Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

জড় পদার্থ

জড় পদার্থ
  • ৮ মার্চ, ২০২৫ ১১:০৩
Prefer us on Google

“চারিবেদে যে প্রভুরে করে অন্বেষণে। সে প্রভু যায়েন নিদ্রা শচীর অঙ্গনে।।” এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড চিৎ ও জড় পদার্থের সমষ্টি। জড়াতীত এক পরমচিৎ আছেন, যিনি বিশ্বের সকল চিদাত্মার চিদাত্মা-পরমাত্মা। অতএব চিদ্বস্তুকে আমরা দুই প্রকারে বলিতে পারি,—বিভুচিৎ ও অণুচিৎ। বিশ্বাতীত অথচ বিশ্বব্যাপী যে চিদ্বস্তু, তিনিই বিভুচিৎ এবং বিশ্বান্তর্গত চিদ্বস্তুসমূহ অণুচিৎ। জড় পদার্থের বিজ্ঞানের ন্যায় চেতনপদার্থেরও এক বিরাট বিজ্ঞান আছে, যাহার তত্ত্ব অধিক বিস্ময়াবহ। ভারতের প্রাচীন সভ্যতায় ও দর্শনে জড়বিজ্ঞানের যেরূপ সমুন্নতির বার্তা পাওয়া যায়, সেইরূপ চেতনাবিজ্ঞানেরও বিস্ময়কর গবেষণা ও তথ্যবর্ণনা দেখিয়া বিস্মিত হইতে হয়। বৈদিকযুগ হইতে চেতনবিজ্ঞানের অনুশীলন বর্তমানকাল পর্যন্ত পূর্ণোদ্যমে চলিয়া আসিতেছে এবং পাশ্চাত্য বৈজ্ঞানিকগণ ভারতীয় চেতনবিজ্ঞানশাস্ত্রের তত্ত্বোপলব্ধি হইতে এখনও বহু দূরে রহিয়াছেন। চেতনবিজ্ঞানই একমাত্র আর্যভারতের অমূল্য ও অসাধারণ সম্পদ এবং অন্য সমস্ত দেশই এই বিষয়ে ভারতের নিকট অধমর্ণ। উপনিষৎ, গীতা ও বেদান্তদর্শন প্রভৃতি শাস্ত্র চেতনবিজ্ঞানের সর্বোৎকৃষ্ট গ্রন্থ এবং পূর্বমীমাংসা, সাংখ্য, যোগ, ন্যায় ও বৈশেষিক প্রভৃতি আস্তিকদর্শনেও চেতনবিজ্ঞানের আলোচনা আছে। যে আর্যঋষিগণ, আচার্যগণ, সাধুমহাপুরুষ ও ধর্মগুরুগণ ঈশ্বর ও পরলোকে বিশ্বাসী এবং আত্মার নিত্যত্ব ও কর্মানুসারে জন্মান্তর স্বীকার করেন, তাঁহারাই চেতনবিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক। আবার চেতনপদার্থের তত্ত্বকথা যাঁহারা বলিয়াছেন, তাঁহাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ উদগাতা কলিযুগপাবনাবতারী স্বয়ং-ভগবান শ্রীমন্মহাপ্রভু গৌরসুন্দর। প্রাচীনযুগ হইতে আরম্ভ করিয়া মুনি ঋষি মহাজনগণ যাহা যাহা বলিয়াছেন শ্রীমন্মহাপ্রভুর চেতনবিজ্ঞানের পরিপূর্ণ সংবাদ তদপেক্ষা আরও সুন্দর, যুক্তিপূর্ণ ও হৃদয়গ্রাহী। এমন কি স্বয়ং-ভগবান শ্রীশ্রীনন্দনন্দনরূপে গীতায় যাহা বলিয়াছেন, তদপেক্ষা ও তাঁহার শ্রীশ্রীশচীনন্দন-রূপের উক্তিতে আরও স্পষ্ট ও প্রাঞ্জলভাবে চেতনবিজ্ঞানবার্তা বিঘোষিত হইয়াছে। মহাপ্রভুর এই বিজ্ঞানসংবাদ সর্বশেষ ও সর্বোৎকৃষ্ট। অতঃপর চেতনসম্পর্কে অন্য কোনও বক্তব্য অনুক্ত নাই। দুই প্রকার চেতনের মধ্যে বিভুচিৎ পরমেশ্বর যে সমস্ত দর্শনশাস্ত্রে স্বীকৃত, তন্মধ্যে বেদান্তদর্শনই সর্বাপেক্ষা প্রকৃষ্টভাবে পরমেশ্বরতত্ত্ব প্রতিপাদন করিয়াছেন। বেদান্তদর্শনের মূল গ্রন্থ উপনিষৎ। গীতা উপনিষৎসমূহের সার। একই পরম-তত্ত্বের নাম ব্রহ্ম, পরমাত্মা, পরমেশ্বর বা ভগবান। শ্রীশঙ্কর ও শ্রীরামানুজ প্রভৃতি ভারতের আচার্যগণ সকলেই বেদান্তদর্শনাদির ভাষ্যকর্তা। শ্রীরামানুজ, শ্রীমধ্ব, শ্রীনিম্বার্ক, শ্রীবিষ্ণুস্বামী ও শ্রীবল্লভ—এই বৈষ্ণবাচার্যগণের কোনও কোনও বিষয়ে মতবাদ পরস্পর ভিন্ন হইলেও সকলেই পরব্রহ্মের সবিশেষত্ব স্বীকার করিয়া তাঁহার বিশেষত্ব যে স্বাভাবিক কিন্তু ঔপাধিক বা আগন্তুক নহে, তাহা বিবৃত করিয়াছেন। পরন্তু শ্রীশঙ্করের মত তাঁহাদের সম্পূর্ণ বিরোধী। শ্রীশঙ্কর পরব্রহ্মের স্বাভাবিক বিশেষত্ব স্বীকার করেন না; এবং তাঁহার মতে পরব্রহ্ম নির্গুণ, নিঃশক্তিক, নিরাকার, জ্ঞানস্বরূপ-আনন্দ-চিৎসত্তামাত্র কিন্তু জ্ঞাতা ও আনন্দময় নহেন। তিনি মায়াযোগে সগুণ ব্রহ্ম ঈশ্বর হইয়া জগৎকর্তাদি হয়েন। শ্রীরামানুজ প্রভৃতি আচার্যবৃন্দ সকলেই শঙ্করমতের বিরোধী হইলেও শ্রীমন্মহাপ্রভুর ন্যায় অন্য কোনও আচার্য এত সুন্দর, যুক্তিপূর্ণ ও সুসমঞ্জসভাবে ব্রহ্মতত্ত্ব প্রতিপাদন করেন নাই। বৈষ্ণব গোস্বামিগণ সকলেই মহাপ্রভুর সিদ্ধান্তের অনুগামী হইয়াছেন। শ্রীমন্মহাপ্রভুর মতে যিনি বৃংহতি অর্থাৎ মহত্তম এবং বৃংহয়তি অর্থাৎ মহৎ করেন তিনি পরব্রহ্ম। তাঁহার স্বাভাবিক শক্তিসমূহ তাঁহার স্বরূপগতা। পণ্ডিতপ্রবর জ্যোতির্ময় নন্দের ‘মহাদাতা মহাপ্রভু’ থেকে

Advertisement
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