিতায় লবণের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় এবং যেখানে সৈন্ধব লবণকে পথ্য অর্থাৎ নিয়মিত সেবনযোগ্য এবং সমস্ত লবণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবে ধরা হয়েছে। গুণে সৈন্ধব লবণ রুচিকারক, দীপনীয়, বৃষ্য, চোখের পক্ষে হিতকারক, অবিদাহী (যা দাহভাব তৈরি করে না), হৃদ্য, হিক্কা রোগে হিতকর ইত্যাদি এবং প্রায় সব ধরনের লবণ স্নিগ্ধগুণ, উষ্ণ, তীক্ষ্ম ও দীপনীয়, কফ নিবারক। দোষ ভিত্তিক দৃষ্টিকোণে লবণ বাত নাশক, পিত্ত ও কফ বর্ধক।
কাদের ছোটবেলা থেকেই নুন খাওয়া উচিত নয়?
বেশ কিছু ক্ষেত্রে নুন খাওয়ার বিধিনিষেধ মেনে চলা উচিত। যাদের কিডনির সমস্যা,উচ্চরক্তচাপ, জন্মগত হার্টের সমস্যা, শরীরে ফোলাভাব, স্থূলত্ব, ডায়াবেটিস, লিভার সিরোসিস ইত্যাদি রয়েছে তারা চিকিৎসকের পরামর্শ মতো লবণ খান।
বেশি নুন খেলে রক্ত জল হয়ে যায়। কথাটা কতটা সত্যি?
প্রথমেই বললাম অধিক মাত্রায় লবণ সেবন রক্তদুষ্টি ঘটায়, যেখানে রক্তের গুণগত পার্থক্যের পাশাপাশি অতিরিক্ত সোডিয়াম শরীরে তরলের আধিক্য বাড়ায় তাই সতর্কতা হিসেবে এই উপমা প্রচলিত।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত নুন গ্রহণ কীভাবে আমাদের শরীরের ক্ষতি করে?
আয়ুর্বেদ মতে অতিরিক্ত লবণ সেবনে শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক প্রভাব দেখা দেয়। মূলত পিত্ত প্রকোপ, তৃষ্ণা, মূর্ছা, ত্বকের রোগ, বন্ধ্যাত্ব, অকালে চুল ঝরে পড়া, চুল পেকে যাওয়া,শরীরে ফোলাভাব, অম্লপিত্ত, রক্তদূষিত জনিত বিবিধ সমস্যা, শরীরে জ্বালা ভাব, পেটের সমস্যা, অকালে দাঁত পড়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়।
কিছু কিছু খাদ্য থাকে যেগুলির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে লুকনো নুন থাকে। সেই খাদ্যগুলো খাওয়াও কি সমান ক্ষতিকর?
অধিক লবণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকারক তা যেভাবেই যেকোনও ফর্মে খাওয়া হোক না কেন। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে অধিকাংশ লোকজনই প্রত্যহ বিভিন্ন খাবারের মধ্যে লবণের মাত্রা প্রায় অজান্তেই ছাড়িয়ে ফেলছি। বাড়ির রান্নার ক্ষেত্রে লবণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পাশাপাশি প্যাকেটজাত বা বাইরের খাবার খেলে নজর রাখতে হবে সেটাতে যাতে লবণের মাত্রা অতিক্রম না হয়।
অনেকে বলেন নুন খোলায় ভেজে খান। এভাবে নুন খেলে কি সত্যিই ক্ষতি হয় না?
এটা অনেকেরই একটা বদ্ধমূল ধারণা যে কাঁচা নুনের পরিবর্তে ভাজা নুন কম ক্ষতিকারক। কিন্তু তেমন কোনও ব্যাপার নেই। নুন যেভাবেই খান অবশ্যই মাত্রানুযায়ী খান। মাত্রাতিরিক্ত নুন খাওয়া সর্বদা ক্ষতিকারক।
নুন খাওয়া কি সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া যায়?
নুনের বহুবিধ স্বাস্থ্যগুণ রয়েছে, তাই নুন সম্পূর্ণরূপে ছাড়লে শরীরে লবণের অভাবঘটিত সমস্যা দেখা দেয়। শরীরের ডিহাইড্রেশন কমাতে, পরিপাক ক্রিয়ায়, রক্তচাপের সাম্যতা বজায় রাখতে, দাঁতের যত্নে নুনের ভূমিকা রয়েছে। এককথায় মাত্রানুযায়ী এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ সেবন নৈব নৈব চ।
(চিনি)
একজন মানুষের প্রতিদিন কতটা চিনি খাওয়া দরকার?
