শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: ‘মুম্বই পুলিস থেকে বলছি। আপনি বিপুল পরিমাণ টাকার অবৈধ লেনদেন করেছেন। মুম্বইয়ের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে অভিযোগ জমা পড়েছে আপনার বিরুদ্ধে। তদন্তের খাতিরে আপনাকে ডিজিটাল অ্যারেস্ট করা হচ্ছে। আমরা ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই কলকাতায় যাচ্ছি। আপনার বাড়ি ঘিরে তল্লাশি হবে।’ দিনপাঁচেক আগেই এসেছিল ফোনটি। ডিজিটাল অ্যারেস্টের হুমকিতে রীতিমতো ভয় পেয়ে যান উত্তর কলকাতার গোয়াবাগান এলাকার বাসিন্দা বছর সত্তরের এক বৃদ্ধ। উদ্বেগের সঙ্গে জানতে চান, গ্রেপ্তারি এড়াতে কী করতে হবে? এই প্রশ্নেরই অপেক্ষায় ছিল সাইবার জালিয়াতরা। তারা জানায়, টাকা ফেললেই সব ‘সেটিং’ হয়ে যাবে। জালিয়াতদের ‘আসল পুলিস’ ভেবে, তাদের কথামতো কাজ করতে গিয়ে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা খোয়ালেন ওই বৃদ্ধ। ইতিমধ্যেই এব্যাপারে অভিযোগ হয়েছে বড়তলা থানা ও লালবাজারে। শুরু হয়েছে তদন্ত।
লালবাজার সূত্রে খবর, বড়তলা থানা এলাকার গোরাচাঁদ বোস রোডের বাসিন্দা ওই বৃদ্ধ। দিন পাঁচেক আগে একটি মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডার সংস্থার নাম করে তাঁকে ফোন করে এক ব্যক্তি। জানায়, ওই বৃদ্ধের আধার কার্ড ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সিম উঠেছে। ওই সিমের নম্বর যোগ করা হয়েছে মুম্বইয়ের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে। সেকথা শুনে ঘাবড়ে যান অভিযোগকারী বৃদ্ধ। এই নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন যখন, তখনই মোবাইলে এসেছিল দ্বিতীয় ফোনটি। অপরপ্রান্তে থাকা ব্যক্তি নিজেকে মুম্বই পুলিসের অফিসার পরিচয় দেয়। জানায়, বৃদ্ধের নামে মুম্বইয়ে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ব্যাঙ্কে জমা পড়া নথিতে তাঁর আধার কার্ড রয়েছে। এরপরই বৃদ্ধের আধার নম্বর জানতে চাওয়া হয়। সেটি বলা মাত্র প্রতারকরা জানায়, নম্বরটি মিলে গিয়েছে। ওই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে বিপুল পরিমাণ টাকার অবৈধ লেনদেন রয়েছে। সেই মামলাতেই বৃদ্ধকে ডিজিটাল অ্যারেস্ট করা হল। ওয়ারেন্টের কপিও পাঠানো হচ্ছে। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে ও বাড়িতে তল্লাশি চালাতে মুম্বই পুলিসের টিম যাচ্ছে কলকাতায়। এতেই ভয় পেয়ে পুলিসের সঙ্গে রফা করতে চান অভিযোগকারী। বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে বেশ কয়েক দফায় মোট ৪৯ লক্ষ ৮৯ হাজার ৯৯৮ টাকা পাঠান। ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স শূন্য হয়ে যায়। তারপরেও টাকা দাবি করতে থাকে ফোনের ওপারে থাকা সেই ‘পুলিস অফিসার’। বৃদ্ধ বুঝতে পারেন, প্রতারকদের খপ্পরে পড়েছেন। তারপরই দ্বারস্থ হন বড়তলা থানায়। যে অ্যাকাউন্টে তিনি টাকা পাঠিয়েছেন, সেটির সূত্র ধরে জালিয়াতদের পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে।
গত বছর ভারতে ডিজিটাল অ্যারেস্টের মাধ্যমে প্রায় ১৯৩৫ কোটি ৫১ লক্ষ টাকা হাতিয়েছে সাইবার জালিয়াতরা। নতুন বছরের শুরুতেই এমন ১৭,৭১৮টি প্রতারণার ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে গোটা দেশে। গায়েব হয়েছে ২১০ কোটি টাকা। ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট বলে কিছু হয় না’—এই মর্মে ব্যাপক সচেতনতা প্রচার চলছে সরকারি তরফে। কিন্তু তারপরেও মুম্বই পুলিস বা সিবিআইয়ের নাম করে ফোন এলেই ঘাবড়ে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।