Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

প্রাণী

জগতে জীবগণ যে প্রায়ই পরস্পর পরস্পরকে বিনাশ করে ও পরস্পরকে পালনও করে—এ সকলই সেই জগদবিধাতার লীলা ছাড়া আর কিছু নয়।

প্রাণী
  • ২৫ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

জগতে জীবগণ যে প্রায়ই পরস্পর পরস্পরকে বিনাশ করে ও পরস্পরকে পালনও করে—এ সকলই সেই জগদবিধাতার লীলা ছাড়া আর কিছু নয়। হে রাজন্‌, জলাশয়ে জলচর প্রাণিদের মধ্যে যেমন বৃহৎ প্রাণী ক্ষুদ্র প্রাণীকে, বলবান প্রাণী দুর্বল প্রাণীকে, আবার অধিকতর শক্তিশালী প্রাণিগণ পরস্পরকে ভক্ষণ করে থাকে। সেইরূপ সর্বনিয়ন্তা ভগবান শক্তিশালী মহৎ যদুগণের দ্বারা দুর্বল যদুগণকে ধ্বংস করিয়ে পৃথিবীর ভার হরণ করেছিলেন। দেশকালের উপযোগী ও হৃদয়ের তাপ প্রশমনকারী গোবিন্দের শ্রীমুখের বচনগুলি স্মরণ করে আমার অন্তর হারিয়ে যাচ্ছে।
(সূত উবাচ), এইভাবে অতি গভীর অনুরাগের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের শ্রীচরণকমল ধ্যান করতে করতে অর্জুনের শোকসন্তপ্ত মন শান্ত ও নির্মল হয়ে গেল। সদাসর্বদা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীচরণচিন্তায় নিমজ্জিত হয়ে অতিদ্রুত প্রগাঢ় ভক্তিলাভ করলেন অর্জুন। তখন তাঁর মন থেকে সমস্ত কলুষতা একেবারে নির্মূল হয়ে গেল। তখন অর্জুন, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাক্কালে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যে পারমার্থিক তত্ত্বজ্ঞান উপদেশ করেছিলেন, এবং সময়ের স্রোতে কর্মবাসনায় যা অন্ধকারে নিমগ্ন হয়েছিল—সেই জ্ঞান পুনরায় অন্তরে উপলব্ধি করলেন।
শ্রীকৃষ্ণচিন্তা করতে করতে অর্জুন যখন ব্রহ্মজ্ঞানের অধিকারী হলেন, তখন তিনি হয়ে গেলেন বিগতশোক। তাঁর অন্তর থেকে জীব-ব্রহ্ম পৃথক—এই দ্বৈতভ্রম দূর হলো। মায়া-গুণের কার্য নিষ্ফল হওয়ায় তিনি গুণাতীত হলেন এবং জন্ম-মৃত্যুর কারণ অবিদ্যা নাশ হয়ে লিঙ্গশরীরেরও গতিরোধ হওয়ায় তিনি জন্মহীন হয়ে গেলেন। নিশ্চলাত্মা যুধিষ্ঠির অর্জুনের নিকট থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্বধামে গমন ও যদুকুলের ধ্বংসবার্তা শ্রবণ করে নিজেও মহাপ্রস্থানের পথে গমন করার জন্য কৃতসংঙ্কল্প হলেন।
পাণ্ডবজননী কুন্তীদেবীও অর্জুনের মুখ থেকে শ্রীভগবানের স্বধামে গমনের ও যদুগণের ধ্বংসের সংবাদ শ্রবণ করে ঐকান্তিক নিষ্ঠায় ভগবদ্‌চরণে আত্মসমর্পণ করে জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। জন্মরহিত হয়েও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভূভার হরণের জন্য যদুকুলে শরীর ধারণ-পূর্বক এসে সেই কার্য সমাধা হলে, তিনি সেই তনুকে ত্যাগ করেছিলেন—যেমন পদতলে কণ্টক বিদ্ধ হলে অপর একটি কণ্টকের সাহায্যে তাকে উৎপাটিত করে শেষে দুটিকেই ফেলে দেওয়া হয়—সেইরূপ। অভিনেতা যেমন অভিনয়ের প্রয়োজনের যখন যে রূপ প্রয়োজন, সেটি ধারণ করে থাকে এবং অভিনয় শেষে সেই রূপ পরিত্যাগ করে নিজের স্বাভাবিক অবস্থায় বর্তমান থাকে, ভগবানও সেইরূপ ভূভার হরণের নিমিত্ত যখন যে রূপ প্রয়োজন, সেইরূপ ধারণ করে কার্য সম্পন্ন করেন ও কার্যশেষে সেই বিগ্রহ পরিত্যাগ করেন। নিত্যশ্রবণযোগ্য যাঁর অপূর্ব লীলাকথা, সেই ভগবান শ্রীহরি পৃথিবী থেকে তাঁর তনুটিকে অন্তর্হিত করা মাত্রই অবিবেকী জীবের অমঙ্গলকারী দুষ্ট কলি পৃথিবীতে প্রবেশ করল। 

Advertisement

অধ্যাপিকা গীতা মাইতি অনুদিত ‘শ্রীমদ্ভাগবতম্‌’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