দীনেশ পণ্ডিত (পূর্ণকুম্ভের পুণ্যার্থী): মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই ভিড় বাড়ছিল। আগেভাগে সঙ্গমস্থলে এসে অপেক্ষা করাই ছিল লক্ষ্য। মৌনী অমাবস্যার পুণ্যলগ্নে ছিল অমৃত স্নানের মুহূর্ত। সেই উপলক্ষ্যে মধ্যরাতেই হল জন বিস্ফোরণ। পুণ্যার্থীদের হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কির জেরে আচমকাই ঘটে গেল মহাবিপর্যয়। আমরা ছয় বন্ধু দিকভ্রষ্ট হয়ে গেলাম। তখন কে কোথায়, খোঁজ নেব কী করে? যা পরিস্থিতি তাতে একের পর এক পুণ্যার্থী এ ওর গায়ে পড়ছেন। ‘হেল্প হেল্প’ বলে চিৎকার করছি। কিন্তু কে কাকে বাঁচাবে? প্রাণ বাঁচাতে সকলেই মরিয়া। আর ১৫ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকলেই নির্ঘাৎ লাশ হয়ে যেতাম। এত পুণ্যার্থীর ভিড় হবে, উত্তরপ্রদেশ সরকার তা বিলক্ষণ জানত। তারপরও নির্বিকার। এতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন থেকে গেল। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কয়েকজন জওয়ান শেষপর্যন্ত ত্রাতা হয়ে বাঁচালেন। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা, যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁরা যাতে সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরতে পারেন। কোটি কোটি মানুষের সমাগম। অব্যবস্থা ছত্রেছত্রে। প্রশাসন বহু ক্ষেত্রেই আগাম সতর্কতা নেয়নি। আগে জানলে পূর্ণকুম্ভে আসার কথা ভেবে দেখতাম। প্রচুর পুলিস নেমেছে। কিন্তু তারা থেকেও না থাকারই মতোই। মাত্র ৩০০ মিটার পথ যেতে তিন ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। প্রশাসনের আধিকারিকরা রাস্তায় থাকলেও জনস্রোতে তাঁরাও দিশাহীন।
Advertisement
আমরা ছয় বন্ধু সঙ্গমে স্নান সেরে যখন ফিরছি, সেই সময় স্রোতের মতো পুণ্যার্থীরা আসতে থাকেন স্নানের জন্য। তুমুল হুড়োহুড়ি। চোখের সামনেই দুই মহিলা পড়ে গেলেন। অনেকেই নিজেকে সামলাতে পারলেন না। হোঁচট খেয়ে পড়তে শুরু করলেন পরপর। পোশাকের ব্যাগ, শীতের রাতে সঙ্গে আনা কম্বল কোথায় চলে গেল, জানা নেই। পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন অনেকেই। আমরা বন্ধুরাও ওই সময় হারিয়ে যাই। পদপিষ্ট হওয়ার খবর ছড়াতেই অ্যাম্বুলেন্সের হুটারের মুহুমুর্হু আওয়াজ ভেসে আসে। নিরাপদ দূরত্বে সরে গেলেও আমার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। খালি পায়ে দৌড়াতে গিয়ে চোট পেয়েছি। দু’চোখের পাতা বন্ধ করলেই মর্মান্তিক সেই ছবি ভেসে উঠছে। বন্ধুরা কেমন আছে, খোঁজ নিতে মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। কিন্তু কিছুতেই ফোন লাগছিল না। মনে হচ্ছিল প্রতিটি সেকেন্ড যেন কয়েক ঘণ্টা। বিকেলে পার্কিং জোনে সকলে জড়ো হই। এখন অযোধ্যায় আছি। (লেখক শিলিগুড়ির বাসিন্দা)



