নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি ও সংবাদদাতা, বোলপুর: বৃহস্পতিবারের বিকাল। বোলপুরে তৃণমূলের পার্টি অফিস খাঁ খাঁ করছে। বাইরে ঝিমোচ্ছেন জনা দু’য়েক কর্মী। ভিতরে নেই লোকজন। অথচ মাসখানেক আগেও গমগম করত এই অফিস অনুগামীদের ভিড়ে। তৃণমূলের জামানা শেষ হতেই কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে অনুব্রতর সেই চেনা দাপট। ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে এখন শুধুই শূন্যতা। অথচ এই নেতার দাপটেই একসময় বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খেত। ‘চড়াম চড়াম’ ঢাক বাজানোর নিদান দিতেন। একই পরিণতি জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখেরও। তিনি নির্বাচনে জিতে বিধায়ক হয়েছেন। কিন্তু দল ক্ষমতায় না থাকায় তাঁর সেই প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেকটা কমেছে।
পার্টি অফিসে ‘কেষ্ট’র যাতায়াতও এখন অনিয়মিত। এলেও আসেন বিকাল সাড়ে ৪টের পর। ঘণ্টা দু’য়েক টিভিতে খবর দেখেন। তারপর আবার বাড়ি ফিরে যান। অথচ একটা সময় এই মানুষটার সুরক্ষায় দিনরাত মোতায়েন থাকত উর্দিধারীরা। ছায়াসঙ্গীর মতো লেগে থাকত শয়েশয়ে কর্মী। ভোটের ফল বেরতেই সব উধাও। মঙ্গলবার নিরাপত্তারক্ষী তুলে নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। আজ অনুব্রত কার্যত একা। ফল ঘোষণার পর থেকে পার্টি অফিসের চৌকাঠ মাড়াননি কোর কমিটির কোনো সদস্য। অনেকেই এখন পাঁচিলের উপর বসে আছেন। সুযোগ পেলেই ওপারে লাফ মারবেন, এই আশায়।
কেষ্ট কি তবে সত্যিই হতাশ? ফোন করা হলে চেনা গলার সেই হুঙ্কার আর নেই। এক অনুগামী ফোন ধরে নিচু গলায় বলেন, ‘দাদা এখন ব্যস্ত আছেন!’ কিন্তু কিসের এত ব্যস্ততা? তা কেউ জানে না। ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে তিনি কার্যত অন্তর্ধানে। সংবাদ মাধ্যমের ক্যামেরার সামনে মুখ খোলেননি একবারও। দলের পর্যালোচনা বৈঠকে দেখা মেলেনি। অথচ ভোটের আগে কেষ্ট হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, ‘বিজেপি ২০০ আসন পেলে একদিক কামিয়ে বোলপুর শহর ঘুরব।’ পাশা উলটে দিয়ে বিজেপি ২০০ পার করেছে। এআই দিয়ে তৈরি তাঁর ব্যাঙ্গাত্মক ছবি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে। এই বিপদের সময় দলেরই একাধিক পরাজিত প্রার্থী প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেছেন, বীরভূমে দলের ভরাডুবির দায় কেস্টদার।তৃণমূলের সাম্রাজ্যের পতনের আঁচ এসে লেগেছে বীরভূম জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখের গায়েও। ভোটের ফল বেরনোর পর থেকে জেলা পরিষদের চত্বরে কাজল বা তাঁর অনুগত কর্মাধ্যক্ষদের পা পড়েনি। এরইমাঝে জেলা পরিষদে কাজলের অফিসে রাতারাতি ভারতমাতা, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবি জায়গা করে নিয়েছে। এই ঘটনায় কাজল ঘনিষ্ঠমহলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁরও নিরাপত্তারক্ষীও তুলে নেওয়া হয়েছে। কাজল অবশ্য বলেন, ‘নিরাপত্তারক্ষী একেবারে তুলে নেয়নি, দু’জন আছেন। প্রয়োজন পড়লে রাজ্য প্রশাসনের কাছে আবার আবেদন করব।’ জেলা পরিষদে কেন আসছেন না? এই প্রশ্নের উত্তরে কাজল বলেন, ‘আগে যেসব টেন্ডার হয়েছিল এখন তারই কাজ চলছে। নতুন কোনো কাজ নেই। কাজ শুরু হলেই যাব।’ বিজেপির বোলপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডল বলেন, পাপ বাপকেও ছাড়ে না। কর্মফল ভোগ করতেই হবে। - নিজস্ব চিত্র