প্রস্তাবনা হল ভারতীয় সংবিধানের মূল দর্শন, লক্ষ্য ও আদর্শের একটি সংক্ষিপ্ত সূচনা। গৃহীত প্রস্তাবনা ভারত রাষ্ট্রকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র হিসেবে বিকাশের সংকল্প ঘোষণা করে। এই গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র নাগরিকদের ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করে। ভারতীয় সংবিধানের মূলপাঠে এই ঘোষণা করা হয়েছে যে, আমরা, ভারতের জনগণ, ভারতকে একটি সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্ররূপে গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ওইসঙ্গে ভারত রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার; চিন্তা, মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম ও উপাসনার স্বাধীনতা এবং মর্যাদা ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। সকলের মধ্যে ব্যক্তি মর্যাদা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুনিশ্চিত করে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলতে ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর সংবিধান গ্রহণ করার পাশাপাশি তাকে বিধিবদ্ধ এবং নিজেদেরকে অর্পণ করা হয়। সংবিধান কার্যকর ধরা হয় ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি। ১৯৭৬ সালে ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে প্রস্তাবনায় যোগ করা হয় ‘সমাজতান্ত্রিক’, ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ ও ‘অখণ্ডতা’ শব্দগুলি। কোনো সন্দেহ নেই যে, সংবিধানের প্রস্তাবনাই সংবিধানের মূল চাবিকাঠি বা আত্মা।
তবে সংবিধান গ্রহণের দিনই যে ভারত ভূমিষ্ঠ হয়েছিল এমনটা নয়। ভারত হল পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতাগুলির একটি। ভারতীয় সভ্যতা প্রাচ্য, পাশ্চাত্যসহ সারা পৃথিবীর বহু সভ্য রাষ্ট্রের প্রেরণা। কারণ ভারত হল সেই দেশ যা পুরাণের কাল থেকে বহুত্বের সাধনায় মগ্ন। ভারতে ঠিক যে কত ধর্ম বর্ণ সম্প্রদায় ভাষা উপভাষার মানুষ যুগ যুগ ধরে মিলেমিশে বসবাস করছে তার পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান কারো কাছে নেই। সবাই যে ভারত বংশোদ্ভব তাও নয়, নানা সময়ে নানা পরিস্থিতিতে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ ভারতভূমিতে এসেছেন। ভারতকে আপন করে নিয়ে এদেশেই বসবাস করেছেন তাঁরা। তাঁদের সন্তানসন্ততি, উত্তরপুরুষকে তাই বিদেশি বা বহিরাগত বললে তাঁদের আন্তরিকতায় আঘাত করা হয়। কালে কালে তাঁদেরও একটাই পরিচয়—প্রত্যেকে ভারতমাতার সন্তান। ব্রিটিশ রাজশক্তিকে উৎখাত করে স্বাধীন ভারত নির্মাণের জন্য তাঁরা দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন। বহু মানুষ রক্ত দিয়েছেন, এবং যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা অপরিমেয়। তবেই গড়ে উঠেছে আজকের ভারত রাষ্ট্র, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি, দুনিয়ার বৃহত্তম গণতন্ত্র। জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় ভারতের যে উন্নতি পরিলক্ষিত হয় তা চমকপ্রদ। বিশেষ করে মহাকাশ গবেষণা এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারত সকলের সমীহ আদায় করে নিতে সমর্থ হয়েছে। ভারতভূমি চিন্তাচেতনাতেও চিরকাল অগ্রণী। এই অহংকার প্রতিটি ভারতবাসীর। এই যে বিপুল কর্মকাণ্ড এর কৃতিত্ব নির্দিষ্টভাবে কোনো একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অথবা কোনো একটি প্রদেশ বা অঞ্চলের জনগণকে দেওয়ার সুযোগ নেই। এখানে অবদান প্রত্যেকের। দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবের সুস্থ সংস্কৃতিই এই উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে ভারতকে।
দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করব আমরা এবছর। স্বাধীনতার শতবর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। দেশগঠনের পবিত্রকর্মে নিয়োজিত প্রত্যেকের অভিনন্দন, শুভেচ্ছা প্রাপ্য এইসময়। সকলের অধিকার আরো সুনিশ্চিত হওয়া কাম্য আজ। আর এই আনন্দমুহূর্তে বিপরীত যাত্রা নিয়ে ব্যস্ত একদল লোক। সংঘের অনুগামীরা ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বানাতে মরিয়া। তারা ধরে নিচ্ছে অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠা তাদের সাফল্যের প্রথম মাইলফলক। এরপর বাকি তাদের দুটি এজেন্ডা—অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু এবং সংবিধান বদলে দিয়ে হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা! এই এজেন্ডায় ফরমুলা একটাই—বিভাজন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়, ১৩-১৪ ডিসেম্বর দিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত সনাতন রাষ্ট্র শঙ্খনাদ মহোৎসব নামে একটি সম্মেলনের কথা। সেটির আয়োজন করেছিল সনাতন সংস্থা নামে একটি সংগঠন। সবচেয়ে পরিতাপের এবং ভয়ংকর ব্যাপার হল—এর পিছনে ছিল কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সমর্থন। ওই বিতর্কিত সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন একঝাঁক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং মোদি সরকার আর্থিক সহায়তাও দিয়েছে। যখন সুপ্রিম কোর্ট ঘৃণার ভাষণে লাগাম টানার নির্দেশ দিচ্ছে ঠিক তখন ওই মঞ্চ থেকেই বর্ষিত হয়েছে মুহুর্মুহু ঘৃণা। অভিযোগ, একঝাঁক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর উপস্থিতিতে দেশ থেকে মুসলিম খেদানোর দাবি তোলা হয়। কোনো কোনো বক্তার আবদার, ২৫ শতাংশ মুসলিমকে ভারত থেকে তাড়াতে হবে। ভারতকে বানাতে হবে হিন্দুরাষ্ট্র। এই নিন্দনীয় উদ্যোগ দেশের ঐক্য নষ্ট করার ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছু নয়। এই আঘাত সোজাসুজি সংবিধানের আত্মার উপর। আয়োজক সংস্থার বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। জবাবদিহি করতে হবে সরকারকেও। শান্তিকামী গণতন্ত্রপ্রিয় প্রতিটি দল এবং নাগরিকের উচিত এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়া। নয়তো অদূর ভবিষ্যতে এই গাফিলতি ও ভুলের চড়া মাশুল গুনতে হবে দেশকে।