প্রথমত চিনি তো না খেলেই ভালো, তার পরিবর্তে গুড় বা মধু খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী। নেহাতই খেতেই হলে বয়স, ওজন এবং দৈনিক পরিশ্রমের উপর ভিত্তি করে পরিমাণ মতো খাওয়া উচিত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক দিনে প্রায় কুড়ি গ্রাম মতো খেতে পারেন। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তা দশ থেকে পনেরো গ্রাম পরিমাণ নেওয়া যায় এবং ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে চিনি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভালো।
চিনি কি আমাদের শরীরে কোনও কাজে আসে?
শরীরে গ্লুকোজের পরিমাণ বজায় রাখতে ও দ্রুত ক্লান্তি নাশে চিনি বেশ সাহায্য করে। স্বাদের ক্ষেত্রে এবং শরীরের ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধে কার্যকর এছাড়াও বেশ কিছু স্বাস্থ্য উপকারিতা তো রয়েছেই।
ছোটরা চিনি বা মিষ্টি খেতে ভালোবাসে। ওদেরও কি চিনি দেওয়া বন্ধ করে দিতে হবে?
প্রথমত ছোটদের যতটা সম্ভব চিনি খাওয়ার অভ্যাস না করানোই উচিত। চিনির পরিবর্তে মধু, গুড়, স্টিভিয়া, মিছরি ইত্যাদি দেওয়াই ভালো।
অসংখ্য এমন খাদ্য থাকে যার মধ্যে সরাসরি দানা বা গুঁড়ো আকারে চিনি না দিলেও তার মধ্যে নানাভাবে মিষ্টি যোগ করা থাকে। অর্থাত্ কোনও কোনও খাদ্যে থাকে ফ্রুক্টোজ, গ্লুকোজ। বিষয়টি কি সত্যি? তাতে কি কোনও উপকার হয় নাকি একইরকম ক্ষতি হয়?
যে সকল খাদ্যের মধ্যে সরাসরি চিনি ছাড়াও নানা রকমভাবে মিষ্টি যোগ করা থাকে এবং ফ্রুক্টোজ এবং গ্লুকোজ রয়েছে সেক্ষেত্রে তার পরিমাণ দেখে নেওয়া উচিত। এই দু’টি শর্করা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তির উৎস তবে এই শর্করাগুলি অত্যধিক পরিমাণে গ্রহণ করলে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অত্যধিক শর্করা গ্রহণের কারণে শরীরের ইনসুলিন উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ডায়বেটিস, মোটা হওয়া এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হতে দাঁড়াতে পারে। তাই খাদ্যে সর্বদা শর্করার পরিমাণ সীমিত রাখা উচিত।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখছিলাম, গবেষকরা বলছেন, বেশি চিনি খেলে মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। অস্থির হয়ে পড়ে। কোনও কিছুতে মনোনিবেশ করা যায় না। বিশেষ করে স্কুল গোয়িং বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বেশি মিষ্টিজাতীয় খাদ্য লেখাপড়ার চরম ক্ষতি করতে পারে। সত্যিই কি এমন হয়?
আমার মতে, বেশি চিনি কম চিনি এই ঘেরাটোপের বাইরে গিয়ে চিনি ছাড়া অভ্যাস গঠন জরুরি। কারণ দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বিভিন্ন খাবারের মাধ্যমে চিনি আমাদের শরীরে বহুভাবে হয়তো অজান্তেই চলে যাচ্ছে। কেক, পেস্ট্রি, চকলেট, চা পানের অভ্যাস, কোল্ড ড্রিঙ্কস খাওয়া ইত্যাদি প্রত্যক্ষভাবে সুস্বাস্থ্যের অন্তরায়।
আবার হেলথ ড্রিঙ্কস-এর নামে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত চিনি হানিকারক। তাই বিষয়টিকে লঘু করে না দেখে প্রাকৃতিক মিষ্টি জাতীয় ফলমূল, ড্রাই ফ্রুট ইত্যাদির মাধ্যমে চিনিকে রিপ্লেস করা উচিত। বর্তমানে খুব অল্প বয়সে দাঁতের ক্যাভিটি, ওবেসিটি, ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার জাতীয় সমস্যাগুলোর সমাধানে লাইফস্টাইল ও সঠিক খাদ্যাভ্যাসই বিকল্পহীন পথ।
বেশি মিষ্টি খেলে কি সুগার হয়?
