


নিজস্ব প্রতিনিধি, হাওড়া: বটগাছটি আর পাঁচটা বটের মতো নয়। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন একখানা বিশাল খোলা ছাতা গ্রামীণ রাস্তার নির্জন মোড়টিকে আগলে রেখেছে। ঝুলে থাকা শিকড়গুলি নেমে এসেছে বারান্দার মতো, শাখা-প্রশাখা মেলে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত প্রাকৃতিক মঞ্চ। বাগনান-মানকুড় রোডের ধারে কল্যাণপুরের অখ্যাত গ্রাম চালিধাউড়িয়ায় গেলেই চোখে পড়বে এই বিস্ময়। পথচলতি মানুষও খানিক থমকে দাঁড়ান, মোবাইলে ছবি তোলেন, কেউ বা নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকেন প্রকৃতির এই অভিনব রূপের দিকে। এই বিস্ময়ের নেপথ্যে রয়েছেন গ্রামেরই বাসিন্দা অমল মাইতি, গত এক যুগ ধরে যিনি নিজের হাতে গড়ে তুলছেন এক স্বপ্নের বটবৃক্ষ।
বটের কোটরে বসে শিস দেয় শ্যামা, উপরে কোথাও বসে এক বৃদ্ধ খুদেদের কবিতা শোনাচ্ছেন, ঝুড়ির দোলনায় দুলতে দুলতে শিশুরা শুনছে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে। দৃশ্যটি যেন শিশু সাহিত্যের কোনো রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা। বিকেলের পড়ন্ত রোদ গাছের পাতায় ছায়ার কারুকাজ এঁকে দেয়, বাতাসে মিশে থাকে মাটির গন্ধ। প্রকৃতির শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাহিত্যচর্চার এমন কল্পনাই ২০১৩ সালের দিকে অমলবাবুর মনে বীজ বুনেছিল। বাড়ির সামনে পুকুর ঘেঁষা জমিতে তিনি রোপণ করেছিলেন একটি ছোট্ট বটচারা। সময়ের সঙ্গে গাছটি যেমন বেড়েছে, তেমনই বেড়েছে তাঁর স্বপ্ন। ডালপালাগুলি ছড়িয়ে পড়তেই তিনি ভাবেন, গাছটিকেই বানাবেন সাংস্কৃতিক মঞ্চ। শুরু হয় দীর্ঘ পরিশ্রম। বাঁশের খাঁচা বানিয়ে নীচের ডালগুলিকে ধীরে ধীরে উপরে তোলা, ছাতার মতো আকার দেওয়া, ঝুড়িগুলিকে বেঁধে মাকড়সার জালের আদলে বসার জায়গা তৈরি করা— সবটাই প্রাকৃতিক উপায়ে, গাছের ক্ষতি না করেই। পাখির কলতানের সঙ্গে সংস্কৃতি চর্চাই তাঁর অঙ্গীকার।
এখন প্রায় ১৬০০ বর্গফুট জায়গাজুড়ে ৫০টিরও বেশি বাঁশের ভরকাঠামোয় দাঁড়িয়ে বটগাছটি ক্রমশ মঞ্চের রূপ নিচ্ছে। চারপাশে ঝুড়ি জুড়ে তৈরি হচ্ছে প্রাকৃতিক ঝুলবারান্দা। গ্রামবাসীরাও অবাক হয়ে দেখছেন এই ধীর, ধৈর্যশীল নির্মাণ প্রক্রিয়া। অমলবাবু বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে পরিকল্পনাও বদলাতে হচ্ছে। বড়ো ডাল নীচে নেমে এলে ট্রাক্টরের সাহায্যে তুলে দিতে হচ্ছে।’ তবে তাঁর বিশ্বাস, আরও তিন বছরের মধ্যে কাঠামোটি সাংস্কৃতিক আসরের উপযুক্ত হয়ে উঠবে। পেশায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, বয়স এখন ৫২। অভাবের চাপে মাধ্যমিকের পর পড়াশোনা থেমে গেলেও কবিতার প্রতি টান থামেনি।
অমলবাবুর ইচ্ছা, একদিন এই বটতলায় খুদেরা পড়বে রবীন্দ্রনাথ-সুকান্তের কবিতা, সবুজের বুকেই বসবে নজরুল গীতির আসর। অমলবাবুর এই অনন্য কীর্তি ইতিমধ্যেই গ্রামের বাসিন্দাদের পাশাপাশি প্রকৃতিপ্রেমীদের মনেও জায়গা করে নিয়েছে। অনেকেই বলছেন, কংক্রিটের জঙ্গলে এমন প্রাকৃতিক সংস্কৃতি চর্চার মঞ্চ যেন বিরল ও বিস্ময়। ভবিষ্যতে এখানেই ছোটো ছোটো সাহিত্যসভা, আবৃত্তি প্রতিযোগিতা ও গ্রামীণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। নিজস্ব চিত্র