আয়ুর্বেদ মতে প্রমেহ (সুগার)-এর কারণ হিসেবে অতিরিক্ত পরিমাণ এবং বারেবারে পায়েস, কৃশরা (চালের তৈরি যবাগু বিশেষ), ইক্ষু অর্থাৎ আখ থেকে তৈরি খাদ্যদ্রব্য, দুধ, দই, মিষ্ট পদার্থ, শাক, তিল, জলে বাসকারী প্রাণীর মাংস, অতিরিক্ত ঘি যুক্ত মটর, উরদ জাতীয় ডাল খাওয়া থেকে একেবারেই শারীরিক কসরত না করা, দীর্ঘক্ষণ আলস্যপ্রবণ হয়ে শুয়ে থাকা ইত্যাদি প্রমেহ (সুগার) রোগের মুখ্য কারণ।
কিছু কিছু খাদ্য থাকে যেগুলির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে লুকানো চিনি থাকে। সেই খাদ্যগুলো খাওয়াও কি সমান ক্ষতিকর?
এককথায় অতিরিক্ত চিনি খাওয়া ক্ষতিকারক তা যেভাবেই শরীরের মধ্যে প্রবেশ করুক না কেন।
বেশি চিনি খেলে শরীরের কীভাবে ক্ষতি হয়?
বেশি চিনি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি শরীরের অহেতুক ফ্যাট বাড়ানো, সুগার, হাই প্রেশার, হার্ট, চোখের সমস্যা, বাতব্যাধি, দাঁতের ক্যাভিটি,ফ্যাটি লিভার, অবসাদ, অনাক্রমতা অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমানো, বিবিধ ত্বকের সমস্যা, কিডনির সমস্যা থেকে আরও অনেক সমস্যার তৈরি করে।
চিনি খাওয়া পুরোপুরি ছেড়ে দিলে কী কী উপকার মেলে?
চিনির খাদ্যগুণ অপেক্ষা ক্ষতিকারক প্রভাব বেশি থাকায় চিনি খাওয়া পুরোপুরি ছেড়ে দিলে ক্ষতি কিছু নেই, এতে বহু অবাঞ্ছিত রোগের ঝুঁকি কমে। যাঁরা পারবেন না তাঁরা মাত্রানুযায়ী খেতে পারেন। কিন্তু যাঁরা জিভের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে একেবারেই অপারগ তাঁরা চেষ্টা করুন চিনিটা এড়িয়ে চলতে।
আজিনামোটো
আজিনামোটো কোন কোন খাদ্যে থাকে?
বেশিরভাগ ফাস্ট ফুড, নুডলস, স্ন্যাকস জাতীয় খাবার মূলত চিপস, ফ্রোজেন মিল, সস, কেচাপ, মাংসের বিভিন্ন প্যাকেটজাত রেসিপি, স্যুপ ইত্যাদিতে সচরাচর আজিনামোটো ব্যবহার করা হয়।
আজিনামোটো কীভাবে শরীরের ক্ষতি করে?
এতে প্রচুর মাত্রায় সোডিয়াম, গ্লুটামেট, মনোসোডিয়াম ইত্যাদি থাকায় মাথা যন্ত্রণা, প্রেশার বাড়ানো, হার্ট, নিউরোডিজেনারেটিভ সমস্যা, মেটাবলিক ডিজঅর্ডার এবং শরীরে ফ্রি র্যাডিক্যাল বাড়িয়ে স্বাস্থ্যহানি পর্যন্ত করতে পারে।
এটি কতটুকু খাওয়া যায়?
সাধ করে একআধ দিন খেলেও নিয়মিত না খাওয়ায় ভালো।
এতে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা থাকে?
দীর্ঘদিন ধরে খেলে আশঙ্কা তো বাড়ায়।
লেখক আয়ুর্বেদ চিকিত্সক



